অভিমানি মতিন মাস্টারের শেষ ইচ্ছে?
আব্দুল মতিন মাস্টার। জাতীয় শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি। দলের জন্য লড়েছেন, পুলিশের মারধর খেয়েছেন। বিগত আন্দোলনগুলোতে শ্রমিক লীগের সভাপতি হিসেবে নের্তৃত্ব দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর কোনো সুযোগ সুবিধা দাবি করেননি, নেননিও কারও কাছ থেকে। সেই তুখোড় রাজনীতিবিদের অভিমানে এখন দিন কাটছেন।
২০১২ সালের ১৭ জুলাই থেকে তার এ অভিমান। ওই দিন তাকে ও শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক রায় রমেশ চন্দ্রকে না জানিয়ে শ্রমিক লীগের কমিটি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে প্রচার করা হয়। অথচ তিনি ও সাধারণ সম্পাদক এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না। শ্রম আইন অনুযায়ী সাবেক সভাপতি হিসেবে স্বাক্ষর দিতে হবে নতুন কমিটিতে। কিন্তু অদ্যবধি তার স্বাক্ষরের জন্য কেউ আসেননি তার কাছে। তারা নেত্রীকে ভুল বুঝিয়ে তার স্বাক্ষর জাল করে শ্রমিক লীগের কমিটি ছিনতাই করে নিয়ে গেছেন বলে তার দাবি।
সেই থেকে তার অভিমান। তবে তারপরও তিনি বসে থাকেননি। দুঃখটা বুকে রেখে দলীয় কর্মকাণ্ডেরর পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। দলীয় কোনো সুবিধা না চাইলেও এখন তার চাওয়া মৃত্যুর পর যেন তাকে দলীয় পাতাকা দিয়ে সমাহিত করা হয়।
একজন সফল সংগঠক। এক সময়ের তুখোড় শ্রমিক লীগ নেতা। তিনি আবদুল মতিন মাস্টার। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট নেতৃত্বের অভাবে পারেননি। ৬৯ থেকে অদ্যবধি শ্রমিক লীগের সঙ্গে আছেন। ৭৯ সালে তিনি শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। এরপর পাট শিল্প শ্রমিক কর্মচারী লীগ নামে জুট মিল সংক্রান্ত একটি কমিটি হলে সেই কমিটিতে তাকে ট্রেজারার করা হয়। আদমজী জুট মিল মাঠে শ্রমিক লীগের সম্মেলনে তাকে সহ-সাধারণ সম্পাদক করা হয়। পরে নেত্রী শেখ হাসিনা ৮১ সালের ১৭ এপ্রিল দেশে ফেরার পরে শ্রমিক লীগের কমিটি ভেঙে দেয়া হয়। তখন ২৬ জনের সাংগঠনিক কমিটি করা হলে সেখানে তিনি ছিলেন ৯ নম্বর সদস্য।
৮৩ সালে সম্মেলন হলে তাকে আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক করা হয়। ৮৭ তে সম্মেলনে তাকে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক করা হয়। ৯২ এর সম্মেলনে তিনি শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ৯৫ এর সম্মেলনে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালের ৩ জুলাই মহানগর নাট্য মঞ্চে কেন্দ্রীয় সম্মেলনে তাকে করা হয় শ্রমিক লীগের সভাপতি। ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি এ দলের সভাপতি ছিলেন। সততা ও দক্ষতার সঙ্গে পুরো বাংলাদেশের দলীয় শ্রমিকদের এবং শ্রমিকলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সংগঠন পরিচালনা করেন তিনি।
প্রবীণ এ রাজনীতিবিদ বলেন, আহসান উল্লাহ মাস্টারকে হত্যা করা হলে আন্দোলন সংগ্রাম করলাম। ওয়ান ইলেভেনের পর নেত্রী গ্রেফতার হলে আন্দোলন সংগ্রাম করলাম। বাংলাদেশের যেখানে শ্রমিকলীগের কমিটি ছিল না সেখানে গিয়ে কমিটি করেছি। নিজের টাকা খরচ করে সারা দেশে ভ্রমণ করে শ্রমিক লীগের সংগঠনকে দাঁড় করাই। দলের জন্য পৈতৃক সম্পত্তিও বিক্রি করতে হয়েছে আমাকে।
অভিমানি আব্দুল মতিন মাস্টার বলেন, আন্দোলন সংগ্রাম করার সময় একাধিকবার পুলিশ মাথা ফাটিয়েছে, মেরেছে। থানায় নিয়ে আটকে রেখেছেল পুলিশ, জেলেও গিয়েছি। পুলিশ কোমরে দড়ি বেঁধে মারধর করেছিল। এত কিছুর পরও কষ্ট পাইনি। তবে কষ্ট পেয়েছি যখন আমি শ্রমিকলীগের সভাপতির সমাপনী ভাষণ দেয়া অবস্থায় কমিটি ঘোষণা করা হয় নেত্রীকে না জানিয়ে ও আমার সঙ্গে কোনো প্রকার পরামর্শ না করে। সেই থেকেই মনের কষ্ট মনেই লালন করছি। বিগত দিনগুলোতে আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে থাকা এই নেতা বলেন, এখন তো শ্রমিকদের নেতা লাগে না। আমার নেত্রী শ্রমিকদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন। শ্রমিকদের ব্যাপারে নেত্রী সবই জানেন, বুঝেন। যেখানে যা লাগে তিনি তা দিয়ে দেন। এখন আর আন্দোলন করা লাগে না, চাওয়ার আগেই নেত্রী শ্রমিকদের দাবি পূরণ করে দেন। এখন শ্রমিকরা ভালো আছে বলে আমি মনে করি।
দলীয় নেত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ এ নেতা বলেন, আমি অসুস্থ হয়ে বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। তখন নেত্রী তৎকালীন শ্রমপ্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ানকে দিয়ে এক লক্ষ টাকা পাঠিয়েছেন। আমাকে মূল্যায়ন করায় আমি কৃতজ্ঞ নেত্রীর কাছে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা প্রেসক্লাবে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, জনগণের কাছে যারা ভালো সেই লোকদের দিয়ে দল গঠন করলে দলটা ভালো চলে, ভালো চলবে। নেত্রী যদি আমাকে দিয়ে কোনো কাজ করাতে চান আমি প্রস্তুত আছি। নেত্রী যদি আমাকে কিছু নাও দেয় আমি আওয়ামী লীগ করছি, করবো। তবে আমার শেষ ইচ্ছা মৃত্যুর পর যেন আমাকে দলীয় পতাকা দিয়ে সমাহিত করা হয়।
হোসেন চিশতী সিপলু/এমএএস/জেআইএম