বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে ৭ দিন ধরে আমদানি-রফতানি বন্ধ

সফিকুল আলম
সফিকুল আলম সফিকুল আলম , জেলা প্রতিনিধি পঞ্চগড়
প্রকাশিত: ০৯:০৬ এএম, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে আবারও অচলাবস্থা শুরু হয়েছে। লেবার হ্যান্ডেলিং ঠিকাদার, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লিমিটেড এবং আমদানি রফতানিকারকদের দ্বন্দ্বের কারণে গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে সকল প্রকার পণ্য আমদানি রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে।

এতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। পাশপাশি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বন্দরের লোড আনলোড শ্রমিকসহ বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। সংকট নিরসনে গত বৃহষ্পতিবার জেলা প্রশাসনের আহ্বানে জরুরি বৈঠকের পরও চালু হয়টি বন্দরটি।

১৯৯৭ সালে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লি. নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বন্দর পরিচালনার ২৫ বছরের চুক্তির পর চালু হয় বাংলাবান্ধা বন্দর। ২০১১ সাল থেকে সীমিত আকারে পণ্য আমদানি-রফতানি শুরু হয়। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে বিভিন্ন পণ্য আমদানি রফতানি বৃদ্ধি পেতে থাকে। এরপর পাথরসহ পণ্য আমদানি রফতানি বাণিজ্যে যুক্ত হয় ভুটান। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর ভারতসহ নেপাল ও ভুটানের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এখানে ইমিগ্রেশন চেকপোস্টও চালু করা হয়। সম্ভাবনাময় এই বন্দরটিতে চার দেশের ব্যবসা বাণিজ্য ভালোই চলছিল।

গত ১৪ মে ‘এটিআই লিমিটেট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে আমদানিকৃত পণ্য উঠানামার জন্য লেবার হ্যান্ডেলিংয়ের ইজারা দেয়া হয়। এরপর থেকে লেবার হেন্ডেলিং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এটিআই, বন্দর পরিচালনা কোম্পানি বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লিমিটেড এবং আমদানি রফতানিকারকদের সঙ্গে বন্দরের কুলি শ্রমিকদের শুরু হয় পণ্য উঠানামার দর নিয়ে দ্বন্দ্ব।

সর্বশেষ একাধিক সিএন্ডএফ এজেন্ট এর কাছে বকেয়া পোর্ট চার্জসহ রাজস্ব আদায় এবং কুলি শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা আদায় নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে বন্ধ হয়ে যায় স্থলবন্দরটি।

Banglabandha2

লেবার হ্যান্ডলিং ইজারার চুক্তি অনুযায়ী আমদানিকৃত পণ্য বন্দরে উঠানামা (লোড আনলোড) বাবদ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘এটিআই লিমিটেড’কে সিএন্ডএফ এজেন্ট এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা আমদানিকারকৃত পণ্যের টন প্রতি ১০৪ টাকা করে পরিশোধ করবেন। এই অর্থের সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ করা হবে। ব্যবসায়ীরা সরকারি রাজস্ব (ভ্যাট) বাবদ টন প্রতি অতিরিক্ত ১৫.৬০ টাকা পরিশোধ করেন। মূল ১০৪ টাকার মধ্যে ‘এটিআই লিমিটেড’ কুলি শ্রমিক, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লিমিটেডকে বন্দর চার্জ প্রদান করবে। বন্দরে লেবার হ্যান্ডেলিংয়ের ইজারা প্রদানের পূর্বে ব্যবসায়ীরা কুলি শ্রমিকদের মাধ্যমে নিজ উদ্যোগে পণ্য উঠানামা করতেন। সেক্ষেত্রে টন প্রতি তাদের কুলি শ্রমিক বাবদ ব্যয় হতো ৩১ থেকে ৩২ টাকা।

আমদানি রফতানিকারক ও ব্যবসায়ীরা জানায়, বর্তমানে ১০৪ টাকা থেকে এটিআই লিমিটেড বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষকে ১২.০২ টাকা, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লিমিটেডকে ২৬.৪৫ টাকা, পণ্য আনলোড বাবদ কুলি শ্রমিকদের ১৯ টাকা এবং লোড বাবদ ২১ টাকা ছাড় দেন ব্যবসায়ীদের। আমদানিকারকরা ২১ টাকায় বন্দরের বাইরে থেকে পাথরসহ আমদানিকৃত পণ্য আবার লোড করে বিভিন্ন এলাকায় পাঠান। ১০৪ টাকার মধ্যে এসব খাতে টাকা পরিশোধের পর এটিআই লিমিটেড মুনাফা করে টন প্রতি ২৫.৫২ টাকা। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে ভারত ও ভুটান থেকে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৮ হাজার টন পাথর আমদানি করে ব্যবসায়ীরা। সেই হিসেবে লেবার হ্যান্ডেলিং ইজারা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান এটিআই লিমিটেড শুধু আমদানিকৃত পাথর থেকেই প্রতিদিন ২ লাখ টাকার বেশি মুনাফা করছে। এছাড়া ডাল, গম, চালসহ অন্য আরও অনেক পণ্য আমদানি করা হয় এই বন্দর দিয়ে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, এটিআই লিমিটেড কিছুটা কম মুনাফা করে পণ্য উঠানামা বাবদ টাকা বৃদ্ধি করলে বন্দরে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।

বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের সিএন্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারক নাসিমুল হাসান নাসিম জাগো নিউজকে বলেন, এখানে সরকারি রাজস্ব প্রদানসহ সকল বিধিমালা মেনেই ব্যবসায়ীরা আমদানি রফতানি করতে চায়। আমাদের নানা হিসাব দেখিয়ে এটিআই লিমিটেড ২/৩ টাকা মুনাফার কথা বলছে। কিন্তু এটিআই লিমিটেড শুধু আমদানিকৃত পাথর থেকেই প্রতিদিন ২ লাখ টাকার বেশি মুনাফা করছে। এছাড়া অন্য পণ্য তো রয়েছেই। লেবারদের কথা চিন্তা করে তারা আরেকটু ছাড় দিলে বন্দরটি আবারও সচল হয়ে উঠবে।

এদিকে গত ১৪ মে এটিআই লিমিডেট লেবার হ্যান্ডেলিংয়ের ইজারা নেয়ার পর থেকে গত ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ১৩ জন আমদানিকারকের কাছে স্থলবন্দর লিমিটেডের ২ কোটি ৮৪ লাখ ৬৯৬ টাকা বকেয়া পড়ে। এই অর্থের মধ্যে সরকারি রাজস্বও রয়েছে। স্থলবন্দর লিমিটেডের এই বকেয়া আদায় এবং কুলি শ্রমিকদের পাওনা আদায় নিয়ে ব্যবসায়ী ও এটিআই লিমিটেড এর মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে গত ১ সেপ্টেম্বর শনিবার থেকে বন্দরে আমদানি রফতানি বন্ধ হয়ে যায়। এসময় ভুটানের ১০৩টি পাথর বোঝাই ট্রাক স্থলবন্দরে আটকাপড়ে। বন্দরে অচলাবস্থায় পাথর আনলোড করে দেশে ফিরে যেতে না পেরে চরম দুর্ভোগে পড়েন ভুটানের ট্রাকচালকরা।

 

Banglabandha2

ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পাশপাশি কর্মহীন হয়ে পড়েন কুলি শ্রমিকরা। এক পর্যায়ে ভুটানের ট্রাক চালকরা বিক্ষোভসহ বন্দরের অফিসকক্ষ ভাঙচুরও করেন। ৬ সেপ্টেম্বর বৃহষ্পতিবার বিকেলে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বিশেষ ব্যবস্থায় পাথর আনলোড করে ভুটানি ট্রাক চালকদের দেশে ফিরে যেতে ছাড়পত্র দেয়া হয়।

এ ঘটনায় বৃহষ্পতিবার বিকেলে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে জরুরি বৈঠক আহ্বান করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ গোলাম আজম। জেলা প্রশাসক মোহম্মদ জহিরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আমদানি রফতানিকারক ও সিএন্ডএফ এজেন্টরা উপস্থিত না হওয়ায় বন্দরটি চালুর সিদ্ধান্ত ছাড়াই রাতে বৈঠকটি মূলতবি করা হয়। তবে ভুটানি চালকদের বন্দর অফিসকক্ষ ভাঙচুর ও তাদের আটকে রাখার ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক প্রিয় সিন্দু তালুকদারের নেতৃত্বে তদন্ত দলকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।

আমদানিকারক হারুন উর রশিদ বাবু বলেন, বন্দর পরিচালনায় অযোগ্য প্রতিষ্ঠান এটিআই লিমিটেডকে বন্দরটির লেবার হ্যান্ডেলিংয়ের ইজারা প্রদানের পর থেকেই এখানে অচলাবস্থা শুরু হয়। কয়েক মাস ধরে আমদানি রফতানি কার্যক্রম বারবার ব্যহত হচ্ছে। ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এবং কুলি শ্রমিকদের দ্বন্দ্বের কারণে বারবার ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মূলত একটি চক্র সম্ভাবনাময় বাংলাবান্ধা বন্দরটি অচল করার ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। এখানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে এখানকার ব্যবসা বাণিজ্য আরেকটি বন্দরে নিয়ে যাওয়ার চক্রান্ত করছে ওই চক্রটি।

লেবার হ্যান্ডেলিং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এটিআই লিমিটেডের পার্টনার প্রতিনিধি মেহেদী হাসান খান বাবলা বলেন, লেবার হ্যান্ডেলিং চুক্তি মোতাবেক এটিআই লিমিটেড কাজ করছে। জেলা প্রশাসনের আহ্বানে একাধিক বৈঠকে কুলি শ্রমিকের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের হিসেব সঠিক নয়। সব কিছু পরিশোধের পর আমাদের ২/৩ টাকাও মুনাফা থাকে না। মূলত কয়েকজন সিএন্ডএফ এজেন্ট এবং আমদানিকারকদের কাছে বন্দরের বকেয়া পাওনা চাওয়ার কারণে তারা নানান কথা বলছেন। সরকারি রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে নিয়মনীতি মেনে আমদানি রফতানি পরিচালনা করা গেলে এখানে কোনো সমস্যা থাকবে না।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, সংকট সমাধানে আহ্বান করা জরুরি বৈঠকে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও সিএন্ডএফ এজেন্টরা না এসে ঠিক করেননি। আগে লেবার হ্যান্ডেলিং ইজারা না থাকায় সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বন্দরের অফিস ভাঙচুরের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারি রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে প্রয়োজনে তাদের নিয়ে আবারও বৈঠক করা হবে। আশা করা হচ্ছে সব পক্ষকে নিয়ে ঐক্যমতের ভিত্তিতে এবং নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শিগগির বন্দরটি সচল করা হবে।

এফএ/এমএএস/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :