বগুড়ায় চারজন খুনে পুলিশের হাতে ৩ ‘ক্লু’
বগুড়ার শিবগঞ্জে ৪ ব্যক্তিকে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে মরদেহ ধানখেতে ফেলা যাওয়ার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ছয়জনকে আটক করেছে পুলিশ। পাশাপাশি তিনটি ‘ক্লু’ সামনে নিয়ে বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ।
সোমবার রাতে উপজেলার কাঠগাড়া ও চন্দনপুর গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। নিহত চারজনের মধ্যে অজ্ঞাত ওই ব্যক্তির পরিচয় মিলেছে। তিনি হলেন- জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার নান্দাইলদীঘি গ্রামের শামছুদ্দিন মণ্ডল শ্যাম্পুর ছেলে খবির হোসেন (৩৪)। এ নিয়ে চারজনের পরিচয় পেলো পুলিশ। তবে এ ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি।
খবির হোসেনের মা খোদেজা বেগম জানান, খবির রোববার বিকেলে পুনট বাজারে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরেনি। খবির বিবাহিত। তার দুই ছেলে সন্তান রয়েছে।
আটকরা হলেন- উপজেলার কাঠগাড়া গ্রামের আবু বক্করের ছেলে বেলাল হোসেন, তার স্ত্রী নাজনীন বেগম এবং তার মেয়ে নাতিশা খাতুন, আফছার আলীর ছেলে আবদুল হালিম প্রামাণিক, চন্দনপুর গ্রামের জসিমুদ্দিনের ছেলে রফিকুল ইসলাম ও আটমূল ইউনিয়নের কুলুপাড়া গ্রামের মোবাইল ব্যবসায়ী প্রফুল্ল সরকারের ছেলে লিটন সরকার (২৮)।
এ ঘটনায় বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল জলিলকে প্রধান করে গোয়েন্দা (ডিবি) ও থানা পুলিশের সমন্বয়ে ছয় সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে তদন্ত টিম কাজ শুরু করেছে।
শিবগঞ্জ থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) আনিছুর রহমান ছয়জনকে আটকের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এ ঘটনায় এখনও বলার মতো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এ ঘটনার সার্বিক দিক পর্যবেক্ষণ করতে অ্যাডিশনাল ডিআইজি নিশারুল আরিফ (ক্রাইম) শিবগঞ্জের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন।
হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে না পারলেও একাধিক সূত্রে পুলিশ ধারণা করছে, মাদক-সংক্রান্ত কোনো ঘটনা নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে। কারণ ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু মাদক উদ্ধার করেছে পুলিশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে কালাই উপজেলার পাঁচপাইকা গ্রামের আজাহার আলীর ছেলে হেলাল মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে দুই বছর আগে তার স্ত্রী তালাক দিয়ে চলে যায়।
এরপর তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য একবছর আগে পরিবারের লোকজন পুলিশের সহযোগিতায় জেলখানায় রাখে। ৫ মাস হাজতবাস করে ৭ মাস আগে হেলাল বাড়িতে আসে।
কিছুদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও আবারও জড়িয়ে পড়ে মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসায়। মাদক ব্যবসা নিয়ে কয়েকদিন আগে তারই সহযোগী নিহত জাকারিয়ার সঙ্গে হেলালের মারামারি হয়।
মাদক সেবনের কারণে দেড় বছর আগে নিহত খবির উদ্দিনের স্ত্রীও তাকে তালাক দিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যায়। দুইজনের স্ত্রী চলে যাওয়ার পর মাদক সেবনের পাশাপাশি মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে তারা।
দুইজনের বাড়ি পার্শ্ববর্তী জয়পুরহাট জেলার কালাই থানা এলাকায় হলেও তাদের ওঠাবসা ছিল পার্শ্ববর্তী শিবগঞ্জ উপজেলার ভায়েরপুকুর বাজারে। তাদের অপর দুই বন্ধু জাকারিয়া ও শাবলু মাদক ব্যবসা করতো।
এলাকাবাসী জানায়, ভায়েরপুকুর বাজার হলো মাদকের নিরাপদ রুট। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা এই বাজারে মাদক কেনাবেচা ও সেবন চললেও পুলিশ কোনোদিন সেখানে অভিযান চালায়নি।
পাশাপাশি চলতো জমজমাট জুয়ার আসর। মাদক কেনাবেচা আর জুয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভায়েরপুকুর বাজারে রেজাউল ও সেলিম নামে দুইজনের মধ্যে গ্রুপিং চরমে ওঠে।
দীর্ঘদিন ধরে সেখানে মাদক ও জুয়ার আসর চললেও পুলিশ অভিযান চালায়নি। এলাকাবাসীর ধারণা, মাদকের কোনো বড় চালান নিয়ে বিরোধের কারণেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
আটমূল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোজাফফর হোসেন বলেন, মাদক সংক্রান্ত বেচাকেনার জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। তবে নিহতরা সবাই নিম্নআয়ের মানুষ।
শিবগঞ্জ থানা পুলিশের পরিদর্শক (অপারেশন) জাহিদ হোসেন মন্ডল জানান, এখন পর্যন্ত এ হত্যাকাণ্ডের কোনো সঠিক ‘ক্লু’ পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশ তিনটি ‘ক্লু’ সামনে নিয়ে বিষয়টি তদন্ত করছে। বিশেষ করে মাদক, পরকীয়া এবং চুরির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিরোধে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে। এ তিনটি বিষয় নিয়ে আমরা তদন্ত করছি।
উল্লেখ্য, রোববার রাতের কোনো এক সময় দুর্বৃত্তরা একই কায়দায় ৪ যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। হত্যার পর তারা ডাবইর ধানখেতের মধ্যে মরদেহ ফেলে রেখে যায়। নিহতদের হাত পেছন দিক দিয়ে বাধা ছিল। সোমবার দুপুরে নিহত চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায় পুলিশ।
লিমন বাসার/এএম/এমএস