ক্ষত শুকিয়েছে, দাবি এখন জড়িতদের শাস্তি
ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ও উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে যুগযুগ ধরে চলে আসা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল সবার সহযোগিতায় সেই ক্ষত এখন পুরোপুরি শুকিয়েছে।
পূর্বের মতোই এখন হিন্দুরা পূজা-পার্বণে মুসলমান প্রতিবেশী আর মুসলমানরা ঈদসহ অন্যান্য উৎসবে তাদের হিন্দু প্রতিবেশীদের নিমন্ত্রণ করে থাকেন। নাসিরনগর উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে এমন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি দেশের অন্যান্য জেলা-উপজেলার বাসিন্দাদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
এবার নাসিরনগর উপজেলায় মহাধুমধামে দুর্গাপূজা ও লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গেল বছরের তুলনায় পূজা মণ্ডপের সংখ্যাও বেশি ছিল। তবে হামলার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আট মামলার মধ্যে কেবল একটি মামলারই অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়েছে নাসিরনগর থানা পুলিশ। এসব মামলায় গ্রেফতার হওয়া আসামিদের বেশিরভাগই জামিনে কারামুক্ত। তাই সবগুলো মামলার অভিযোগপত্র দিয়ে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
গত ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর পবিত্র কাবা শরীফ অবমাননা করে নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জগন্নাথ দাসের ছেলে রসরাজ দাসের ফেসবুক আইডি থেকে একটি ছবি পোস্ট করা হয়। এ ঘটনায় ২৯ অক্টোবর রসরাজকে আটক করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে নাসিরনগর থানায় পুলিশের দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এরপরই রসরাজের ফাঁসির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো নাসিরনগর উপজেলা।
৩০ অক্টোবর মাইকিং করে সমাবেশ ডাকে দুটি ইসলামি সংগঠন। সমাবেশ শেষ হওয়ার পরপরই দুষ্কৃতকারীরা নাসিরনগর উপজেলা সদরের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়েরর অন্তত ১০টি উপাসনালয় ও শতাধিক ঘরবাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। এরপর ৪ নভেম্বর ও ১৩ নভেম্বর ভোরে দুষ্কৃতকারীরা আবারও উপজেলা সদরে হিন্দু সম্প্রদায়েরর অন্তত ছয়টি ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে।
হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন ‘মূল হোতা’ হিসেবে হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখির নামে ওঠে আসার পর তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এছাড়া হামলার সময় ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র দেখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীসহ ১২৪ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশের করা আইসিটি আইনের মামলায় আড়াই মাস কারাভোগের পর ২০১৭ সালের ১৭ জানুয়ারি জামিনে কারামুক্ত হন রসরাজ। পরবর্তী পুলিশ প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত আদালত রসরাজের জামিন মঞ্জুর করেন।
এদিকে হামলার দুই বছর পর বদলে গেছে নাসিরনগরের চিত্র। সবকিছুই আগের মতো স্বাভাবিক। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনদের ভয় যেমন কেটেছে মুসলমানদের সঙ্গে তাদের পূর্বের সেই সম্প্রীতির বন্ধনও ফের জোড়া লেগেছে। সরকারি-বেসরকারি অনুদানে ভাঙচুরের শিকার উপাসনালয়গুলো সংস্কার করা হয়েছে। সেগুলোতে এখন পূর্বের মতোই চলে পূজা অর্চনার কাজ।
হামলা ও ভাঙচুরের শিকার উপজেলার গৌর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত নকুলানন্দ দাস অধিকারী জাগো নিউজকে বলেন, হামলা-ভাঙচুরের কারণে আমরা যখন দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতায় আমরা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। এখন আমাদের মনের ভয় কমেছে। তবে আমাদের দাবি সবগুলো মামলার অভিযোগপত্র দিয়ে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক।
নাসিরনগর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও গৌর মন্দির ভাঙচুর মামলার বাদী নির্মল চন্দ্র চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ৩০ অক্টোবরের হামলার ঘটনা নাসিরনগরের প্রকৃত চিত্র নয়। নাসিরনগরের ইতিহাস সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির। হামলার সময় আমাদের মনে যে ভয়-ভীতি ছিল সেটি এখন আর নেই। বর্তমান এমপি ফরহাদ হোসেন সংগ্রাম আমাদের নানাভাবে সহযোগিতা করছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এখন নিরাপদ এবং ভালো আছেন। তবে আমাদের দাবি থাকবে বাকি মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দিয়ে জড়িতদের যেন বিচারের আওতায় আনা হয়।
নাসিরনগর উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাবেক সভাপতি ও দত্ত মন্দির ভাঙচুরের মামলার বাদী কাজল জ্যোতি দত্ত জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের কোনো ভয়-ভীতি নেই। স্বাধীনভাবেই আমরা চলতে পারি। আমাদের হিন্দু-মুসলমানদের যে সম্পর্ক আছে সেটি খুব গভীর সম্পর্ক। আমরা সম্প্রীতি বজায় রেখে চলতে চাই। আর যারা হামলার ঘটনায় প্রকৃত দোষী আমরা তাদের বিচার চাই।
এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (সরাইল সার্কেল) মনিরুজ্জামান ফকির জাগো নিউজকে বলেন, আটটি মামলার মধ্যে একটি মামলা অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। বাকি সাতটি মামলার মধ্যে একটি জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে। আর ছয়টি মামলা আমরা নিবিড়ভাবে তদন্ত করছি। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ভিডিও ফুটেজ আমরা তদন্ত করছি।
তিনি আরও বলেন, সঠিক তদন্তের কারণে একটু সময় লাগছে। নির্দিষ্ট করে সময় বলা যাচ্ছে না, তবে আমরা দ্রুত মামলাগুলোর অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়ার চেষ্টা করছি।
আজিজুল সঞ্চয়/আরএআর/জেআইএম