শেরপুরের ‘মাদার তেরেসা’ রাজিয়া সামাদ ডালিয়া

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি শেরপুর
প্রকাশিত: ০৪:৫৩ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২১

শেরপুরের পঁচাত্তরোর্ধ্ব মানবহিতৈষী রাজিয়া সামাদ ডালিয়া। বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। চেহারায় নেই কোনো ক্লান্তির ছাপ। অসহায় মানুষের জন্য কাজ করার জন্য স্থানীয়রা তার নাম দিয়েছেন ‘শেরপুরের মাদার তেরেসা’। মানুষের প্রয়োজনে গড়ে তুলেছেন ডায়াবেটিস হাসপাতাল, চালু করেছেন হার্ট ফাউন্ডেশন। এরই মধ্যে তার পৃষ্ঠপোষকতায় যাত্রা শুরু করেছে রাজিয়া সামাদ শিশু ফাউন্ডেশন ও আইটি সেন্টারের কাজ। শুধু তাই নয়, খেলাঘর থেকে শুরু করে গড়েছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও। মানবতার সেবার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শেরপুরের মহিয়সী এই নারী হয়ে উঠেছেন সবার প্রিয় ‘ডালিয়া খালামণি’।

দুস্থ রোগীর জন্য রক্তের ব্যবস্থা, বিশেষ রোগীকে কোনো বিশেষ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া, নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ, দরিদ্র শিক্ষার্থীকে পড়াশোনায় সহযোগিতা করাসহ এধরনের বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজ করে যাচ্ছেন রাজিয়া সামাদ।

মানবদরদি এই মানুষটির অবসর সময় কাটে বাগান পরিচর্যা আর বই পড়ে। সুযোগ পেলেই নিজের হাতে গড়ে তোলা ডায়াবেটিস হাসপাতালের রোগীদের সেবা করে সময় কাটান। শেরপুরে তার বাবার কবরের পাশে গড়ে তুলছেন হার্ট ফাউন্ডেশন, ছিন্নমূল শিশুদের জন্য করেছেন রাজিয়া সামাদ শিশু ফাউন্ডেশন। আমৃত্যু মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চান ডালিয়া।

জেলা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এই নারী শহরের দুর্গানারায়ণপুর এলাকার নিজবাড়ি ‘আনন্দধাম’ চত্বরে গড়ে তুলেছেন নানাজাতের দুর্লভ প্রজাতির সব ফুল বাগান।

‘পাতাবাহার খেলাঘর আসর’ শেরপুরের শিশু-কিশোরদের জন্য নিবেদিত একটি সংগঠন। ১৯৭২ সাল থেকে কাজ করে যাচ্ছে। টিনের ভাঙাঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ে। বর্ষায় পোকামাকড়ের ভয় থাকে। খেলাঘর কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় পাকা দালান তৈরি করা হবে। তবে অর্থের অভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছিল না। তখন এগিয়ে আসেন ডালিয়া খালামণি। একটি বিরাট অংকের অর্থ তুলে দেন খেলাঘর কমিটির হাতে। সাহসে ভর করে পাতাবাহারের ঘর নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলে। আজ পাতাবাহারের পাকাঘর হয়েছে।

সংস্কৃতি চর্চায়ও রাজিয়া সামাদ ডালিয়ার রয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান। জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মেলন পরিষদ শেরপুর জেলা শাখার তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), মাদকবিরোধী আন্দোলন শেরপুর, রক্ত সৈনিক বাংলাদেশ শেরপুর জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

jagonews24

বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম পরিচয় পৌষ সংক্রান্তির পিঠা উৎসব। শেরপুরের নারীদের একত্রিত করে ‘উজ্জয়িনী’ নামের একটি মহিলা সংগঠন গড়ে তুললেন। এই উজ্জয়িনী মহিলা সংগঠনের মাধ্যমে গত চার বছর ধরে শীতের পিঠা উৎসব হয়ে আসছে। খান বাহাদুর ফজলুর রহমান ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তা ও উজ্জয়িনীর ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর শেরপুরে দু-একবার বিনামূল্যে চক্ষু অপারেশনের আয়োজন করে থাকেন। তিনি তার বাড়িতে রেখে কয়েকজন এতিম ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াও করাচ্ছেন। গরিব ও অসহায় পরিবারকে থাকার জন্য ঘরের ব্যবস্থা করে দেন।

বাবা-মার পরিচয়বিহীন কুড়িয়ে পাওয়া দুই কন্যাশিশুকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে নিজের কাছে রেখে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। ১৯৯০ সালের দিকে কুড়িয়ে পাওয়া সেই দুই কন্যা এখন উচ্চতর পড়ালেখা শেষ করে এখন একজন ঢাকা সেনানিবাসে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে এবং অপরজন ঢাকা ভূমি অফিসে সার্ভেয়ার পদে চাকরি করছেন। দুই সন্তানের জননী রাজিয়া সামাদ ডালিয়া তাদেরকেও নিজের সন্তান বলে পরিচয় দেন।

প্রায় দুই দশক আগের কথা। একবার শ্রীবরদী বালিজুড়ি পাহাড়ে ‘ফাইমনি মারাক’ নামের এক গারো মেয়ের কুষ্ঠ রোগ হয়। পরিবারের সদস্যরা এই রোগকে ‘মরণব্যাধি’ আখ্যায়িত করে তাকে একটি টঙ বানিয়ে পাহাড়ের ঢালে হিংস্র বন্যপ্রাণির খাবারের জন্য রেখে আসে। সংবাদ পেয়ে সেই গারো মেয়েকে উদ্ধার করে নিজের বাড়িতে প্রায় দুই বছর রেখে চিকিৎসা করিয়ে ভালো করে পরিবারের কাছে ফিরতে সহায়তা করেছিলেন। সেই মেয়েটি এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। বর্তমানে অন্তত ১৫ জন হতদরিদ্র ছেলেমেয়ে তার মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা পেয়ে লেখাপড়া করে যাচ্ছে। যাদের মধ্যে কয়েকজন মেডিকেল ও প্রকৌশলীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন।

১৯৯৭ সালে চালু হওয়া শেরপুর ডায়াবেটিক সেন্টারটি বর্তমানে ডায়াবেটিক হাসপাতালে উন্নীত হয়েছে। সেই ডায়াবেটিক হাসপাতালে দরিদ্র রোগীদের সহায়তা করার জন্য তিনি সুদমুক্ত ঋণ ও আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা চালু করেছেন। যার উপকারভোগী এখন অনেক দরিদ্র রোগী। প্রতিবছর পাঁচ লাখ টাকার তহবিল থেকে প্রতিজনকে ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ দেয়া হয়।

ইনসুলিন কেনার জন্য দরিদ্র রোগীদের সহায়তা দেয়া হয়ে থাকে। শুধু ডায়াবেটিক হাসপাতাল নয়, আর্ত-মানবতার সেবায় তিনি সর্বদা সচেষ্ট থাকেন। দরিদ্র রোগীদের তিনি বিভিন্ন চিকিৎসক এবং হাসপাতালে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। শেরপুর জেলা হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার জন্য তিনি একজন আয়া রেখে দিয়েছেন, যার মাসিক বেতন রাজিয়া সামাদ ডালিয়া বহন করছেন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশ সুরক্ষা সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সম্প্রতি বৃক্ষরোপণ আন্দোলন ও রোপণকৃত বৃক্ষ রক্ষায় কমিউনিটি সভা করে যাচ্ছেন।

রাজিয়া সামাদ ডালিয়া শেরপুর শহরের খরমপুরে ১৯৪৩ সালের ১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। বাবা খান বাহাদুর ফজলুর রহমান। মা লুৎফুন্নেছা। বাবা দুজনই প্রয়াত। বাবা ছিলেন তৎকালীন অভিভক্ত বাংলার চিফ হুইপ। ১১ ভাইবোনের মধ্যে তিনি মধ্যম। চট্টগ্রাম মহিলা কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রিধারী ডালিয়ার বিয়ে হয় ১৯৬৪ সালের অক্টোবরে। স্বামী আব্দুস সামাদ সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ছিলেন। ঢাকার সোবহানবাগের সরকারি কলোনিতে কাটে তাদের দাম্পত্যজীবন।

jagonews24

এক মেয়ে ও এক ছেলে রেখে ১৯৮১ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর ডালিয়া ১৯৮৩ সালে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করেন। সাত বছর ওই স্কুলে চাকরির একপর্যায়ে অভিজাত পরিবারের মেয়ে ডালিয়া ব্যস্ত ঢাকার জৌলুস জীবন ছেড়ে ১৯৯০ প্রত্যন্ত অঞ্চল শেরপুর এলাকায় চলে আসেন। সমাজসেবার নেশায় নিজের জমানো অর্থ ও পারিবারিক সম্পদ কিছু বিক্রি করে তিনি মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেন।

বাবার নিজগ্রাম সদর উপজেলার ফটিয়ামারীতে প্রথমে ‘উপমা’ বিদ্যালয় এবং শহরের সজবরখিলা এলাকায় ‘উপমা হাসপাতাল’ চালু করেন। যাতে দরিদ্র মানুষ সুলভমূল্যে শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা পায়। এলাকা থেকে দরিদ্র নারীদের সংগ্রহ করে তাদের নিজের বাসায় রেখে নকশীকাঁথা সেলাই শেখানোর ব্যবস্থা করেন। যে প্রশিক্ষণ পেয়ে অনেক নারীই আজ স্বাবলম্বী হয়ে আত্মকর্মে নিয়োজিত হয়েছেন।

রাজিয়া সামাদ ডালিয়া জানান, মানবসেবায় আসার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন তার খালা। মানুষের কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে ঢাকার জমি, রাজশাহীতে শ্বশুরবাড়ির জমি, শেরপুরে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ওয়ারিশের সম্পত্তি সবই গেছে। কিন্তু তাতে কোনো আফসোস নেই তার।

তিনি বলেন, ‘আমি হয়তো সমাজটাকে বদলাতে চেয়েছি, সেটা করতে পেরেছি কি-না জানি না, তবে চেষ্টা করেছি। গভীর একটি জঙ্গলের সামনে ভোঁতা একটা দা হাতে নিয়ে সুগম পথ তৈরির জন্য এসেছিলাম। আমার যোগ্যতা অনুযায়ী সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি।’

‘একসময় নিজের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করেই সব করেছি। কিন্তু এখন আমার কাজে প্রতিনিয়ত আমার ভাই-বোন, ভাগ্নে-ভাগ্নি, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব শুভাকাঙ্ক্ষিরা প্রতিনিয়ত সহায়তা করে যাচ্ছেন। তবে কাজ করতে গেলে টাকা কোনো সমস্যা না, সমস্যা মানসিকতার। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কত লোকের পাশে দাঁড়াতে পারি এটাই আমার চিন্তা।’

রাজিয়া সামাদ ডালিয়া সম্পর্কে শেরপুর ডায়াবেটিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইমাম হোসেন ঠান্ডু বলেন, ‘ডালিয়া আপা আসলে একজন মহিয়সী নারী। তিনি তার সবকিছু সমাজের উন্নয়নের জন্য উৎসর্গ করেছেন। তিনি শেরপুরে এসেছেন, থাকছেন শুধুই মানুষের জন্য। আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য। এমন মানুষ সমাজে বিরল।’

শেরপুর পৌরসভার মেয়র গোলাম মোহাম্মদ কিবরিয়া বলেন, ‘তিনি নারী সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করছেন। তাকে দেখে অনেকেই মানবতার সেবায় এগিয়ে আসছেন। তিনি সমাজের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ী এবং অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।’

ইমরান হাসান রাব্বী/এসআর/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]