শিশুদের জন্য চাকরি ছেড়ে দিলেন ফাহাদ

উপজেলা প্রতিনিধি উপজেলা প্রতিনিধি শ্রীপুর (গাজীপুর)
প্রকাশিত: ০৪:৪৬ পিএম, ১৮ এপ্রিল ২০১৯

তরুণ উদ্যমী যুবক ফাহাদ আকন্দ। যে সময় নিজের ভবিষ্যতের ভাবনায় থাকার কথা সে সময় ব্যতিক্রম ফাহাদ। এখন তার কাজ লেখাপড়ার ফাঁকে অবসর সময়ে এলাকার শিশু-কিশোরদের সংগঠিত করে শারীরিক কসরতে ব্যস্ত রাখা।

তার উদ্দেশ্য শিশু-কিশোরদের মাদক, বাজে কাজে আড্ডা, মোবাইল ফোন ও ফেসবুকসহ নানা ধরনের অপসংস্কৃতি থেকে বিরত রাখা। তার এ কাজে গত দেড় বছরে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। এখন তিনি পাচ্ছেন স্থানীয় অভিভাবকদের বাহবা।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বেরাইদেরচালা গ্রামের আবু ছাইদের ছেলে ফাহাদ আকন্দ। ২০১৬ সালে বরিশালের শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত টেক্সটাইল কলেজ থেকে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে ভালো চাকরি করবে। ভালো বেতনের চাকরিও হয়েছিল তার। কিন্তু ওই সময় ফাহাদের মনে জাগে ভিন্ন চিন্তা। তিনি দেখতে পান আশপাশের বিভিন্ন বাসাবাড়ির শিশু-কিশোররা বিদ্যালয়ে পাঠদান শেষে যখন বাসায় থাকে, তখন অধিকাংশ শিশু-কিশোর মুঠোফোন, টিভি ও ফেসবুকে সময় কাটায়।

Fahad-Sreepur

নানা কারণে তারা খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। বিশেষ করে ফেসবুকের কারণে ভবিষ্যতে এসব শিশু-কিশোর অপসংস্কৃতিতে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিনিয়ত এসব বিষয় তাকে ভাবিয়ে তুলত। এসব বিষয়ে চিন্তা করে ভালো চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে কয়েকজন অভিভাবককে বুঝিয়ে স্থানীয় আলহাজ ধনাই বেপারী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শিশুদের শারীরিক কসরত শেখানোর কাজ শুরু করেন ফাহাদ।

পাশাপাশি কিছু শিশুকে বাছাই করে ক্রিকেট খেলার প্রশিক্ষণ দেন। এর সবকিছু তিনি দিচ্ছেন স্বেচ্ছাশ্রমে। প্রথম প্রথম বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে এ বিষয়ের ওপর প্রচারণা চালালেও পরে আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন অভিভাবকরাই শিশু-কিশোরদের নিয়ে আসেন ফাহাদের ক্লাসে।

ফাহাদ জানান, তিনি শিশু-কিশোরদের শারীরিক কসরতের পাশাপাশি ক্রিকেট খেলা, ভাষার বিশুদ্ধ ব্যবহার, শুদ্ধভাবে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। বর্তমানে তার শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯০। ইতোপূর্বে আরও শতাধিক শিশুকে এসব কাজে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। এসব প্রশিক্ষণের জন্য তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকায় প্রযুক্তির সহায়তা নেন। এ কাজের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের সময়ের বাইরে বিকেল ও বন্ধের দিনকে বেছে নেন ফাহাদ।

Fahad-Sreepur

তার এ কাজের উদ্দেশ্য মাদক ও অপসংস্কৃতির ভয়াল গ্রাস থেকে শিশু-কিশোরদের রক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিক বিকাশে সহায়তা করা। কিন্তু এ কাজের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে খেলার মাঠের অভাব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠগুলো সেভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিদ্যালয়ের সময়সূচির বাইরে অধিকাংশ বিদ্যালয়ের মাঠ তালাবদ্ধ থাকে। তার দাবি, অন্তত শিশু-কিশোরদের কথা ভেবে খেলার মাঠগুলো রক্ষা ও উন্মুক্ত করা প্রয়োজন।

ফাহাদ আরও জানান, কিছু দিন আগে তার ভালো একটি চাকরি হয়েছিল। কিন্তু সেখানের ডিউটি ছিল দিনে। ফলে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার কথা বিবেচনা করে চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। এখন স্থানীয় একটি কারখানার রাতের শিফটে কাজ করছেন ফাহাদ।

ফাহাদের কাছে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ৭ বছর বয়সী শাহরিয়ার তুর্য। তার বাবা শিহাব জানান, তার ছেলেকে মুঠোফোনের বিভিন্ন গেম খেলার নেশায় পেয়ে বসেছিল। পরে তিনি অন্যান্য অভিভাবকের দেখাদেখিতে ছেলেকে ফাহাদের ক্লাসে নিয়ে যান। সাত মাস ধরে তার ছেলে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এখন তার ছেলে ভালো ক্রিকেট খেলতে পারে। অন্যান্য নেশা থেকে সে বেরিয়ে এসেছে। ফাহাদের মতো সব এলাকায় এমন উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

Fahad-Sreepur

ফাহাদের কাছে প্রশিক্ষণ নেয় দিপঙ্কর শুভ নামে আরেক শিশু। তার বাবা প্রদীপ সাহা জানান, ফাহাদের ক্লাসে শিশুরা যে কতটা উপকৃত হচ্ছে তা বলে বোঝানো যাবে না। লেখাপড়ার ফাঁকে সামান্য এই সময় ব্যয় শিশুদের মানসিক ও শারীরিক শক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

এ বিষয়ে গাজীপুরের আব্দুল আউয়াল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, অভিভাবকদের অসচেতনতায় বর্তমানে নানা ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে আমাদের শিশুরা। তারা খেলাধুলা থেকে দূরে সরে গিয়ে মুঠোফোন গেমে আসক্ত। টিভির দিকে ঝুঁকছে শিশুরা। অল্প বয়সে শিশুদের এরকম কাজে প্রতিনিয়ত তাদের মেধাশক্তি লোপ পাচ্ছে। এরকম ঝুঁকি এড়াতে ফাহাদের মতো যুবকদের এগিয়ে আসা সত্যিই প্রশংসার। ফাহাদের এ কাজ শিশু-কিশোরদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

শিহাব খান/এএম/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :