দিনাজপুরে তিন ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য
দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে সরকারি ৬০ বস্তা বোরো ধানের বীজ, বিরলে ৯১ বস্তা সার এবং বিরামপুরে ৩০ টাকা কেজির ওএমএসের ১৪ বস্তা চাল জব্দ করা হয়েছে। পাঁচ দিনের এ তিন ঘটনা দিনাজপুরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
চিরিরবন্দর ও বিরামপুরের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন হলেও বিরল উপজেলায় সার জব্দের ঘটনায় কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি।
সোমবার (২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় চিরিরবন্দর উপজেলার ঘুঘুরাতলী-স্টেশন রোডের সোনালী ব্যাংকের মোড় থেকে একটি ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়রা ওই ৬০ বস্তা সরকারি বোরো ধানের বীজ আটক করে। পরে তারা উপজেলা প্রশাসনকে জানালে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুনাল্ট চাকমা ঘটনাস্থলে এসে বীজগুলো জব্দ করে ভ্যানচালকসহ থানায় পাঠান। মঙ্গলবার দিনভর ওই বীজগুলো থানা হেফাজতে থাকার পর বিকেলে সেগুলো কৃষি কর্মকর্তার হেফাজতে দেয় থানা পুলিশ।
এই ঘটনায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খালিদ হাসান একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। যার প্রধান করা হয়েছে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবু সরফরাজ হোসেন। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন- উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা। কমিটিকে আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য বলা হয়েছে।
স্থানীয় ও ওই ভ্যানের চালক এনতাজুল হক জানান, রেজাউল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি ওই বীজগুলো ভ্যানে করে পার্বতীপুরে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভাড়া করেন। সেই বীজগুলো পার্বতীপুরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। রেজাউল ইসলাম নিজেও ওই ভ্যানে ছিলেন। কিন্তু যখন স্থানীয়রা বীজগুলো আটক করে তখন রেজাউল ইসলাম বীজগুলোর কাগজপত্র আছে জানান এবং কাগজপত্র নিয়ে আসার কথা বলে সটকে পড়েন। পরে বীজগুলোর মালিক না থাকায় থানা হেফাজতে পাঠানো হয়।
চিরিরবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বজলুর রশিদ জানান, বীজগুলো ভ্যানচালকসহ আমাদেরকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো অভিযোগ দাখিল হয়নি। পরে সেই বীজগুলো আবার কৃষি কর্মকর্তার হেফাজতে দেওয়া হয়েছে এবং ভ্যানচালককে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো অভিযোগ দাখিল হতো তাহলে সেটি আমরাই তদন্ত করতাম, অভিযোগ দাখিল না হলে সেই বীজগুলো রাখার এখতিয়ার আমাদের নেই। যেহেতু বিষয়টি তারা নিজেরাই তদন্ত করবেন জানিয়েছেন, তাই বীজগুলো তাদের হেফাজতে দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা জানান, যেসব বীজ উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলো কৃষকদের মাঝে বিতরণ করার জন্য। এসব বীজ মালিকবিহনী অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বীজগুলো কৃষি অফিসের গোডাউন থেকে বের হয়েছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চিরিরবন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খালিদ হাসান জানান, আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য বলা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে মঙ্গলবার বিরল উপজেলায় কৃষকদের অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল ওয়াজেদ দীর্ঘ দুই ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে খুচরা সার ব্যবসায়ী তারিফের পুরাতন বাড়িসহ স্বজনদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে ৯১ বস্তা সার জব্দ করেছেন।
উপজেলার রাণীপুকুর ইউনিয়নের জগতপুর টিগরীপাড়া মোড়ের খুচরা সার ব্যবসায়ী তারিফের স্বজনদের বাড়িতে মঙ্গলবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা প্রায় সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ওই অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযান পরিচালনার সংবাদ পেয়ে খুচরা সার ব্যবসায়ী তারিফ দোকান বন্ধ করে বাড়ির লোকজনসহ আত্মগোপন করায় তারিফের দোকানের গোডাউন ও বাড়ির গোডাউন তালাবদ্ধ ছিল। ফলে তল্লাশি করেনি প্রশাসন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারিফের স্বজনদের বাড়ি তল্লাশি করতে গিয়েও প্রশাসন বাড়ির প্রবেশ দরজায় তালাবদ্ধ পায়। এতে প্রশাসন কিছুটা বিব্রতর অবস্থায় পড়েন তারা। তারপরও প্রশাসন জগতপুর গ্রামের পোড়াপাড়ায় তারিফের বাড়িতে ৪ বস্তা এমওপি (পটাশ) ও তার পুরাতন বাড়িতে ২১ বস্তা এমওপি (পটাশ), স্বজনদের মধ্যে মনুর বাড়িতে ৩০ বস্তা এমওপি (পটাশ), সাইদুর রহমান অদুর বাড়িতে ৪০ বস্তা এমওপি (পটাশ) ও মোক্তার আলীর বাড়ি থেকে ৪ বস্তা ডেব ও ৪ বস্তা এমওপি (পটাশ) সার জব্দ করে।
অভিযান পরিচালনার সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোস্তফা হাসান ইমাম, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ খুরশেদ হাসান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি রুহুল আমীনসহ স্থানীয় অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোস্তফা হাসান ইমাম বলেন, খুচরা সার ব্যবসায়ী তারিফ কৃষি অফিসের তালিকাভুক্ত সার ব্যবসায়ী নন। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগের ভিত্তিতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। জব্দকৃত সারগুলো সাধারণ কৃষকদের মাঝে সরকারি মূল্যে বিক্রির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে এ বিষয়ে কোনো তদন্ত কমিটি বা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না।
এর আগে ২৯ ডিসেম্বর ওএমেসের ১৮ বস্তা চাল আটক করে স্থানীয়রা। ডিলার বিরামপুর উপজেলা যুবলীগের সভাপতি কামাল হোসেনের গোডাউন থেকে ওই চাল ভ্যানে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়রা তা আটক করে। পরে খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে চালগুলো জব্দ করেন।
ইউএনও পরিমল কুমার সরকার বলেন, স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে বিরামপুর পুরাতন কলেজ বাজারে ডিলারের গোডাউন থেকে ভ্যানে করে অন্য জায়গায় নেওয়ার সময় ১৪ বস্তা এবং অন্য একটি দোকানে তল্লাশি চালিয়ে আরও চার বস্তা চাল জব্দ করা হয়। চালগুলো উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তার হেফাজতে সরকারি গোডাউনে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় জেলা খাদ্য কর্মকর্তা ও উপজেলা খাদ্য বিভাগ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ঘটনা তিনটি দিনাজপুরে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতাসীন দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, কী বলবো ভাই, সরকারি প্রণোদনা আর ভর্তুকির মাল নিয়ে হরিলুট শুরু হয়েছে। সরকার প্রণোদনা আর ভর্তূকি দিয়ে মানুষের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করছে। আর ডিলাররা নিজেদের পেট পুরতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এফএ/জিকেএস