বানরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নেপথ্যে

রিপন দে
রিপন দে রিপন দে মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০২:১২ পিএম, ২১ নভেম্বর ২০১৯

মৌলভীবাজারের বড়লেখায় একটি বানরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে এলাকাবাসী। এক মাস ধরে এই বানরের কামড়ে ৩৫ শিশু আহত এবং এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে এলাকাবাসী এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে দাবি করেছেন উপজেলার দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এনাম উদ্দিন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কোনো ব্যক্তির পালিত বা দলছুট একটি বানর এক মাস ধরে বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নে কাঁঠালতলী, রুকনপুর, বড়খলা, দক্ষিণ মুছেগুল, উত্তরভাগসহ আশপাশের গ্রামে তাণ্ডব চালায়। বানরটি সেলিম আহমদ (৮), মারুফ আহমদ (১০), বিউটি বেগম (১১) ছাড়াও প্রায় ৩০ জনকে আঁচড়ে-কামড়ে আহত করে। আহতদের বেশিরভাগের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এনাম উদ্দিনের দাবি, ১৫ শিশু এই বানরের কামড়ে গুরুতর আহত হয়ে ওসামানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছে এবং এক শিশু মারা গেছে। একই দাবি স্থানীয় ইউপি সদস্য আলতাফ হোসেনের।

স্থানীয়রা জানান, বানরের আতঙ্ক এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে, গত বৃহস্পতিবার (১৪ নভেম্বর) বড়লেখা উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ নিয়ে আলোচনা হয়। গত সপ্তাহে বন ও পরিবেশমন্ত্রী এলাকায় এলে তাকেও জানানো হয়। মন্ত্রী বন বিভাগকে বিষয়টি দেখতে নির্দেশ দেন। মন্ত্রীর নির্দেশের পর মৌলভীবাজার ওয়াইল্ড লাইফ বিভাগ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং তাদের কাছে বানর ধরার যন্ত্র নেই জানিয়ে ঢাকা থেকে ক্রাইম কন্ট্রোল টিম আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন। এর আগে বড়লেখা রেঞ্জের সহযোগী কর্মকর্তা শেখর রঞ্জন দাস স্থানীয়ভাবে খবর পেয়ে এলাকা পরিদর্শন করে মৌলভীবাজার জেলা কর্মকর্তাদের জানান।

মৌলভীবাজার ওয়াইল্ড লাইফ বিভাগ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আসার পর এলাকাবাসী ঢাকার ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিটের অপেক্ষা করতে থাকেন। প্রতিদিনই ইউপি চেয়ারম্যান এক বা একাধিক বার বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও দেখা মিলেনি। এর মধ্যে মঙ্গলবার সকালে আরও এক শিশুকে বানরটি কামড় দিয়ে আহত করে। এরপর উত্তেজিত গ্রামবাসী বানরটি মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। ভাতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে বিকেল ৩টার দিকে একটি ধানক্ষেত থেকে বানরটি আটক করা হয়। পরে কাঁঠালতলী বাজার সংলগ্ন স্থানে শত শত লোকের উপস্থিতি এবং সিদ্ধান্তে বানরটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। পরে বানরটি মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হয়।

বড়লেখার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা জুড়ি রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা এনামুল হক বানরটি মেরে ফেলার নির্দেশ দেন বলে একটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। এ বিষয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি কাউকে বক্তব্য দেইনি। আমি বনের দায়িত্বে, ওয়াইল্ড লাইফের ঘটনায় আমি মন্তব্য বা সিদ্ধান্ত দেয়ার কে। আমি বন বিভাগের লোক হয়ে বন্যপ্রাণী হত্যার নির্দোষ দেব সেটা কারও কাছেই বিশ্বাসযোগ্য হবে না।’

এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরে টিম পাঠানোর কথা বলেও কেন এলাকায় জানায়নি- এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়াইল্ড লাইফ মৌলভীবাজারের রেঞ্জ কর্মকর্তা জৌলহাস উদ্দিন বলেন, আমরা যেদিন পরিদর্শনে যাই সেদিন বানরটি অনেক খুঁজেও পাইনি এবং আমাদের কাছে সে ধরনের সরঞ্জামও নেই। আমরা ঢাকার ক্রাইম কন্ট্রোল টিমকে খবর দেই। টিম আসবে বলেছিল কিন্তু এরই মধ্যে বানরটি হত্যা করা হয়েছে এমন খবর পেয়েছি।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী ক্রাইম কন্ট্রোলের পরিচালক এস এম জহির আকন বলেন, আমরা খবর পেয়েছিলাম কিন্তু এরই মধ্যে বান্দরবানে একটি হাতি মারা যাওয়ায় আমাদের টিম সেদিকে চলে যায়। সেখান থেকে আসার পর যখন বড়লেখায় পাঠাব এরই মধ্যে খবর পাই বানরটি মেরে ফেলা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের টিমে মাত্র তিনজন ইন্সপেক্টর। এর মধ্যে একজন ট্রেনিংয়ের জন্য বিদেশে। মাত্র দুজন দিয়ে আমাদের সারাদেশের কাজ করতে হচ্ছে।

তবে বানরটির কামড়ে এক শিশু মারা গেছে দাবি করা হলেও অনুসন্ধানে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এমন কোনো তথ্য জানা নেই স্থানীয় থানায়ও।

বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াছিনুল হক জানান, এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। ঘটনা সত্য হলে অবশ্যই আমাদের জানার কথা। তারপরও আমি এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নেব।

আরএআর/জেআইএম