ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত হাওরের কৃষক, আছে দুশ্চিন্তাও

লিপসন আহমেদ লিপসন আহমেদ , সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৯:০৮ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০২১

আকাশে রোদ যেন কৃষকের মুখের হাসির ঝিলিক। মেঘ দেখলেই বুকটা ওঠে কেঁপে, দুরু দুরু করতে থাকে। ঝড়ের আশঙ্কায় এমন অবস্থা সুনামগঞ্জের হাওর জুড়ে। সোনামাখা রোদে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে হলুদ ধানের শীষ চকচকিয়ে উঠেছে। ফলে হাওরের পাড়ে পাড়ে এখন ধান কাটা মাড়াইয়ের খলা চলছে। কীভাবে ধানে কেটে ঘরে আনবেন তা নিয়ে ব্যস্ত কৃষকরা। কৃষকের ধ্যান-জ্ঞান সবই এখন হাওরকে ঘিরেই।

ইতোমধ্যে সুনামগঞ্জের হাওরে হাওরে শুরু হয়েছে ধান কাটার উৎসব। এই অঞ্চলে পয়লা বৈশাখ থেকে ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়ে থাকে বহুকাল আগে থেকেই। কিন্তু গত কয়েক বছর যাবত আগাম জাতের ধান আবাদ হওয়ায় কিছু ধান আগেই কাটা-মাড়াই শুরু হয়। এখন হাওরজুড়ে চলছে সেটিই।

কিন্তু প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় সময় কাটাতে হয় হাওরের কৃষকদের। একের পর এক সমস্যা লেগেই আছে। কৃষকদের অভিযোগ, সবাই মুখে বলেন কৃষকদের পাশে আছেন, তবে বাস্তবতা হলো কেউ তাদের পাশে নেই। হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে ধান কাটার এই মৌসুমে প্রতিবছরের মতো এবারও শ্রমিকের অভাব, আগাম বন্যা, ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কার পাশাপাশি হাওরের ঝাঙ্গালগুলো দিয়ে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় কাটা ধান বহন করা নিয়ে চিন্তিত কৃষকরা। তাদের দাবি, এসব সমস্যা যদি সরকার দুর করে দেয় তাহলে তারা চিন্তামুক্ত হয়ে হাওরের ধান ঘরে তুলতে পারবেন।

কৃষক রুস্তম মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিবছর ঋণ করে ধান ফলাই, কিন্তু চারা রোপণের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তায় পড়তে হয় যে, ধান ঘরে তুলতে পারব কিনা, নাকি বন্যায় নিয়ে যাবে। সুদে ঋণ নিয়েছি, সেই ঋণ সময়মতো পরিশোধ করতে পারব কিনা চিন্তা হয়। এছাড়া ধানের বাম্পার ফলন হলেও হাওরের মধ্যে কোনো পাকা রাস্তা না থাকায় সেই ধান কেটে ঘরে তুলতে আমাদের মহা দুর্ভোগে পড়তে হয়।’

কৃষক কুদরত আলী বলেন, ‘কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকার বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা নির্মাণ করে দেয় চলাচল করার জন্য, আর আমরা হাওরের কৃষকরা দীর্ঘদিন যাবত ধান আনতে রাস্তার প্রয়োজন বলে দাবি জানিয়ে আসছি, আমাদের কথা কেউ কানেই নেয় না।’

jagonews24

কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো এবারও হাওরে শ্রমিকের অভাব, আগাম বন্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবারের সবাই মিলে কষ্ট করে ধান কাটছি কিন্তু হাওরের মধ্যে দিয়ে যদি যানচলাচল উপযোগী ছোট করে রাস্তা নির্মাণ করে দেয়া হতো, তাহলে সেই ধান কেটে আমরা সহজেই ঘরে তুলতে পারতাম।’

জসিম মিয়া নামে আরেক কৃষক বলেন, ‘ধান কাটতে বর্তমানে হারভেস্টার মেশিন প্রয়োজন কিন্তু আমরা মেশিন ক্রয় করতে পারি না, মেশিনের দাম অনেক বেশি। সরকার যদি আমাদের আরও সুযোগ-সুবিধা দিত তাহলে আমরাও হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটতে পারতাম।’

এ বিষয়ে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল জাগো নিউজকে বলেন, ‘শনির হাওরের ছোট-বড় ২৫টি জাঙ্গাল চিহ্নিত করে স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে উন্নয়ন প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। আশা করি দ্রুত আমরা কৃষকের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারব।’

জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘সুনামগঞ্জ জেলায় এবার নতুন আরও হারভেস্টার মেশিন এসেছে। অন্য জেলা থেকে শ্রমিক আনারও চেষ্টা আছে। আশা করি ধান তুলতে কৃষকের কোনো সমস্যা হবে না।’

সুনামগঞ্জে এবার তিন লাখ ২৩ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে ধানের চাষা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। লক্ষ্যমাত্রা মোতাবেক উৎপাদন হলে কেবল সুনামগঞ্জ নয়, সারাদেশের খাদ্য চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখবে এই জেলা।

ইএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]