রাজবাড়ীতে বিদ্যুতের নতুন গ্রাহকদের দেওয়া হচ্ছে পুরাতন মিটার

রুবেলুর রহমান
রুবেলুর রহমান রুবেলুর রহমান , জেলা প্রতিনিধি রাজবাড়ী
প্রকাশিত: ০১:৩৬ পিএম, ০১ ডিসেম্বর ২০২২

রাজবাড়ীতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে বিদ্যুতের নতুন নতুন গ্রাহক। তবে অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে লাইন হেলপারের যোগসাজশে গ্রাহকদের দেওয়া হচ্ছে পুরাতন মিটার। যে মিটারগুলো দ্রুত নষ্ট হওয়া বা বিল কম-বেশি আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া নতুন মিটারের টাকা দিয়ে পুরাতন মিটার সরবরাহ করায় প্রতারিত হচ্ছেন গ্রাহকরা। সেইসঙ্গে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, পোস্ট-পেইড সংযোগের ক্ষেত্রে গ্রাহকদেরই মিটার কিনে দেওয়ার কথা। তবে ঝামেলা এড়াতে সরকারি ফির সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে সংযোগ নিচ্ছেন গ্রাহকরা। এই সুযোগে গ্রাহকদের দেওয়া হচ্ছে পুরাতন সিরিয়াল ও আগের সালের মিটার, যা লাগানোর এক সপ্তাহের মধ্যে নষ্ট হয়ে যাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে রাজবাড়ীর দাদশী, আলীপুর, শহীদওহাবপুর ইউনিয়নসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে এক অনুসন্ধানে রাজবাড়ীতে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) লিমিটেডের আওতাধীন টেক্সটাইল ফিডারে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

জানা গেছে, বর্তমানে শহরের গ্রাহকরা পাচ্ছেন প্রি-পেইড মিটার, যা অফিস সরবরাহ করছে। আর শহরের বাইরের গ্রাহকদের দেওয়া হচ্ছে পোস্ট-পেইড মিটার। এই মিটার গ্রাহকদের দোকান থেকে কিনে দেওয়ার কথা থাকলেও টেক্সটাইল ফিডারের অধীনস্থ কর্মকর্তা অথবা লাইন হেলপাররা গ্রাহকদের সঙ্গে চুক্তি করে তারাই মিটার সরবরাহ করছেন। যেসব মিটারের সিরিয়াল অনেক আগের এবং মিটারের গায়ের সালের স্থানে ছোট্ট একটি সাদা কাগজে আলাদা স্টিকারে নতুন করে সাল বসানো হয়েছে। তাছাড়া ওয়ারেন্টি কার্ডে নেই কোনো বিক্রেতা ও প্রতিষ্ঠানের সিল বা স্বাক্ষর। এবং কত সিরিয়ালের মিটার ও কত তারিখে বিক্রি হলো কিছুই লেখা নেই। গত প্রায় ১০ মাস ধরে রাজবাড়ীর টেক্সটাইল ফিডারের নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া গ্রাহকদের এ মিটার দেওয়া হচ্ছে। তবে যারা দোকান থেকে মিটার কিনে দিচ্ছেন তারা নতুন মিটারই পাচ্ছেন। বেশির ভাগ গ্রাহকদের দেওয়া হচ্ছে নর্দার্ন কোম্পানির মিটার।

জানা গেছে, রাজবাড়ী ওজোপাডিকো লিমিটেডের আওতায় রয়েছে টেক্সটাইল, বিসিক, পাওয়ার হাউজ, সূর্যনগর, পাঁচুরিয়া ও শ্রীপুর ফিডার। একটি নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে ব্যাংকে গ্রাহককে নির্দিষ্ট পরিমাণ সরকারি ফি জমা দিতে হয়। এছাড়া বাজার থেকে একটি নতুন মিটার কিনতে গ্রাহকের লাগে ১ হাজার ৪২০ টাকা। সব মিলিয়ে নতুন সংযোগ নিতে পাঁচ হাজার টাকার মতো লাগে। অথচ একটি নতুন সংযোগ নিতে গ্রাহকদের সরকারি ফি ও মিটার ফিসহ গুনতে হচ্ছে সাত থেকে ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত।

মমতাজ বেগম নামে এক গ্রাহক জানান, তার বাড়িতে এক মাস হলো বিদ্যুৎ সংযোগ ও মিটার লাগানো হয়েছে। মিটার লাগানোর এক সপ্তাহ পর অনেকে বলছেন মিটার নষ্ট। পরবর্তীতে যিনি মিটার লাগিয়েছেন তাকে বিষয়টি বলেছেন।

তিনি বলেন, সংযোগ নেওয়ার সময় মিটার বাজার থেকে কিনে আনতে চাইলে বিদ্যুতের লাইন হেলপার জানান, তারাই মিটার দেবেন।

ছোরাপ আলী, সালামসহ কয়েকজন গ্রাহক জানান, ভালো বা খারাপ মিটার সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। স্থানীয়ভাবে যারা বিদ্যুতের কাজ করেন, তাদের সঙ্গে চুক্তি করে সাত থেকে ৯ হাজার টাকা দিয়ে মিটার ও সংযোগ নিয়েছেন। মিটারের ভেতরে আলাদা কাগজে সালের স্টিকার লাগানো আছে। আর মিটারের কভারের ভেতর একটা ওয়ায়েন্টি কার্ড পেয়েছেন, তবে সেটিতে কোনো নম্বর, সিল বা সই নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঠপর্যায়ে কাজ করা এক লাইন হেলপার জানান, তারা বেশ কয়েকজন মাঠপর্যায়ে কাজ করেন। কেউ নতুন সংযোগ নিতে চাইলে তারা গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংক জমা, মিটার কেনাসহ চুক্তি করেন। ওই চুক্তির টাকা অফিসে দেওয়ার পর অফিস সব ঠিকঠাক করে দেয়। পরবর্তীকালে যে মিটারটি তাদের হাতে দেওয়া হয়, সেটিই তারা গ্রাহকের বাড়িতে লাগিয়ে দেন। অনেক মিটারেই সালের জায়গায় স্টিকার লাগানো দেখেছেন। কিন্তু সেটি নতুন নাকি নাকি পুরাতন সেটি তারা জানেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ইলিকট্রনিক ব্যবসায়ী জানান, মিটার তৈরি করে কোম্পানি। দোকান থেকে কেনা কোনো মিটারে ওই স্টিকার নেই। কিন্তু বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন যে মিটার গ্রাহকদের দিচ্ছে, সেসব মিটারে স্টিকার মারা ও পুরাতন সিরিয়ালের। এর দায় অফিসের কর্মকর্তাদের। কারণ মিটার গ্রাহকদের দেওয়ার আগে অফিসের একজন দায়িত্বরত ব্যক্তি ওই মিটারের নম্বর রেজিস্ট্রেশন করেন। ফলে নতুন বা পুরাতন তারা তখনই ধরতে পারেন।

মুঠোফোনে নর্দার্ন মিটারের মালিক মো. গোলজার হোসেন বলেন, তাদের পুরাতন সিরিয়াল ও সালের কোনো মিটার বাজারে নেই। এখন বাজারে ১৫ লাখ সিরিয়াল ও ২০২২ সালের মিটারের সাপ্লাই রয়েছে। দেশের বিভিন্নস্থানে পোস্ট-পেইড মিটার খুলে প্রি-পেইড মিটার লাগানো হয়েছে। ওইসব পোস্ট-পেইড মিটার ওজোপাডিকো, ডেস্কোসহ অন্যরা তাদের স্টোরে জমা দিয়েছেন। কিন্তু ওই মিটারগুলো চোরাই পথে বিক্রি হয়। পরবর্তীকালে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এগুলো বিক্রি করছেন।

এ বিষয়ে রাজবাড়ী ওজোপাডিকো লিমিটেডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন-অর-রশীদ বলেন, আমরা শুধু প্রি-পেইড মিটার অফিস থেকে সাপ্লাই দিয়ে থাকি। এছাড়া অন্য মিটারগুলো গ্রাহকরাই সরবরাহ করেন। অফিস এই মিটার দিতে পারবে না। আর পুরাতন সিরিয়ালের মিটার ও স্টিকার কোম্পানি দিতে পারে। সেটা ওই কোম্পানির বিষয়, আমাদের না। তারপরও কোনো অভিযোগ পেলে বা যার বিরুদ্ধে পাওয়া যাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রুবেলুর রহমান/এমআরআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।