দুই বছর ধরে শিকলবন্দি কিশোর রহিম

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০৪:৪৪ পিএম, ০৫ অক্টোবর ২০২১

ফরিদপুরের বোয়ালমারীর কিশোর আব্দুর রহিম প্রায় দুই বছর ধরে শিকলবন্দি। এক দুর্ঘটনায় মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে সে। এরপর থেকে বন্দিজীবন কাটছে এ কিশোরের।

বোয়ালমারী উপজেলার ময়না ইউনিয়নের ময়না গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমানের ছেলে আব্দুর রহিম। হাবিবুর রহমানের সংসারে পাঁচ সদস্য। তাদের মধ্যে ছেলে রহিম মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় শিকলবন্দি, স্ত্রী শুকুরন বেগম (৪৫) অসুস্থ, মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। বৃদ্ধা শাশুড়ির কেউ না থাকায় তিনিও হাবিবুর রহমানের পরিবারের স্থায়ী সদস্য।

দরিদ্র হাবিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, স্থানীয় ময়না-ঠাকুরপুর বাজারে তিনি ঝাড়ুদারের কাজ করেন। ব্যবসায়ীরা তাকে ৫-১০ টাকা দেন। এতে তার দৈনিক এক থেকে দেড়শ টাকা আয় হয়। কোনো কোনো সময় টাকা আরও কম পান। তখন তার সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। আট শতাংশ জমির ওপর ভিটেটুকুই তার একমাত্র সম্বল।

jagonews24

তিনি বলেন, পাঁচ থেকে সাত বছর আগে রহিম তার খালাবাড়ি বেড়াতে যায়। সেখানে খেলতে গিয়ে নসিমন ঠেলাঠেলি করার সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে তার হাত-পা ভেঙে যায়। তখন হাত-পা ভাঙার চিকিৎসা করানো হলেও মাথায় আঘাত পাওয়ার বিষয়টি তাদের জানা ছিল না। এর বছরখানেক পরে কিশোর আব্দুর রহিম মাথায় যন্ত্রণা অনুভব করে। পরে ধীরে ধীরে সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।

রহিম মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এদিক সেদিক চলে যেতো। পরে অনেক চিকিৎসা করিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। এক পর্যায়ে অর্থাভাবে চিকিৎসাও বন্ধ হয়ে যায়। সে যাতে হারিয়ে না যায় সেজন্য তার কোমরে শিকল পরিয়ে রাখা হয়। এভাবে শিকলবন্দি জীবন কাটছে কিশোর রহিমের।

বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, রহিমের নামে একটি প্রতিবন্ধী ভাতা ছিল। এ পর্যন্ত দুই কিস্তি টাকা পাওয়ার পর অনলাইনে সমস্যা দেখিয়ে ভাতা বন্ধ রয়েছে। বিষয়টির এখনো সমাধান হয়নি। অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি সুযোগ-সুবিধাও পান না তারা। একমাত্র ছেলের চিকিৎসার পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতা কামনা করেছেন অসহায় বাবা হাবিবুর রহমান।

farid2

বোয়ালমারী উপজেলার বাসিন্দা ও একাধিক সামাজিক সংগঠনের সদস্য মো. সুমন রাফি জাগো নিউজকে বলেন, বিভিন্ন অসহায় মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা করাই আমাদের সংগঠনের কাজ। সংগঠনের কাজ করতে গিয়েই আমরা শিকলবন্দি রহিমের খোঁজ পাই। তার সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে নিয়মিত চিকিৎসা করা হলে তাকে ভালো জীবনে ফেরানো সম্ভব।

ময়না ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) পলাশ বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, পরিবারটি গরিব ও অসহায়। রহিম শিকলবন্দি এটাও সঠিক। তবে তার প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ড, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এক লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ঘর, একটি টিউবওয়েল ও এলজিএসপি প্রকল্প থেকে নগদ ১০ হাজার টাকা সাহায্য করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে বোয়ালমারী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা প্রকাশ চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তার ছোট ভাই দিলীপ কুমার বিশ্বাস রিসিভ করেন। তিনি বলেন, দাদা অসুস্থ। হার্টের বাইপাস সার্জারি করা হয়েছে। ঢাকা হার্ট ফাউন্ডেশনে ভর্তি আছেন। এ কারণে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

পরে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রেজাউল করিমের সঙ্গে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তার মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে শিকলবন্দি রহিমের ছবিসহ নাম-ঠিকানা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

এন কে বি নয়ন/এসআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]