২৪ বছর পর কারামুক্ত কামাল, উপহার পাওয়া সেলুনই এখন সম্বল

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি লক্ষ্মীপুর
প্রকাশিত: ০৮:১৫ পিএম, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১

অভাবী ঘরের ছেলে মিলন কামাল। এক সময়ের টগবগে এ যুবকের বয়স এখন ৫৫ বছর। জীবনের সোনালী সময়গুলো কেটেছে কারাগারে। ভাগ্যের নিয়তি যেন তাকে ২৪ বছর কারাগারে রেখেছে। ২৫ অক্টোবর মিলন কারামুক্ত হয়েছেন।

অপহরণ মামলায় যাবজ্জীবন সাজা শেষে লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা মিলন এখন মুক্ত বাতাসে। কারাজীবনে তিনি হারিয়েছেন স্ত্রীসহ জীবনের অপূরণীয় সময়। ঘরে এখন তার মা মোরশেদা বেগম ও ছোট তিনভাই আছেন।

এদিকে মিলনকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারিভাবে একটি সেলুন দোকান উপহার দেওয়া হয়েছে। এখন মিলন বিয়ে ও নতুন সংসারের স্বপ্ন দেখছেন। হারানো কারা সময়টা পুষিয়ে নিতে তিনি সময় অপচয় করতে রাজি নন। কর্মজীবন নিয়ে জীবনের বাকি দিনগুলোতে ব্যস্ততার দম পেলতে চান।

মঙ্গলবার (৭ ডিসেম্বর) বিকেলে জেলার সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের আবদুল্লাহপুর গ্রামে তাহমীদ সুপার মার্কেটে মিলনের সেলুন দোকানটি উদ্বোধন করা হয়। জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোছাইন আকন্দ প্রধান অতিথি হিসেবে ফিতা কেটে এর উদ্বোধন করেন।

জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নুরুল ইসলাম পাটওয়ারীর সভাপতিত্বে এতে উপস্থিত ছিলেন লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের জেল সুপার রফিকুল কাদের ও জেলার সাখাওয়াত হোসেন। এ সময় এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষও উপস্থিত ছিলেন।

মিলন ও তার এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৭ সালের মিলন রিকশা চালাতেন। ১৮ আগস্ট শহরের ঝুমুর এলাকায় তার রিকশায় এক শিশু মেয়ে যাচ্ছিলেন। তবে ভাড়া না থাকার ভয়ে মেয়েটি রিকশা থেকে ঝাঁপ দেয়। এতে ভাড়ার জন্য মিলন তাকে ধাওয়া করে। এক পর্যায়ে মিলন ওই মেয়েটির হাত ধরে টাকা চান। স্থানীয়রা মনে করেছিলেন, মেয়েটিকে তিনি অপহরণ করার চেষ্টা করছেন। ঘটনাস্থল থেকেই পুলিশ তাকে আটক করে। এরপর সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।

জেলা কারাগার সূত্র জানায়, আদালত মিলনের যাবজ্জীবন (৩০ বছর) সাজা দেন। এরমধ্যে কারাগারে শ্রম দেওয়ায় তার পাঁচ বছর ৯ মাস সাজা মওকুফ করা হয়। তিনি ২৪ বছর কারাবন্দি থেকে ২৫ অক্টোবর মুক্ত হন।

মঙ্গলবার মিলনের প্রতিবেশী ও ঘটনার সময়কার প্রত্যক্ষদর্শী ট্রাকচালক মো. শাহজাহান বলেন, রিকশায় ওঠা মেয়েটি টাকা না দিয়ে পালানোর সময় মিলন ধরে ফেলে। এ সময় কিছু না বুঝেই লোকজন তাকে ধরে পুলিশে দেয়। আমি ঘটনাস্থল থাকলেও পরে ট্রাক নিয়ে রায়পুরের দিকে চলে গিয়েছিলাম। আত্মীয়-স্বজনরা বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়ায় এতগুলো বছর তাকে জেলে থাকতে হয়েছে।

মিলন কামাল বলেন, কারাগারে বন্দিদের চুল কেটেছি। আমার পুনর্বাসনের জন্য জেল সুপারকে অনুরোধ করেছিলাম। এতে তিনি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছেন। কারাজীবনে অনেক কিছু হারিয়েছি। ঘরে মা-ভাইয়েরা আছে। এখন তাদের নিয়ে বাঁচতে চাই।

জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নুরুল ইসলাম পাটওয়ারী জাগো নিউজকে বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতির আওতায় কারামুক্ত মিলনকে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি সেলুন উপহার দেওয়া হয়। মিলনের ইচ্ছেতেই দোকানের নাম ‘মা হেয়ার কাটিং সেলুন’ নামকরণ করা হয়েছে।

লক্ষ্মীপুর কারাগারের জেল সুপার রফিকুল কাদের জাগো নিউজকে বলেন, সরকার কারাগারকে আসামিদের সংশোধনাগার হিসেবে তৈরি করেছে। সেখানে বিভিন্ন কাজে দণ্ডপ্রাপ্তদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মিলন সুস্থ শরীরে কারামুক্ত হয়েছে, এটি তার সৌভাগ্য। তাকে কেউ অপরাধী হিসেবে নেবে না। কারামুক্ত জীবন উপভোগ করতে সবাই তাকে সহযোগিতা করবে।

এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) আনোয়ার হোছাইন আকন্দ জাগো নিউজকে বলেন, অপহরণ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত মিলন এখন স্বাধীন। কিন্তু তাঁর একটি লক্ষ্য ছিল। এজন্য তাকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। তিনি এখন আর অপরাধী নন, পরিশ্রম করে আগামী জীবনকে উপভোগ করবেন। এজন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

কাজল কায়েস/এসজে/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]