শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ নির্মাণে গাফিলতির অভিযোগ
টাঙ্গাইলে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বিভিন্ন ভবন নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বিষয়ে অনিয়ম ও অদক্ষ শ্রমিক নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। সঠিক নিরাপত্তা বলয় না থাকায় ইতোমধ্যে তিন শ্রমিক নিহত হয়েছেন।
টাঙ্গাইল গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১৭টি ভৌত অবকাঠামোর মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নুরানী কনস্ট্রাকশন লিমিটেড হাসপাতালের ছয়তলা বিশিষ্ট একাডেমিক ভবন, চারতলা বিশিষ্ট ছাত্রাবাস, ১৫তলা বিশিষ্ট মূল হাসপাতাল ভবন ও ৬০০ বর্গফুটের আবাসিক ভবনের নির্মাণকাজ করছে।
হাসপাতালের ছাত্রীনিবাস নির্মাণের কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রশিদ আরসিসিএল (জেবি), স্টাফ নার্সেস ডর্মেটরি নির্মাণের কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস হোসাইন, ইন্টার্ন ডক্টরস ডর্মেটরি (পুরুষ) নির্মাণ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হারুন কনস্ট্রাকশন, ইন্টার্ন ডক্টরস ডর্মেটরি (মহিলা) নির্মাণ করছে দেশ ইঞ্জিনিয়ারিং নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
এছাড়া হাসপাতালের গভীর নলকূপ ও ওয়াটার রিজার্ভার এবং পানি সরবরাহের লাইন নির্মাণের কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রশিদ অ্যান্ড ব্রাদার্স, ইমার্জেন্সি স্টাফ ডর্মেটরির (পুরুষ-১) নির্মাণ কাজ পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডালি কনস্ট্রাকশন, ইমার্জেন্সি স্টাফ ডর্মেটরি (পুরুষ-২) নির্মাণের কাজ পেয়েছে মার্ক কনস্ট্রাকশন নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, সিঙ্গেল ডক্টরস অ্যাকোমোডেশন (পুরুষ-১) ও সিঙ্গেল ডক্টরস অ্যাকোমোডেশনের (পুরুষ-২) কাজ পেয়েছে ভাওয়াল কনস্ট্রাকশন নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
এছাড়া এক হাজার বর্গফুটের আবাসিক ভবন নির্মাণ ও এক হাজার ২৫০ বর্গফুটের আবাসিক ভবন নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং অন্যান্য ভবন ও স্থাপনা নির্মাণে দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়াধীন।
শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ কাজ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ১৫তলা পর্যন্ত উঁচু ভবন নির্মাণের কাজ পেয়ে নুরানী কনস্ট্রাকশন নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি নিরাপত্তা বিধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করে অদক্ষ শ্রমিক নিয়োগ করে সনাতনী প্রদ্ধতিতে নির্মাণকাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য বেল্ট, হেলমেট, জুতা, হ্যান্ড গ্লাভস, চশমা ইত্যাদির সামান্য ব্যবস্থা রাখলেও তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেনি।
ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্মাণ শ্রমিক, রাজ মিস্ত্রি, কাঠ মিস্ত্রি, রড মিস্ত্রি, ফিটিংস মিস্ত্রি ইত্যাদির ক্ষেত্রে স্বল্প বেতনে আধা-দক্ষ ও অদক্ষদের নিয়োগ দিয়ে কোনোমতে কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করছে।
বহুতল ভবন নির্মাণে শ্রমিকদের ইন্স্যুরেন্স (গ্রুপ বীমা) থাকার বিধান থাকলেও কোনো শ্রমিকেরই ইন্স্যুরেন্স করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। উঁচু ভবন নির্মাণে ওয়াল সার্পোটিং ব্যবস্থা থাকার বাধ্যবধকতা থাকলেও তা করা হচ্ছে না। উঁচু ভবন নির্মাণে নিরাপত্তা বেষ্টনির কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি।
ফলে ওপর থেকে নির্মাণ সামগ্রী নিচে পড়ে সাধারণ মানুষ প্রায়ই আহত হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে নির্মাণাধীন ভবনের ছয়তলা থেকে পড়ে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। নির্মাণ কাজে তারা নিম্নমানের দ্রব্য ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত ও ছবি সংগ্রহ করার পরপরই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবন নির্মাণে ছয় তলায় টিন দিয়ে একটি অস্থায়ী ঘের নির্মাণ করেছে।
হাসপাতালের মূল ভবন নির্মাণে নিয়োজিত শ্রমিক শেরপুরের ফোরকান আলী (২৩), গাইবান্ধার সাইদুর রহমান (৪০) জানান, ভবন নির্মাণে শ্রমিকরা কেউ কেউ মাসিক আবার কেউ দিনমজুর হিসেবে বেতনে কাজ করছেন। রড বাইন্ডার হিসেবে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকাংশ শিশু-কিশোর।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা ও অদক্ষ শ্রমিক নিয়োগের কারণে ১৫তলা বিশিষ্ট মূল হাসপাতাল ভবনের ছয়তলা থেকে পড়ে গত ২১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আইনুল ইসলাম (২২) নামে এক নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। নিহত আইনুল ইসলাম কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়নপুর গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে।
গত ২৪ জানুয়ারি রাতে হাসপাতালের নির্মাণাধীন ভবনে বৈদ্যুতিক কাজ করার সময় বিদ্যুতায়িত হয়ে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থানার জোরবাড়িয়া গ্রামের আশরাফ আলীর ছেলে মো. ওয়াহেদুল ইসলাম (১৮) মারা যান। অপর একজন অজ্ঞাত শ্রমিক বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা গেছেন। তার নাম-পরিচয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা শ্রমিকরা জানাতে পারেনি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নুরানী কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম তারেকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
তবে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণকাজ দেখভালকারী মোস্তফা কামাল জানান, যেখানে কয়েকশ শ্রমিক কাজ করেন সেখানে এক-আধটু এদিক-সেদিক হতেই পারে।
মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণকাজ দেখভালকারী টাঙ্গাইল গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডি) সাকিবুল আজম জানান, তারা কনস্ট্রাকশন কাজের গুণগত মানের দিকে বেশি খেয়াল করে থাকেন।
টাঙ্গাইল শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. মোহাম্মদ আলী খান জানান, অপ্রাপ্ত বয়স্ক তিন শ্রমিক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। শ্রমিক নিয়োগ ও তাদের বেতন-ভাতার বিষয়টি ঠিকাদারি কর্তৃপক্ষ সুষ্ঠুভাবে করবেন। যেভাবে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে তাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইল গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভুরাম পাল জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ হচ্ছে। এখানে কাজে গাফিলতির সুযোগ নেই। হাসপাতালের নির্মাণকাজ তিনি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রেখেছেন।
অন্য জেলার শিশু-কিশোরদের কাজে নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, আগে বেশ কিছু শিশু-কিশোর ছিল। পরে তাদেরকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। যে তিন শ্রমিক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারকে যতটা সম্ভব ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ হবে।
আরিফ উর রহমান টগর/এএম/এমএস