রসিক নির্বাচন
কেমন মেয়র চান নতুন ভোটাররা
রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) নির্বাচন ঘিরে দিন যতই গড়াচ্ছে ততই বাড়ছে উত্তাপ। কে হবেন আগামী দিনের নগরপিতা, কার যোগ্যতা কেমন, কে কতটা জনপ্রিয় তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। যারা এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন তাদেরও উৎসাহের কমতি নেই।
শতাধিক নতুন ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় প্রতীক যেমন তাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় ঠিক তেমনি ব্যক্তি ইমেজকেও প্রাধান্য দিচ্ছেন তারা।
রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে, এবার ভোটার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে চার লাখ ২৬ হাজার ৪৬৯ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ১২ হাজার ৩০২ জন এবং নারী ভোটার দুই লাখ ১৪ হাজার ১৬৭ জন। ২০১৭ সালে ভোটার সংখ্যা ছিল তিন লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৯৬ হাজার ৩৫৬ ও নারী এক লাখ ৯৭ হাজার ৬৩৮ জন। এবার নতুন ভোটার বেড়েছে ৩২ হাজার ৪৭৫ জন।
১৩ নম্বর ওয়ার্ডের লাবুর মিল বাজার এলাকার উচ্চ মাধ্যমিক ফলপ্রত্যাশী শিক্ষার্থী সাকিব হাসান সবুজ বলেন, ‘এবার এমন একজন মেয়রপ্রার্থী চাই, যিনি নগরীর গরিব-দুঃখী মানুষের জন্য কাজ করবেন। সাধারণ মানুষের কাছে যার গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি।’
শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান বলেন, ‘যিনি সৎ, দরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করবেন, প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে সড়ক বাতি ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করবেন তাকেই
ভোট দেবো।’
পীরজাবাদ এলাকার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন রংপুরের বাইরে থাকায় তার ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়নি। এবার প্রথমবারের মতো রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট দেবেন।

তিনি বলেন, যিনি নগরীর উন্নয়নে কাজ করবেন। বিশেষ করে ড্রেন, কালভার্ট নির্মাণ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ময়লা-আবর্জনার ব্যবস্থাপনা, পয়ঃনিষ্কাশনসহ অসহায় মানুষের জন্য কাজ করবেন এমন ব্যক্তিকেই মেয়র হিসেবে দেখতে চাই।
কারমাইকেল কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাসকিয়া হক নগরীর ২০ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার। এবার কেমন মেয়র প্রার্থীকে ভোট দেবেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন দলীয়ভাবে হলেও আমার কাছে দল বা প্রতীক কোনো বিবেচ্য বিষয় হবে না। যে প্রার্থীর ব্যক্তি ইমেজ সর্বজন গ্রহণযোগ্য, যিনি নগরীর সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন এমন প্রার্থীকেই বেছে নেবো।
৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কলেজছাত্র সাকিন বলেন, প্রথমবারের মতো এবার ভোট দেবো। কারও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবো না। আমার বিচার বিবেচনায় যিনি যোগ্য তাকেই ভোট দেবো।
নগরীর ১১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার কলেজছাত্র সুনীল চন্দ্র বলেন, দলীয় প্রতীকে ভোট দেবো তবে কোন প্রতীক সেটা বলা যাবে না।
রংপুর সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সীমান্ত। তিনি নগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন ভোটার। সীমান্ত বলেন, যানজটযুক্ত ও জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত রংপুর সিটি দেখতে চাই না। সময়ের সঙ্গে মানুষের রুচিবোধও পাল্টাচ্ছে। যিনি এসব বিষয়ে পারদর্শী বলে মনে করি তাকেই ভোট দেবো।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স তৃতীয়বর্ষের ছাত্রী শারমিন সুলতানা নগরীর হনুমানতলা এলাকার ভোটার। তিনি বলেন, রিকশায় করে বিশ্ববিদ্যালয় যাতাযাত করতে সিটি বাজার থেকে জাহাজ কোম্পানি মোড় পর্যন্ত প্রতিনিয়ত যানজটে পড়তে হয়। এতে সময়ের অপচয় হয়। যানজটমুক্ত নগরী চাই। যিনি যানজট নিরসনে কাজ করবেন বলে মনে করবো তাকেই ভোট দেবো।
এদিকে, মেয়রপ্রার্থী ছাড়াও কাউন্সিলর প্রার্থীরা ভাবছেন নতুন ভোটারদের নিয়ে। ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।
রংপুরের মাহিগঞ্জ এলাকার নারীনেত্রী রোকেয়া বেগম বলেন, বর্তমান প্রজন্মের নতুন ভোটাররা অনেকটাই সচেতন। আমাদের চিন্তাধারার চেয়ে তাদেরটা আলাদা। তারা আধুনিক চিন্তা-চেতনায় বেড়ে উঠছে। সুতরাং যে প্রার্থী যত বেশি নতুন ভোটার টানবেন তার জয়ের সম্ভাবনাও তত বেশি।

৩৩টি ওয়ার্ড নিয়ে ২০১২ সালের ২৮ জুন গঠিত হয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রংপুর সিটি করপোরেশন। ওই বছরের ২০ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ওইসময় এক লাখ ৬ হাজার ২৫৫ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা পেয়েছিলেন ৭৭ হাজার ৮০৫ ভোট। বিএনপি নেতা কাওসার জামান বাবলা পেয়েছিলেন ২১ হাজার ২৩৫ ভোট।

২০১২ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন তিন লাখ ৫৭ হাজার ৭৪২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৭৯ হাজার ১২৮ জন ও নারী ভোটার এক লাখ ৭৮ হাজার ৬১৪ জন।
দ্বিতীয় মেয়াদে ২০১৭ সালের ২১ ডিসেম্বর দলীয় প্রতীকে অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা এক লাখ ৬০ হাজার ৪৮৯ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু পান ৬২ হাজার ৪০০ ভোট। বিএনপির প্রার্থী কাওসার জামান বাবলা পেয়েছিলেন ৩৫ হাজার ১৩৬ ভোট।

২০১৭ সালে ভোটার সংখ্যা ছিল তিন লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৯৬ হাজার ৩৫৬ ও নারী এক লাখ ৯৭ হাজার ৬৩৮ জন।
তৃতীয় মেয়াদে আগামী ২৭ ডিসেম্বর ২২৯টি কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ইভিএমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

এবার মেয়র পদে জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-ইনু) শফিয়ার রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমিরুজ্জামান পিয়াল, খেলাফত মজলিশের তৌহিদুর রহমান মণ্ডল রাজু, জাকের পার্টির খোরশেদ আলম খোকন, বাংলাদেশ কংগ্রেস পার্টির আবু রায়হান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেহেদী হাসান বনি ও লতিফুর রহমান মিলন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
সংরক্ষিত ১১টি ওয়ার্ডে ৬৭ এবং ৩৩টি সাধারণ ওয়ার্ডে ১৭৯ জন কাউন্সিলর প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
জিতু কবীর/এসআর/জেআইএম