রাজশাহীর সাংবাদিকদের আড্ডাস্থল ছিল আলম ভাইয়ের বাড়ি

ফেরদৌস সিদ্দিকী ফেরদৌস সিদ্দিকী , নিজস্ব প্রতিবেদক রাজশাহী
প্রকাশিত: ০৯:০৩ পিএম, ০৮ অক্টোবর ২০১৮

মোস্তাফিজুর রহমান খান আলম। রাজশাহী সাংবাদিকতায় তার পরিচিতি আলম ভাই নামেই। সাংবাদিকতা করছেন প্রায় ৫২ বছর ধরে। দীর্ঘ এ পথ পাড়ি দিয়েছেন নানা উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে।

প্রবীণ এই সাংবাদিক বর্তমানে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় জেলা সংবাদদাতা হিসেবে কর্মরত।

সাংবাদিক মোস্তাফিজুর রহমান খান ১৯৪৩ সালের ২৬ জানুয়ারি নানা বাড়ি রাজশাহী নগরীর পাঠানপাড়া এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম মাজদার রহমান খান। মা কামরুন নেসা খানম। বাবার পৈতৃক নিবাস রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আলাইপুরে।

১৯৭৬ সালের ফেরদৌস আরা বেগমের সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। এই দম্পতির দুই ছেলে। বড় ছেলে মামুনুর রহমান খান আরটিভির ডেপুটি হেড অব নিউজ।

ছোট ছেলে মারুফ রহমান খান মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে কানাডা প্রবাসী তিনি। এখন নগরীর ঘোড়ামারা এলাকায় বসবাস করছেন প্রবীণ এই সাংবাদিক।

সাংবাদিক আলম শৈশব, কৈশর, যৌবন এবং কর্মময় জীবনের পুরো সময়টা কাটিয়েছেন পদ্মাপাড়ের এই শহরেই। ১৯৬০ সালে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন তিনি। ১৯৬২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজ থেকে।

এখান থেকেই ১৯৬৫ সালে বাণিজ্য শাখায় স্নাতক পাঠ শেষ করেন। এরপর ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। মুক্তযুদ্ধ পরবর্তী সময় ১৯৭২ সালে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

ছাত্রজীবনে বাম ধারার ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান খান। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৬৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সমাজকল্যাণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আলম।

ওই সময় ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পদ পান তিনি। এরপর ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত অল পাকিস্তান ন্যাপ সম্মেলনে যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে যোগ দেন ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়নে।

তৎকালীন সব আন্দোলনেই সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল তার। ছয় দফা আন্দোলন, আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন আলম। মুক্তিযুক্ত করেন ৭ নম্বর সেক্টরে। ভারতের নেপাল সীমান্তে সাংগঠনিক এবং গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন তিনি।

ওই প্রশিক্ষণের আয়োজক ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়া ছাড়াও কর্মী সংগ্রহ, সাংগঠনিক সহায়তা এমনকি স্বাধীনতা পরবর্তী দেশ পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে অংশ নেন তিনি।

বর্তমানে তিনি ন্যাপ জেলা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া রাজশাহীর বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো।

ছাত্র রাজনীতিতে সফল মোস্তাফিজুর রহমান খান ১৯৬৬ সালে নাম লেখান সাংবাদিকতায়। রাজশাহীর নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে যোগ দেন জাতীয় দৈনিক সংবাদে। একই পদে দায়িত্ব পালন করেন মুক্তযুদ্ধ চলাকালেও। মুক্তিযুুদ্ধ শেষে যুক্ত হন দৈনিক ইত্তেফাকে। এরপর দি বাংলাদেশ অবজারভারে দায়িত্বপালন করেন।

পরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় যোগদান করেন। তিন বছর দায়িত্ব পালনের পর বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে চাকরিচ্যুত হন তিনি। তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় এলে আবারও বাসসে ফিরে যান গুণী এই সাংবাদিক। এখন সেখানেই দায়িত্ব পালন করছেন।

রাজনীতি এবং সাংবাদিকতা একই সঙ্গে সফলভাবে করেছেন আলম। রাজনীতি, সাংবাদিকতায় কোনো প্রভাব ফেলেছে কি-না জানতে চাইলে প্রবীণ এই সাংবাদিক বলেন, তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন মূলত রাজনৈতিক কারণেই। তার রাজনীতি এবং সাংবাদিকতা একই ধারায়। ফলে কখনও কোনোটিই তার কাছে সাংঘর্ষিক মনে হয়নি।

সাংবাদিকতার শুরুটা বেশ কঠিন ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকতা শুরু করেন কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই। তখন সংবাদ পাঠাতেন বুক পোস্টে। খবর পৌঁছাতেই সময় লাগতো প্রায় দেড় দিন। প্রকাশের পর কাগজ হাতে পেলে মিলিয়ে বোঝার চেষ্টা করতেন সাংবাদিকতার রকমফের। বিভিন্ন সময় সম্মেলন হতো সেখানেই এ নিয়ে আলাপ আলোচনা হতো। এটাই ছিল প্রশিক্ষণ।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সাংবাদিকতা নিয়ে আলম জানান, দেশে তখন আন্দোলন হচ্ছে। কৃষক-শ্রমিক-জনতার আন্দোলন। সেই খবর পাঠাতেন। ছাপা হতো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে। আন্দোলন তরান্বিত হয় এমন খবর পাঠাতেন বেশি বেশি। বিরোধীদেরও খবর পাঠাতেন। কারণ-পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তার কাছে সেটাও ছিল খবর।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে রাজশাহীতে সাংবাদিকদের তেমন কোনো শক্তিশালী সংগঠন ছিল না। সাংবাদিকদের আড্ডাস্থল ছিল আলম ভাইয়ের বাড়ি। তিনিই প্রথম রাজশাহীতে ফ্যাক্স মেশিন আনেন। সেখান থেকেই সংবাদ পাঠাতেন সাংবাদিকরা। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সাংবাদিকতার গণ্ডি। তার বাড়ি লাগোয়া ছাপাখানা নিরালা মুদ্রণী ছিল।

এক সময় রাজশাহীর সাংবাকিদের নিয়ে ইউনিয়ন গড়ে তোলেন তিনি। দায়িত্ব পালন করেন রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি পদেও। ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন বহুকাল। তাই এখনকার সাংবাদিক অনৈক্য পীড়া দেয় তাকে।

তিনি বলেন, ৬৬-তে রাজশাহীতে সাত জন সাংবাদিক ছিলাম। প্রত্যেকের আলাদা পরিচয় থাকলেও ঐক্য ছিল স্পাতের মতো কঠিন। এখন একশজনেও ঐক্য নেই। আগে কেউ ‘ভিকটিমাইজ’ হতো না। অথচ এখন অহরহ হচ্ছে। এখন সাংবাদিকরা রাজনৈতিকভাবেই দ্বিধা-বিভক্ত। ফলে সাংবাদিকদের শক্তি কমে গেছে অনেকাংশে। অনৈক্যই সাংবাদিককে হামলা-মামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।

এই অবস্থার জন্য গণমাধ্যমের দর্শনকে দায়ী করে তিনি বলেন, এখন গণমাধ্যমের কোনো দর্শন নেই। পুরোটাই ব্যবসা। সুতরাং ব্যবসায়ীক স্বার্থে কর্তৃপক্ষ যা চায় সেটাই করতে হয় সাংবাদিকদের। ফলে কোন সংবাদ পাঠাবেন, নাকি পাঠাবেন না সাংবাদিক নিজেই সেটির বাছ-বিচার করেন।

তিনি আরও বলেন, আগে খবর সংগ্রহে থানায় যাবার প্রয়োজন পড়তো না। এখন কতিপয় সাংবাদিক থানায় বসে থাকেন। খবর সংগ্রহে অনেক সময় নিজের পরিচয় গোপন রাখতেন। তাতে যে খবর পাওয়া যেত সেটি পরিচয় দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। হাটে-বাজারে আলোচনা থেকে যে বিষয়গুলো উঠে আসতো সেগুলোই ছিল খবরের উৎস।

খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যে তথ্য দেয়, সেটিই আসল তথ্য। যাদের স্বার্থ আছে, তারা নিজেরাই এসে সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলবেন। এটিই সত্য। এখন একই খবর ভিন্ন ভিন্নভাবে উঠে আসে। এখনকার জনগণ এর কারণ জানেন, বোঝেন। 

তরুণ সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে প্রবীণ এই সাংবাদিক বলেন, এখন সাংবাকিতায় বৈরী পরিবেশ। অনেক বিভাজন। এ পেশায় যারা আছেন তাদের নিজেদের স্বার্থেই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। নিজেদের মধ্যে জানা-শোনা, তথ্য-সংবাদ ও ভাব বিনিময় করতে হবে। সেটাতেই সাংবাদিকতা সঠিক ধারায় ফিরে আসবে।

এমএএস/পিআর