কীর্তনে হুজুর আর তাফসিরে পুরোহিত

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০৫:৪১ পিএম, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় অস্থিরতা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মধ্যেও ব্যতিক্রম কিছু দৃষ্টান্ত মানুষকে আশার আলো দেখায়। এরকম এক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানের একটি সমাধিক্ষেত্র।

একই সমাধিক্ষেত্রে সব ধর্মের মানুষকে সমাহিত করা হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। সম্মিলিত এ সমাধিক্ষেত্রের জন্য গর্ববোধ আছে এলাকার সব ধর্মের মানুষের। একই মাঠে ওয়াজ, কীর্তন ও বড়দিনের অনুষ্ঠান হয়। কীর্তনে হুজুর উপস্থিত হন আবার তাফসিরে পুরোহিত থাকেন। এখানে ধর্মের কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাই সবার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন।

পাত্রখোলা চা বাগানের সমাধিক্ষেত্রে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান এ চার ধর্মের মানুষকেই সমাহিত করা হচ্ছে যুগযুগ ধরে। তবে বর্তমানে এ এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মের কোনো বসতি না থাকায় মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিষ্টান ধর্মের মানুষদের এ সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত করা হয়।

এ নিয়ে এলাকার মানুষের মনে যেমন কোনো ভেদাভেদ নেই তেমনি এ সমাধিক্ষেত্রে কোনো বিভাজক বা দেয়াল নেই। নেই কোনো বাউন্ডারি। বর্তমানে মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিষ্টান এ তিন ধর্মের মানুষকে সমাহিত করা হয় প্রায় পাঁচ একর আয়তনের বিশাল এ সমাধিক্ষেত্রে।

molovibazar

ব্রিটিশ আমলে দেশের সীমান্তবর্তী পাত্রখোলা চা বাগানের এ সমাধিক্ষেত্রটি গড়ে ওঠে। প্রথমদিকে এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের এখানে সমাধিত করা হতো। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সবার আলোচনার ভিত্তিতে স্থানীয় মুসলিম কবরস্থানটি স্থানান্তর করে এখানে নিয়ে আসা হয়।

স্থানীয়রা জানান, জমি সংকট কিংবা কোনো প্রতিবন্ধকতায় জন্য এমনটি হয়নি বরং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা নেয়ার উদ্দেশ্যে এটি তৈরি হয়েছে। এতে কারও কোনো ভেদাভেদ নেই।

সমাধিক্ষেত্রের তিনটি নামফলক রয়েছে। মুসলিম ধর্মের সেলিনা আক্তার, সনাতন ধর্মের মাখন চাষা ও খ্রিষ্টান ধর্মের ফিলিমন বিশ্বাসের নামে এ নামফলক তৈরি করা হয়েছে। পাত্রখোলা সার্বজনীন সমাধিক্ষেত্রে তারা খুব কাছাকাছি শুয়ে আছেন চিরনিদ্রায়।

স্থানীয় মসজিদের ইমাম আব্দুল আজিজ, মন্দিরের পুরোহিত রাজেশ পন্ডিত ও গির্জার ফাদার তারা একে-অপরের ভালো বন্ধু। একসঙ্গে তারা সবাই সবার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হাজির হন। এ জন্য গর্ববোধ করেন তারা। একই মাঠে ওয়াজ হয়, আবার কীর্তন হয়, হয় বড়দিনের অনুষ্ঠানও। কীর্তনে হুজুর উপস্থিত থাকেন আবার তাফসিরে থাকেন পুরোহিত।

ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপরীতে সকল ধর্মের মানুষের সম্প্রীতি ও সমর্থনে গড়ে ওঠা এ সমাধিক্ষেত্র নিয়ে গর্বিত এলাকাবাসী। সবাই মিলেমিশে এখানে বসবাস করেন।

molovibazar

এ বিষয়ে স্থানীয় মাওলানা বাছিত খান বলেন, এখানে যুগ যুগ ধরে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের সমাধি গড়ে উঠার ফলে আমাদের মধ্যে সুসর্ম্পক জোড়ালো হয়েছে। এ নিয়ে কারও কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। সবাই সবার আপন।

স্থানীয় চা-শ্রমিক গৌরব উড়াং বলেন, জাত-ধর্ম দিয়ে কী আর মানুষকে আলাদা করা যায়? এখানে লাশ শুয়ে আছে। সাহেব লাশ। আমার বাপ-দাদা, কাকা-চাচা যেমন শুয়ে আছেন তেমনি বাবার বন্ধু পাশের বাড়ির মুসলিম চাচাও শুয়ে আছেন।

পাত্রখোলা চা-বাগান সার্বজনীন পূজামণ্ডপের পুরোহিত রাজেশ পন্ডিত জাগো নিউজকে বলেন, এখানে সব ধর্মের লোকের সমধি রয়েছে। এ নিয়ে ভেদাভেদ নেই। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের এ বন্ধন থেকে শিক্ষা নিয়ে ধর্মীয় হিংসামুক্ত সমাজ গড়ে তুলবে সেইসঙ্গে আমাদের এ বন্ধন অটুট রাখবে, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা ও স্বপ্ন।

পাত্রখোলা চা-বাগান জামে মসজিদের ইমাম মো. আব্দুল আজিজ জাগো নিউজকে বলেন, এখানে মানুষের সমাধি। কোনো ধর্ম বিবেচ্য নয়। আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না বরং আমরা গর্বিত। মিলেমিশে থাকতে পারছি বলে শুকরিয়া। সমাজের সব ধর্মের মানুষ একে-অপরকে ভালোবেসে একসঙ্গে থাকতে পারলেই সমাজে শান্তি আসবে।

এএম/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :