মরে যাচ্ছে খালগুলো, অস্তিত্ব আবিষ্কার করা কঠিন
গাজীপুরের শ্রীপুরের লবলঙ্গ খাল হাজার বছরের ইতিহাসের একটি অংশ। এ খালকে কেন্দ্র করেই এ এলাকার কৃষি নির্ভর অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল।
কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই শ্রীপুরে শিল্প-কারখানা ক্রমবিকাশ হওয়ার পর থেকেই খালগুলোর দূষণ শুরু হয়। বর্তমানে এ খালের শ্রীপুর অংশে প্রায় ৩০ কিলোমিটারজুড়েই চলছে দখল আর দূষণ।
শিল্প-কারখানার হুমকিতে এক সময়ের খরস্রোতা এ খালটি এখন তার অস্তিত্ব হারাচ্ছে। শুধু লবলঙ্গ খাল নয় শিল্প-কারখানার দূষণ ও দখলে শ্রীপুরের ধাউর খাল, টেংরার খাল, কাটার খাল, সেরার খাল, বৈরাগীরচালার খাল, তরুণের খাল, সালদহ খাল দূষণ আর দখলে মরে যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রীপুর পৌর এলাকার এক্স সিরামিক্স নামের একটি কারখানা লবলঙ্গ খালের কেওয়া মৌজার আর.এস-৯৩৮৪ দাগের প্রায় অর্ধকিলোমিটার অংশ দখল করে রেখেছে। আর বর্জ্য অপসারণ তো চলছেই। বেশ কয়েকটি জায়গায় খালের গতিপথেরও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বর্তমানে এ কারখানার অংশে খালের অস্তিত্ব আবিষ্কার করা কঠিন।
যদিও খাল দখলের বিষয়টি অস্বীকার করে কারখানার ব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমান বলেন, খালের দুই পাশের জমিই আমাদের। এ কারখানায় পাঁচ বছর আগে যখন যোগদান করি তখন এটি ছিল একটি মরা খাল। নকশা অনুযায়ী খালের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিয়েই আমরা সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করেছি।

এছাড়া লবলঙ্গ খালের মাওনা ও ধনুয়া মৌজার অংশে রিদিশা নিটেক্স, সেলভো ক্যামিকেল, নোমান গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান, এশিয়া কম্পোজিট, আদিব ডাইং, দি ওয়েলটেক্সসহ আরও কয়েকটি শিল্প-প্রতিষ্ঠান দখল ও দূষণে এগিয়ে রয়েছে।
অপরদিকে, উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের অংশে রেনেটা গ্রুপ ও আলী পেপার নামক কারখানার দখলে অস্তিত্ব হারিয়েছে ধাউরের খাল। শ্রীপুর পৌর এলাকার একমাত্র বৈরাগীর চালা খালটি শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ও দখলে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি শ্রীপুর পৌর কর্তৃপক্ষ ওই খালের গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি অংশে কয়েকমাস ধরে বর্জ্য ফেলায় এখন পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে পড়ছে।
গোসিঙ্গা ও রাজাবাড়ি ইউনিয়নের তরুণের খালটি এখন দখল ও দূষণে বিভিন্ন অংশে মৃত। অধিকাংশ জায়গায় খাল ভরাট করে কৃষি জমিতে পরিণত করেছে স্থানীয়রা।
এছাড়া শ্রীপুরের লোহাগাছ বিন্দুবাড়ি এলাকার কাটার খালটি বিভিন্ন অংশে দখলে সংকুচিত হয়ে পড়ায় এ এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথরোধ হওয়ায় জলাবদ্ধতার কবলে রয়েছে এলাকার হাজার হাজার মানুষ।
সাইটালিয়া গ্রামের আব্দুল কাদের লাল মিয়া জানান, ধাউরের খালটি এক সময় নদীর মতো ছিল। এ খালটিকে ঘিরেই ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা হতো। কিন্তু বর্তমান দখলে খালটি সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি অনেক জায়গায় বিলীন হয়ে পড়েছে।

চকপাড়া গ্রামের আবু সাঈদ জানান, লবলঙ্গ খালে এক সময় দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ পাওয়া যেত। আমরা এ খালের পানি থেকেই চাষাবাদ করতাম। এখন দূষণের কারণে কোনো ধরনের জলজ প্রাণি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
পৌর এলাকার বৈরাগীরচালা গ্রামের আজাহারুল ইসলাম বলেন, বৈরাগীরচালা খালটি এলাকার পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ ছিল। এখন পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে পড়ায় বর্ষাকালে পৌর এলাকার অধিকাংশ অংশই জলাবদ্ধতার কবলে থাকে।
ধনুয়া গ্রামের কৃষক আহাম্মদ আলী জানান, এক সময়ের লবলঙ্গ খালটির মাধ্যমে দ্রুত পানি নিষ্কাশিত হতো, আবার প্রয়োজনের সময় এই খাল থেকেই পানি নিয়ে জমির চাষাবাদ করতাম। এখন খালের বিভিন্ন অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় বর্ষার সময় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এতে কয়েক বছর ধরে জমিতে ফসল হানি হচ্ছে।
বিন্দুবাড়ী জিওসি গ্রামের আব্দুল হামিদ জানান, তরুণের খালটি ৪০ ফুট প্রস্থ ছিল। এলাকার কৃষকের অন্যতম ভরসা ছিল এ খাল। কিন্তু দখলের কারণে এখন খালের বিভিন্ন অংশ শুধু সরকারি কাগজপত্রেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে নেই।
পরিবেশ অধিদফতর গাজীপুর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আব্দুস ছালাম জানান, পরিবেশ অধিদফতর ইনফোর্সমেন্ট অভিযানের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় শিল্প-প্রতিষ্ঠান কর্তৃক খাল, বিল ও নদী দখল-দূষণের অভিযোগে বিভিন্ন কারখানায় অভিযান চালিয়ে ক্ষতিপূরণ বা জরিমানা করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত আছে।
এ ব্যাপারে গাজীপুর জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির জানান, ইতোমধ্যে খালগুলোর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এখন পর্যায়ক্রমে খালগুলোতে থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে খননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মো. আমিনুল ইসলাম/এএম/আইআই