সেই পর্দা দেখতে ফরিদপুর মেডিকেলে তদন্ত দল

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০৯:৩৫ এএম, ১১ অক্টোবর ২০১৯

আলোচিত রূপপুর প্রকল্পের বালিশকাণ্ডকে হার মানিয়ে দুর্নীতির নতুন নজির গড়া ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ (ফমেক) হাসপাতালের সেই পর্দাসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়ম তদন্তে হাইকোর্টের নির্দেশনায় পাঁচ সদস্যের একটি দল তাদের কাজ সম্পন্ন করেছেন।

বুধবার ও বৃহস্পতিবার তদন্ত কাজ পরিচালনা করে দলটি। তদন্ত দলে ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-সহকারী পরিচালক মো. শহিদুর রহমান ও ফেরদৌস রহমান, স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপ-পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন ও সহকারী পরিচালক ডা. শফিকুর রহমান এবং সারাদেশে সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি মেরামতকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইলেকট্রো ইকুইপমেন্ট মেইনটেইন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (নিমিউ অ্যান্ড টিসি) সহকারী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার নাশিদ রহমান।

তদন্ত দল ক্রয় করা পর্দা ও যন্ত্রপাতিগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। ব্যবহার না করার কারণে অতিরিক্ত দাম দেখিয়ে কেনা পর্দা ও যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে তারা জানান।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কামদা প্রসাদ সাহা বলেন, পাচঁ সদস্যের একটি তদন্ত দল ফরিদপুরে এসেছে। দুই দিনে তারা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে তদন্ত করেন। আমি তাদেরকে তদন্তের ব্যাপারে সব রকমের সহযোগিতা করেছি। যেহেতু আমার সময়ের ঘটনা এটি নয়, তারপরেও তারা যা যা আমাদের কাছে চেয়েছে আমি সেইসব তথ্য দিয়ে তাদেরকে সহায়তা করেছি।

দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক মো. শহিদুর রহমান বলেন, আমরা মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে দুদকের পক্ষ থেকে এই তদন্তে এসেছি। এখানকার বেশির ভাগ মেশিন ব্যবহার না করার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া বহুল আলোচিত পর্দা ব্যবহার না হওয়া ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা দুই জায়গায় ঘুরে দেখেছি। ঢাকা গিয়ে এ ব্যাপারে রিপোর্ট জমা দেয়া হবে।

জানা যায়, ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনা এবং আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় ২০ আগস্ট হাইকোর্ট দুদককে এ বিষয়ে তদন্ত করে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেন।

২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মেসার্স অনিক ট্রেডার্স ৫১ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার ১৬৬টি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। অনিক ট্রেডার্স ৪১ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার বিল পেলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১০ কোটি টাকা যন্ত্রপাতির দাম বেশি দেখানোসহ বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে বিল আটকে দেয়। এ কারণে ২০১৭ সালের ১ জুন বকেয়া আদায়ে হাইকোর্টে একটি রিট করে অনিক ট্রেডার্স।

রিটের পর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কাছে অনিক ট্রেডার্সের সরবরাহ করা ১০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতির একটি তালিকা চেয়ে পাঠান।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক কামদা প্রসাদ সাহা ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ওই ১০ কোটি টাকার বিপরীতে দামসহ ১০ আইটেমের যন্ত্রপাতির একটি তালিকা দেন।

ওই তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে গত ৫ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) বেলা ১১টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত হাসপাতালে সরেজমিনে পরিদর্শনকালে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি ভিএসএ অনসাইড অক্সিজেন জেনারেটিং প্ল্যান্ট কিনতে খরচ দেখানো হয়েছে পাঁচ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এ যন্ত্রটি হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের পেছনে পশ্চিম পাশের রুমে স্থাপন করা হয়েছে। তিন বছর ধরে ওই কক্ষটি তালাবদ্ধ। তালায় মরিচা ধরে যাওয়ায় হেক্সো ব্লেড দিয়ে তালার কড়া কেটে কক্ষে ঢুকতে হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতাল সার্টেইন সিস্টেম ফর আইসিইউ/সিসিইউ বেডসের পর্দা। কোরিয়াতে তৈরি এই পর্দার খরচ দেখানো হয়েছে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

foridpur02.jpg

পরিচালক তার পত্রে ‘একটি’ পর্দার কথা উল্লেখ করলেও এই ওয়ার্ডে ১৬টি শয্যা রয়েছে। ১৬টি শয্যার জন্য সাড়ে ১২ হাত দৈর্ঘ্য ও সাড়ে চার হাত প্রস্থ বিশিষ্ট আধুনিক পর্দা রয়েছে।

মূলত একটি পর্দার দাম ৩৭ লাখ ৫০ হাজার বলা হচ্ছে ১৬টি বেডসহ পর্দার কথা আলাদাভাবে উল্লেখ না করায়। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি বেড ও পর্দাসহ এক একটি সিস্টেমের খরচ এটি। সেক্ষেত্রে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকাকে ১৬ দিয়ে ভাগ দিলে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৫ টাকা করে পড়ার কথা। তবে যন্ত্রপাতি থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারী না থাকায় গত তিন বছর ধরে সিসিইউ ইউনিটটিতে কোনো কার্যক্রম নেই।

এদিকে পরিচালকের প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনটি ডিজিটাল প্রসেসর সিস্টেম যা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি উল্লেখ করে দাম দেখানো হয়েছে ১০ লাখ ২৫ হাজার টাকা। প্রকৃতপক্ষে ডিজিটাল প্রসেসর সিস্টেম যে মেশিনটি সরবরাহ করা হয়েছে সেটি কোরিয়ার তৈরি। এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হচ্ছে না।

একইভাবে ভ্যাকুয়াম প্ল্যান্টের দাম দেখানো হয়েছে ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এটি পুরনো দন্ত বিভাগে স্থাপন করা হয়েছে। এই কক্ষটিও খোলা হয় না এবং এই যন্ত্রটিও ব্যবহৃত হয় না। পাশাপাশি বিআইএস মনিটরিং সিস্টেম কেনা হয়েছে ২৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায়। এই মেশিনটি অপারেশন থিয়েটারে স্থাপন করা হয়েছে বলা হলেও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এছাড়া চারটি থ্রি হেড কার্ডিয়াক স্টেথিসস্কোপের দাম দেখানো হয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এর দুটি সিসি ওয়ার্ড ও দুটি মেইল মেডিসিন ওয়ার্ডের দুই ইউনিটে আছে। এগুলো ব্যবহার হয়। সেই সঙ্গে দুটি ফাইবার অপটিক ল্যারিনগোসস্কোপ সেটের একটি প্রসূতি ওটিতে এবং একটি জেনারেল ওটিতে রয়েছে। এ দুটির দাম দেখানো হয়েছে ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

পাশাপাশি ছয়টি টোমেটিক স্কাব সিস্টেম চালু আছে, যার দাম দেখানো হয়েছে ১৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এগুলো চালু আছে রোগী আসলে দেখানো হয় বলে জানান ওই ওয়ার্ডের স্টাফ নার্স শুক্তি চক্রবর্ত্তী। একই সঙ্গে ১০টি চাইনিজ সাকশন মেশিন অপারেশন থিয়েটারে আছে। দাম দেখানো হয়েছে তিন লাখ টাকা। বর্তমানে সেটি চালু আছে।

২০টি ড্র সিস্টেম ইকুইপমেন্টের দেখানো হয়েছে চার লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা। আইসিইউ ওয়ার্ডে স্থাপিত। বর্তমানে ওয়ার্ড চালু না থাকায় কোনো কাজে লাগছে না। মেডিকেল কলেজ উন্নয়ন ও বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি ক্রয়-সংক্রান্ত প্রকল্পের অধীনে এ যন্ত্রপাতি কেনা হয়।

এদিকে ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত মোট পাঁচজন চিকিৎসক প্রকল্প পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তারা হলেন- আ স ম জাহাঙ্গীর চৌধুরী, এ বি এম শামসুল আলম, মো. ওমর ফারুক খান, গণপতি বিশ্বাস ও আবুল কালাম আজাদ। এর মধ্যে ওমর ফারুখ খান মারা গেছেন।

এর আগে দেশের অন্যতম মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য নির্মিত গ্রিনসিটিতে আসবাবপত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র ক্রয়ে লাগামছাড়া দুর্নীতির তথ্য ফাঁস হয়। একটি বালিশের পেছনে ব্যয় দেখানো হয় ৬ হাজার ৭১৭ টাকা। এর মধ্যে এর দাম বাবদ ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা আর সেই বালিশ নিচ থেকে ফ্ল্যাটে ওঠাতে খরচ ৭৬০ টাকা উল্লেখ করা হয়।

বি কে সিকদার সজল/আরএআর/এমএস