দরিদ্র নারীদের পুষ্টিহীনতা জয়
শিশু ও নিজেদের পুষ্টিহীনতা রোধে সচেতনতা বাড়াচ্ছেন কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পার্শ্ববর্তী স্থানীয় ১৫০ প্রসূতির পাশাপাশি এক হাজার ৯শ নারী। পুষ্টিসমৃদ্ধ নানা জাতের শস্য উৎপাদনে বাড়ির পরিত্যক্ত জমিতে চাষও করছেন নিজেরা।
সেসব টাটকা সবজি তুলে শিশুদের খিচুড়ি ও নিজেরা নানাভাবে খেয়ে দূর করছেন পুষ্টিহীনতা। বিপুল রোহিঙ্গাকে স্থান দিতে গিয়ে নিজেদের আবাস, চাষের জমি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া স্থানীয়দের সাধ্যের মাঝে পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিতে উদ্বুদ্ধ করতে সবজির বীজ, প্রশিক্ষণ ও অর্থসহ নানাভাবে সহযোগিতা করেছে বেসরকারি দুটি সংস্থা।
কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৩ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশের গ্রাম তাজনিমার খোলা। সেই গ্রামের সাদিয়া আকতার (২৫) বলেন, পাহাড়ের আশপাশের জমিতে অন্যদের মতো আমরাও নিয়মিত চাষবাদ করতাম। কিন্তু ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ঢলকে থাকার স্থান দিতে গিয়ে চাষের জমিগুলো খোয়া গেছে।
সবজি আগেও আমরা নিয়মিত খেয়েছি। কিন্তু বাচ্চাদের পুষ্টিহীনতা লেগেই থাকতো। ২০১৯ সালে ওয়ার্ল্ড ভিশন নামে একটি এনজিও এলাকায় এসে পুষ্টি নিয়ে কথা বলে। বাচ্চাদের পুষ্টিহীনতা দূর করতে খিঁচুড়ি খাওয়ানোর পরামর্শ দেয়। আমাদের নিত্য খাবারের অনুষঙ্গ দিয়েই খিঁচুড়ি তৈরির পদ্ধতি দেখালেন সঙ্গে আসা এক আপা। সেই থেকে চাল-ডাল-লাউ-কুমড়া-শাক-ডিম-কলা ইত্যাদির সংমিশ্রণে খিঁচুড়ি তৈরি করে বাচ্চাকে খাওয়ানোর পর বাচ্চার স্বাস্থ্য দিন দিন ফিরেছে। এটা দেখে ঘরে ঘরে তথ্যটি ছড়িয়ে দিচ্ছি আমরা।
গোল চেহের বেগম (৪৫) বলেন, প্রথম যখন এলাকায় বৈঠক হয় তখন আমিও সেখানে ছিলাম। আমার দুধের নাতিটা খুবই ক্ষীণ ছিলো। বৈঠক থেকে শেখা তথ্যমতো খিঁচুড়ি তৈরি করে নাতিকে খাওয়ানো হলো। মনভরে খাচ্ছে দেখে পালা করে নিয়মিতই খাওয়ানো হয়। মাসখানেক পর সবল হতে শুরু করে নাতি। এখন বাড়ির পরিত্যক্ত জমিতে শাক-সবজি নিয়মিত চাষ করা হচ্ছে। পরিবারের প্রসূতি বউ-মেয়ে সবাইকে সেই নিয়ম পালন করানো হচ্ছে।

মোহেছেনা আকতার (২১) নামে গর্ভবনারী বলেন, ক্ষুধা মেঠাতে খাবার খেলেও অভাবের কারণে পুষ্টি কার্যক্রম সম্পর্কে আগে ধারণা ছিলো না। মাসিক নিয়মিত বৈঠকে এসে এখন রপ্ত করেছি। শাক-সবজি ছাড়াও মাছ-মাংসের যোগান নিশ্চিত করতে ইউএসএআইডি এবং ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ নামের এনজিও কর্তৃক দেয়া ১৫ হাজার টাকা অনুদান থেকে মুরগির মিনি খামার ও পুকুরে মাছ ফেলেছিলাম। সেখান থেকেই এখন নিয়মিত আমিষের জোগান হচ্ছে।
শুধু সাদিয়া, মোহেছেনা, খালেদা ও রশিদা নন, কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প অধ্যুষিত রাজাপালং, জালিয়াপালং ও পালংখালী এবং টেকনাফের হ্নীলা ও বাহারছরা ইউনিয়নের দু’হাজারের অধিক নারী পুষ্টিহীনতা রোধের পাশাপাশি সংসারে স্বচ্ছলতাও আনছেন। এসব বিষয়ে সন্তানদেরও সচেতন করে তুলছেন তারা।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের উখিয়া অফিসের কর্মী আয়শা খানম জানান, রোহিঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত হোস্টকমিউনিটির পরিবারগুলোতে পুষ্টিহীনতা দূর ও স্বাবলম্বী করতে ইউএসএআইডির অর্থায়নে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সহযোগিতায় দু’বছর আগে চালু হয় ইমার্জেন্সি ফুড সিকিউরিটি প্রোগ্রাম (এফএফপি)। এ প্রকল্পের আওতায় উখিয়া-টেকনাফের নির্ধারিত ইউনিয়নগুলোর বাড়ি বাড়ি গিয়ে সহায় সম্বল ও কর্মহীন নারীদের বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষে প্রথমে উদ্বুদ্ধ ও পরে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সবজি চাষে মনোযোগী করা হয়। সচেতন করা হয় পুষ্টিজ্ঞান সম্পর্কেও। সপ্তাহে অন্তত দুবার এসব উপকারভোগী নারীদের খোঁজ নেওয়া হয়। সবজি পরিচর্যা সম্পর্কেও তাদের ধারণা দেওয়ার কাজ করেন কর্মীরা।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের উখিয়া অফিসের ফিল্ড অফিসার কৃষিবিদ আব্দুর রউফ জানান, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত উখিয়ার জালিয়াপালং, রাজাপালং, পালংখালী ও টেকনাফের হ্নীলা এবং বাহারছড়া ইউনিয়নের দু’হাজার নারীকে পুষ্টি বিষয়ক কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়। ১০-১৫ জনের গ্রুপে একজন লিড মাদার নির্বাচন করে সদস্যদের নিয়ে মাসে একটি পুষ্টি মিটিং ও একটি খিঁচুড়ি মিটিং করে সচেতনতা বাড়ানো হয়। পরিবারের সদস্যদের প্রতিদিন কমপক্ষে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হাত ধোঁয়া, প্রথম টিকা হিসেবে ভূমিষ্ট শিশুকে মায়ের সালদুধ খাওয়ানো, গর্ভাবস্থায় চেক আপসহ নানা বিষয়ে সচেতন করা হয়েছে। সঙ্গে সবজিসহ ক্ষেতখামার বিষয়েও প্রশিক্ষণ দিয়ে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। সবজি চাষের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার ২২৯ জন নারীকে।

তার মতে, যারা স্বাবলম্বী হয়েছেন তাদের দেখাদেখি অন্য নারীরাও এগিয়ে আসছেন। প্রশিক্ষণে সবজি চাষে তাদের মনোযোগী করতে পারলেই আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না।
পালংখালী ইউপি ৪নং ওয়ার্ড (তাজনিমার খোলা) সদস্য মিসবাহ উদ্দিন সেলিম বলেন, আমার এলাকার অধিকাংশ পরিবার খেটে খাওয়া। দিন এনে দিন খাওয়া এসব পরিবার রোহিঙ্গায় চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। প্রশিক্ষণ পেয়ে পুষ্টি চাহিদা ও খাদ্যের গুণগত মান এবং দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাড়ির পার্শ্ববর্তী পরিত্যক্ত জমিতে সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করে স্বাবলম্বীতে সফলতা দেখছি। অনেকের সংসারে স্বচ্ছলতা আসার পাশাপাশি পুষ্টিগুণে অনেক পরিবার আল্লাহর রহমতে ভালো দিন কাটাচ্ছে।
উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রনজন বড়ুয়া নোবেল বলেন, কুসংস্কারের কারণে স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ বা গর্ভকালীন চেকআপে রিমোট এরিয়াগুলোর দরিদ্র নারীরা আগে হাসপাতালে তেমন আসতো না। কিন্তু বছর দেড়েক সময়ে স্বাস্থ্যসেবা নিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা হাসপাতাল ও ওয়ার্ড ভিত্তিক কমিউনিটি ক্লিনিকে আসা বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, এনজিওগুলোর স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রোগ্রামে অংশ নিয়ে সচেতনতা বাড়ায় গর্ভবতী, প্রসূতি ও শিশুদের হাসপাতালমুখীতাও বেড়েছে। শিশু এবং নিজেদের পুষ্টিহীনতা দূর করতে নিজেরাই উদ্যোগী হচ্ছে। এটা অবশ্যই ভালো লক্ষ্মণ।
এফএ/এমএস