টাঙ্গাইলে আশ্রয়ণের ঘরে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল, দিশেহারা ৪০ পরিবার

আরিফ উর রহমান টগর আরিফ উর রহমান টগর টাঙ্গাইল
প্রকাশিত: ০৪:২০ পিএম, ২৪ নভেম্বর ২০২২

প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারের ঘরে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের উপদ্রবে দিশেহারা টাঙ্গাইলের সুবিধাভোগী ৪০টি পরিবার। রীতিমতো বিদ্যুৎ বিল নিয়ে দিশেহারা সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চিলাবাড়ী আশ্রয়ণ প্রকল্পের ওই পরিবারগুলো। এছাড়া পয়ঃনিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা, যাতায়াত ব্যবস্থা, গৃহনির্মাণে ত্রুটিসহ নানা সমস্যায় দিন কাটাচ্ছেন আশ্রয়ণের বাসিন্দারা। সমস্যা সমাধানে প্রশাসনসহ বিদ্যুৎ বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় দুই বছর ধরে চিলাবাড়ী আশ্রয়ণ কেন্দ্রে বসবাস করছেন ৪০ পরিবারের প্রায় দেড় শতাধিক সদস্য। দুই শতাংশ জমিসহ উপহারের ঘরে বসবাস করার পাশাপাশি বাড়তি জমিতে বিভিন্ন সবজির চাষ করছেন তারা।

টাঙ্গাইলে আশ্রয়ণের ঘরে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল, দিশেহারা ৪০ পরিবার

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চিলাবাড়ীতে আশ্রয়ণের ঘর নির্মিত হয়।

চিলাবাড়ী আশ্রয়ণে বসবাসরত গৃহিনী তিশার অভিযোগ, চলতি বছরের ২৮ আগস্ট তার বিদ্যুৎ বিল আসে ১ হাজার ৬৭০ টাকা, সেপ্টেম্বর মাসে ১ হাজার ৯১৫ আর অক্টোবর মাসে বিল এসেছে ১ হাজার ৩৯৫ টাকা। ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল আসায় তিনি চরম ভোগান্তি আছেন। বিদ্যুৎ বিলের টাকা পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

টাঙ্গাইলে আশ্রয়ণের ঘরে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল, দিশেহারা ৪০ পরিবার

তিনি জানান, কেন্দ্রে বসবাসরত তাদের অংশের ১০ ঘরের জন্য একটি টিউবওয়েল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দের টিউবওয়েলের পানিতে আয়রন থাকায় তাদের খাওয়াসহ ব্যবহারে চরম সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া নেই ড্রেন ও যাতায়াতের রাস্তা। এ কারণে ব্যবহৃত পানি অন্যের জমিতে যাচ্ছে। আর হাঁটাচলাও করতে হচ্ছে অন্যের জমির ওপর দিয়ে। ওই পানি আর হাঁটাচলার কারণে প্রায় প্রতিদিনই তাদের প্রতিবেশীদের কটূ কথা শুনতে হচ্ছে।

আরেক গৃহিনী শাহনাজ জানান, চলতি বছরের ২৮ আগস্ট বিদ্যুৎ বিল আসে ১ হাজার ২৫ টাকা, সেপ্টেম্বর মাসে ১ হাজার ২৭৮ আর অক্টোবর মাসে বিল এসেছে ১ হাজার ৪৭৭ টাকা। রিকশাচালক স্বামীসহ তিন সদস্যের সংসার তার। ঘরে একটা ফ্রিজ, রাইস কুকার, ফ্যান আর লাইট ব্যবহার করেন।

টাঙ্গাইলে আশ্রয়ণের ঘরে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল, দিশেহারা ৪০ পরিবার

এই গৃহিনী অভিযোগ করেন, মিটার দেখতে কেউ না আসলেও প্রায় প্রতিমাসেই তাকে বিল দিতে হচ্ছে পনেরশ থেকে দুই হাজার টাকা।

তিনি বলেন, গরিব মানুষ বলেই তো আমরা আশ্রয়ণের ঘরে আসছি। এরপরও আমাদের গুনতে হচ্ছে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের টাকা। এত টাকা পরিশোধ করতে চরম কষ্ট হচ্ছে।

আশ্রয়ণের বাসিন্দা গৃহিনী আন্না খাতুন বলেন, যারা ব্যাটারিচালিত ভ্যান চার্জ দিচ্ছে, তাদের বিদ্যুৎ বিল ১০০ থেকে দেড়শ টাকা আসলেও আমি ঘরে একটা ফ্যান আর বাল্ব ব্যবহার করি তাতেই প্রতিমাসে বিল আসছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা।

টাঙ্গাইলে আশ্রয়ণের ঘরে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল, দিশেহারা ৪০ পরিবারটাঙ্গাইলে আশ্রয়ণের ঘরে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল, দিশেহারা ৪০ পরিবার

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ অফিসে বাড়তি বিলের বিষয়ে জানানো হলেও তারা বলেন, বিল যা আসবে তাই দিতে হবে। আমরা গরিব হওয়ায় তারা কথা শোনেন না।

গৃহিনী রাহেলা খাতুন বলেন, একটা ফ্রিজ, ফ্যান আর লাইট ব্যবহার করি। তাতেই বিদ্যুৎ বিল আসছে ১৪০০-১৫০০ টাকা। এই মাসে ১৪৭৭ টাকা বিল এসেছে। আমরা গরিব মানুষ এত টাকা বিল দিলে খাবো কী?

তিনি বলেন, ঘরগুলোর অনেক সমস্যা। হাত দিয়ে চিমটি দিলে ঘরের প্লাস্টার খসে পড়ছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ চলাচলের রাস্তা না থাকায় বেশ কষ্ট ভোগ করতে হয়।

আইয়ুব আলী বলেন, এক বছর হলো এই আশ্রয়ণের ঘরে বসবাস করছি। বেশ কয়েকদিন ধরে পানির ট্যাংকির সমস্যায় আছি। পানি ব্যবহার করতে পারছি না। টানা বৃষ্টির কারণে ট্যাংকির নিচের মাটি সরে যাওয়ায় পানি তোলা যাচ্ছে না। এ কারণে ট্যাংকির পানি ব্যবহার বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ট্যাংকির পানিতে প্রচুর আয়রন। তারপরও ট্যাংকির পানি সরবরাহ ঠিক থাকলে পানির সমস্যা অনেকটা লাঘব হয়।

আশ্রয়ণ প্রকল্পটিতে এক বছর ধরে বসবাস করছেন ঝর্ণা বেগম। তিনি বলেন, থাকার জমি ছিল না, প্রধানমন্ত্রী ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এখানে আমরা ভালো আছি। পরিবারের সবজি খাওয়ার যোগান দিতে বাড়তি জমিতে লাউ আর বরবটি আবাদ করছি।

দাইন্যা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য শহীদ সরকার বলেন, ড্রেন, যাতায়াতের সড়ক না থাকাসহ টিউবওয়েলের পানিতে আয়রন ওঠায় আশ্রয়ণের বাসিন্দারা আমার কাছে অভিযোগ করেছেন। তবে এ বিষয়গুলো দেখভালের দায়িত্বে আছে উপজেলা প্রশাসন।

টাঙ্গাইলে আশ্রয়ণের ঘরে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল, দিশেহারা ৪০ পরিবার

তিনি বলেন, এই গ্রামে টিউবওয়েলের জন্য ৬০ ফুট পাইপ গাড়লেই ভালো পানি পাওয়া যেত। সেখানে টিউবওয়েলের পাইপ গাড়া হয়েছে ২০০ ফুট। এ কারণে পানিতে আয়রন উঠছে।

টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশল মো. শাহগির হোসেন বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পটিতে কয়েকটি ডিজিটাল মিটার রয়েছে, এছাড়া বেশিরভাগই প্রিপেইড মিটার। তবে ডিজিটাল মিটারেও ভৌতিক বিল বা গড় বিল করার সুযোগ নেই। এছাড়া কেউ আমাকে এমন কোনো অভিযোগও করেননি। এরপরও যদি এখন কোনো ভুক্তভোগী থেকে থাকেন, তিনি অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চিলাবাড়ী আশ্রয়ণে যাতায়াতের সড়ক, জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশনের সমস্যার কথা স্বীকার করে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রানুয়ারা খাতুন বলেন, নদী সংলগ্ন আশ্রয়ণ কেন্দ্রগুলোর ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চিলাবাড়ী আশ্রয়ণের আশপাশে কোনো নদী বা খাল না থাকায় ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশনের সমস্যা নিরসন সম্ভব হয়নি। তবে সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, টিউবওয়েল স্থাপনের কাজ করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ। টিউবওয়েলের পানিতে আয়রন থাকায় ওই পানি ব্যবহার করতে সমস্যা হচ্ছে এমন অভিযোগ পেয়ে জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তবে কেন এখনো পানির সমস্যা নিরসন করা হয়নি বিষয়টি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানাতে পারবো।

তবে দ্রুতই পানির সমস্যা সমাধান করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইবনে মায়াজ প্রামাণিক বলেন, টাঙ্গাইলের পানিতে পর্যাপ্ত আয়রন রয়েছে। পানি ব্যবহার উপযোগী করতে আশ্রয়ণের টিউবওয়েলে ফিল্টার স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুত কার্যক্রম শুরু করা যাবে।

এমআরআর/এসআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।