পাঠ্যবইয়ে ভাষাসৈনিকদের জীবনী তুলে ধরার দাবি

আব্বাস আলী
আব্বাস আলী আব্বাস আলী , জেলা প্রতিনিধি নওগাঁ
প্রকাশিত: ১২:২২ পিএম, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ বাঙালি জাতির চির প্রেরণা ও অবিস্মরণীয় একটি দিন। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, এখন সারা বিশ্বের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল ঔপনিবেশিক প্রভুত্ব ও শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ এবং জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষ। কিন্তু যাদের বিনিময়ে এর সূচনা তার সঠিক ইতিহাস আমাদের অনেকেরই অজানা। যার হাতে তৈরি হয়েছিল দেশের প্রথম শহীদ মিনার, তিনি নওগাঁর কৃতি সন্তান ডা. মঞ্জুর হোসেন। তিনি ‘বিপ্লব দা’ হিসেবে খ্যাত।

জানা যায়, নওগাঁ সদর উপজেলার সুলতানপুর মহল্লার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ডা. মঞ্জুর হোসেন। বাবা মোবারক আলী ও মা নুরুন নাহারের আট সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। ১৯২৮ সালে ১৫ জুন জন্মগ্রহণ করেন। আর ১৯৬৮ সালে ৪ ডিসেম্বর মাত্র ৪০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৪৩ সালে নওগাঁ কেডি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৪৫ সালে কলকাতা থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৫৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন তিনি।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেও চাকরি না করে আজীবন সাধারণ মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। এমবিবিএস পাস করে নিজ জন্মভূমিতে পেশাজীবন শুরু করেন। তার চার ছেলে ও দুই মেয়ে।

৫২’র ভাষা আান্দোলনে অত্যন্ত সাহসী ও সংগ্রামী ভূমিকায় ছিলেন ডা. মঞ্জুর হোসেন। তখন তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র। ১৯৪৯ সালে সরকারি স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দিবসে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে গোলাম মাওলার কক্ষে ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এতে সংগ্রাম কমিটিতে মতবিরোধ দেখা দেয়। সেখানে তিনি সাহসী ও দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন ‘চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙবোই ভাঙবো।’

মেডিকেল ব্যারাকে এক স্বতস্ফুর্ত সমাবেশে প্রতিবাদী বক্তব্য দিয়েছিলেন ডা. মঞ্জুর হোসেন। সভায় রাতে ফজলুল হক হলের পুকুর পাড়ে ১১ জন ছাত্রনেতার ১৪৪ ধারা ভঙ্গের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের গোপন বৈঠকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন তিনি।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে দলে দলে ছাত্র-ছাত্রীরা চারজন করে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে এক ধরনের সত্যাগ্রহে অংশগ্রহণ করেন। স্লোগান দিয়ে বের হলে পুলিশ এসে ছাত্রদের গ্রেফতার করে ট্রাকে তোলে। এক পর্যায়ে প্রায় ১০ হাজারের বেশি ছাত্র-ছাত্রী গ্রেফতার, লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের মধ্যে দিয়ে মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে জমায়েত হন। বিকেল ৩টায় পরিষদের অধিবেশনের পূর্বেই ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ শুরু হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ বিকেল ৪টার দিকে গুলি চালায়।

এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন হাবিবুর রহমান শেলী, ডা. মঞ্জুর হোসেন ও আকমল হোসেন। দ্বিতীয় দলে ছিলেন ইব্রাহিম তোয়াহা, আব্দুস সামাদ, আনোয়ারুল হক খান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। ছাত্রীদের মধ্যে শাফিয়া খাতুন, নিলীমা ইব্রাহিম, রওশন আরা বাচ্চু ও শামসুন নাহার।

ওইদিন ২৩ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে কয়েকজন ছাত্রনেতা শহীদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে রাতেই নিজেরা ইট, সিমেন্ট ও বালু দিয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। এই প্রথম শহীদ মিনারের অন্যতম কারিগর ছিলেন ডা. মঞ্জুর হোসেন।

পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। সরকার বিরোধী বলিষ্ঠ নেতৃত্বের জন্য বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে অত্যন্ত সাহসী ও সংগ্রামী ভূমিকা পালন করায় সহযোদ্ধারা তাকে ‘বিপ্লব দা’ উপাধি দিয়েছিলেন।

একুশে আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় তিনি গ্রেফতার হন এবং করাভোগ করেন। আন্দোলন ছাড়াও পরবর্তীকালে সংঘটিত এ দেশের বহু গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৈনিক ছিলেন তিনি। পাকিস্তান সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার কারণে ১৭ বার গ্রেফতার হয়েছিলেন।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষের পাশে থেকে তাদের চিকিৎসা প্রদান করেছেন। গরিব রোগীদের বিনা টাকায় চিকিৎসা এমনকি তাদের ওষুধ পর্যন্ত কিনে দিয়েছেন। অনেক জটিল রোগীকে নিজ খরচে ঢাকায় পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন।

‘গরিবের ডাক্তার’ খ্যাত এই মানুষটি চিকিৎসার পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। বাবার উদ্যোগ ও সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সাপ্তহিক দেশ বানী’র সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন ১৯৬০ সালে। ১৯৬৪ সালে ‘তহশীলদারের দূর্ব্যবহার পরিণামে গলায় গামছা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হলে পত্রিকার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

পাঠ্যবইয়ে ভাষাসৈনিকদের জীবনী তুলে ধরার দাবি

এতে নিম্ন আদালতে তিন মাসের কারাদণ্ড হয় তার। পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন। এছাড়া তিনি আবৃত্তি, সংগীতচর্চা ও লেখালেখি করতেন।

রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন একজন নির্লোভ, ত্যাগী সৎ ও আদর্শবান মানুষ। সারাজীবন সংসার ও নিজের জন্য কিছু না করে নওগাঁবাসী তথা দেশ ও জাতির জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন। ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) রাজশাহী জেলার সভাপতি পদে আসীন ছিলেন।

নওগাঁর স্থানীয় একটি সামাজিক সংগঠন ‘একুশে পরিষদ’ তাদের নিজস্ব গবেষণায় ডা. মঞ্জুর হোসেনের ইতিহাস তুলে ধরেন।

ডা. মঞ্জুর হোসেনের তৃতীয় ছেলে সাবেক কাউন্সিলর হাসান ইমাম তমাল বলেন, যে ১১ জনের নেতৃত্বে ১৪৪ ধারা ভাঙা হয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম একজন আমার বাবা। বিশ্বের মধ্যে একমাত্র আমরাই যারা ভাষার জন্য সংগ্রাম করেছি। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সংগ্রাম শুরু হয়ে ১৯৭১ এ দেশ স্বাধীনের মধ্যে দিয়ে সমাপ্ত হয়। ভাষা সংগ্রামে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সরকার ২০০২ সালে বাবাকে ‘একুশে পদক (মরণোত্তর)’ দেয়। সেসময় ভাষার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তাদের অনেকেই এখনো স্বৃকীতি পাননি।

তিনি বলেন, প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি আসলে শহীদ মিনারে আমরা হুড়োহুড়ি করে ফুল দিই। এখনো অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই। আগামী প্রজন্ম জানবে না শহীদ মিনার আসলে কী? সরকারের উচিৎ পাঠ্যবইয়ের সিলেবাসে ভাষাসৈনিকদের আত্মজীবনী তুলে ধরা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের মর্যাদা প্রদান করা। এছাড়া সারাদেশে একই আদলে শহীদ মিনার তৈরির পাশাপাশি নওগাঁয় বড় আকারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার তৈরির দাবি জানান তিনি।

পাঠ্যবইয়ে ভাষাসৈনিকদের জীবনী তুলে ধরার দাবি

স্বামীর স্মৃতিচারণ করে মরহুম ডা. মঞ্জুর হোসেনের স্ত্রী জাকেরা জামানী বলেন, একদিন বিকেলে বাজার করার জন্য ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়ি ফেরেননি না। পরে লোকজন এসে জানায় স্বামীকে পুলিশ ধরে গেছে। সন্ধ্যার পর ছেলেরা বাজার করে নিয়ে আসার পর রাতের রান্না হয়। তিনি নিজের জন্য কিছুই করেননি। সব সময় সমস্যার মধ্যে তার জীবনটা কেটেছে। অনেকবার জেলহাজত খেটেছেন।

ডা. মঞ্জুর হোসেনের চাচাতো ভাই বয়জ্যেষ্ঠ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তিনি ছিলেন সিংহপুরুষ। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন থেকে দেখতাম ভাই ছিলেন পরিশ্রমী ও মিশুক প্রকৃতির। এরপর আমাদের যখন একটু বুদ্ধি হলো তখন তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াশুনা শুরু করেন। তখন তার কাছ থেকে শুনতাম ভাষা আন্দোলনের কথা। যা শুনে আমাদের গা শিহরিত হয়ে উঠত।

একুশে পরিষদ নওগাঁর সভাপতি অ্যাডভোকেট ডিএম আব্দুল বারী বলেন, ১৯৫২ সালে অগ্নিঝরা দিনগুলোতে সামনের সারিতে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ডা. মঞ্জুর হোসেন। তাকে ‘বিপ্লব দা’ হিসেবে সবাই চিনতেন। ভাষা সংগ্রামে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ফ্রিতে রোগীদের চিকিৎসা দিতেন। ডা. মঞ্জুর হোসেন ছিলেন একটি অবিস্মরণীয় নাম, একজন দ্রোহের প্রতীক এবং সাম্যবাদী মানুষ। তিনি মনে প্রাণে যা বিশ্বাস করতেন তাই করতেন। তার যাপিত জীবন ছিল ত্যাগের এবং মহিমান্বিত।

তিনি বলেন, ভাষা সৈনিকদের মধ্যে স্থানীয় ভাবে ১৯৯৫ সালে ডা. মঞ্জুর হোসেনকে প্রথম একুশে পরিষদ পদক (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। এমনকি তিনি যেখানে চিরনিন্দ্রায় শায়িত আছেন সে কবরটিও অনেকগুলো কবরের মধ্যে শনাক্তকরণ ছিল না। পরবর্তীতে একুশের পরিষদ নওগাঁ’র উদ্যোগে ২০১১ সালে কবর শনাক্ত করে বাঁধাই করে ফলক লাগানো হয়। যেখানে প্রতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি তার রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও পুষ্পস্তর্বক অর্পণ করা হয় বলে জানান এ সংগঠক।

ভাষা সৈনিক ডা. মঞ্জুর হোসেনের জীবনী স্মরণ করে সাংবাদিক ও কলামিস্ট, মুক্তিযোদ্ধা এবিএম রফিকুল ইসলাম বলেন, ভাষার জন্য যখন ঢাকায় আন্দোলন শুরু হয় তখন আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়। এতে অনেকেই শহীদ হন। এরপর ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। সেসময় তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হলে নওগাঁয় চলে আসেন। এরপর ডা. আমজাদ হোসেন, অ্যাডভোকেট বয়তুল্ল্যাহ, এমএ রকীব ও খন্দকার মকবুল হোসেনকে নিয়ে ভাষা সংগ্রাম সংগঠিত করে হরতাল ও অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। ভাষা যদি না থাকে আমাদের অস্বিত্ব থাকবে না। ভাষা কেন্দ্রীক যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন অল্প সময়ে তিনি নওগাঁর মানুষদের বোঝাতে এবং প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

এফএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।