বগুড়ায় সিল মারার মহোৎসব


প্রকাশিত: ০১:২৯ পিএম, ২৩ এপ্রিল ২০১৬

বগুড়ার তিনটি উপজেলার ২২টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল থেকে তীব্র দাবদাহ উপেক্ষা করে ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন।

ধুনটে একটি ভোট কেন্দ্রের পাশের খড়ের পালার ভেতর থেকে পাঁচটি পেট্রলবোমা উদ্ধার করেছে পুলিশ। এছাড়া সারিয়াকান্দি উপজেলার কাজলা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে বিএনপির চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীরা ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

তৃতীয় ধাপে বগুড়ার গাবতলীতে ১১টি, ধুনটে ১০টি এবং সারিয়াকান্দি উপজেলার স্থগিতকৃত দুর্গম চরে কাজলা ইউনিয়নে ভোটগ্রহণ করা হয়।

Bogra

সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে গ্রামের ভেতরে দুর্গম কেন্দ্র সাগাটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা গেল ভোটারদের লম্বা লাইন। যাদের অধিকাংশ বয়সে তরুণ। পোশাক আশাকে গ্রামের মনে না হলেও ভোটার হিসেবে তারা প্রতিটি লাইনে রয়েছেন। এই কেন্দ্রে বিএনপির কোনো এজেন্ট নেই। তবে বিএনপির সমর্থক একজন ভোটার বললেন ভেতরে গিয়ে দেখেন, ভোট চলছে আওয়ামী স্টাইলে।

ভিড় ঠেলে দ্বিতল ভবনের উপরে উঠে দেখা গেল, কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশের ওসি কামরুজ্জামান নৌকা প্রতীকের প্রার্থী রফি নেওয়ান খান রবিনের সঙ্গে গল্পে মেতেছেন। পাশের কক্ষে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা রেজাউল বারীকে বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। কারণ জানতে চাইলে ওসি জানালেন, সবাই বিরক্ত করে। সে কারণে এই পদ্ধতি।

৭ ও ৮নং কক্ষে দুইটি বুথ। সেখানে গিয়ে দেখা গেল প্রকাশ্যে সিল মারার মহোৎসব। পুলিশ ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের সামনেই সিল মারা হচ্ছে নৌকা প্রতীকে।

দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আবুল কালম আজাদ জানান, ৪/৫ জনের একটি করে দল ঢুকছে, আর ব্যালট বই নিয়ে ইচ্ছে মতো সিল মারছে। দূরে নিরবে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এ কারণে প্রাণ ভয়ে তারাও বাধা দিচ্ছেন না। তার হাতের একটি নতুন ব্যালট বইয়ে দেখা গেল প্রতিটি পাতায় নৌকা মার্কার সিল মারা রয়েছে। বাইরে ভোটারের লাইন ছাড়াও ভেতরে যারা এজেন্ট হয়ে বসে রয়েছেন তারা সকলেই নৌকা প্রতীকের লোক। বুথের ভেতরে যে কোনো ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা তৎপর।

Bogra

এদিকে ওই কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা রেজাউল বারী জানান, তাদের কেন্দ্রে সুষ্ঠু ভোট হচ্ছে। ২৯০৯ জন ভোটারের মধ্যে পৌনে ২ ঘণ্টায় ৪০ ভাগ ভোট সংগ্রহ হয়েছে। যদিও এই কেন্দ্রের সামনের লাইনে দায়িত্বে থাকা একাধিক ভোটার অভিযোগ করে বলেন তাদের লাইনের ১০/১২ জন ছাড়া কেউ ভোট দিতে পারেনি। লাইন এগুচ্ছে কচ্ছপ গতিতে।

বেলা ১১টা ১০ মিনিটে জাগুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে ধানের শীষ প্রতীকের কোনো এজেন্ট নেই। ভয়-ভীতি দেখে তাদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ধানের শীষের প্রার্থী আব্দুল ওহাব।

তিনি আরো বলেন, জীবনের ভয় কার না নেই। সে কারণে কোনো এজেন্ট দিতে পারিনি। স্বাভাবিক কারণেই সেখানে ফ্রি স্টাইলে নৌকায় ভোট পড়ছে।

ওই কেন্দ্রে দায়িত্বরত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মহিদুল ইসলাম বলেন, তার ৫০ ভাগ ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে নারুয়ামালা ইউনিয়নের প্রথমারছেও কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল, পুলিশ ও বগিরাগতদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার দৃশ্য। সেখানে দুই রাউন্ড গুলি করেও বহিরাগতদের সরাতে না পেরে বিজিবি মোতায়েন করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা আলিম উদ্দিন।

কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, ৯টি বুথ পর্যায়ক্রমে পাহারা দিচ্ছেন নৌকার প্রার্থী আব্দুল গোফফারের স্ত্রী আকলিমা খাতুন ও ছেলে আব্দুস সবুর। এজেন্টের কার্ড নিয়ে বিভিন্ন বুথে ঢুকে স্বামীর পক্ষে ভোটারদের ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ভরছেন আকলিমা।

জানতে চাইলে বলেন, ভোটারা ভুল করে। ভোটটি যাতে নষ্ট না হয় সে কারণে তিনি নিজে সিল দিয়ে দিচ্ছেন। এতে দোষের কিছু নেই।

Bogra

এদিকে জাল ভোট প্রদানে বাধা দেয়ায় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে পিটিয়ে আহত করেছে আওয়ামী লীগ কর্মীরা। শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে ধুনট উপজেলার নিমগাছী ইউনিয়নের সোনাহাটা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়রা জানান, ভোটগ্রহণ চলাকালে দুপুর দেড়টার দিকে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কর্মীরা কেন্দ্রে জোর করে প্রবেশ করেন। এরপর তারা নৌকা মার্কায় সিল মারার চেষ্টা করেন। এসময় কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) জিয়াউর রহমান তাদের বাধা দেন। এতে আওয়মী লীগ প্রার্থীর কর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশ কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে পিটিয়ে আহত করে।

খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি ভোট কেন্দ্রে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনার পর ওই ভোট কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

সোনাহাটা ডিগ্রি কলেজ ভোট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার নজরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, জাল ভোট দেয়া নিয়ে পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে।

জাল ভোট দিতে সহযোগিতা করায় বগুড়ার ধুনট উপজেলায় একজন প্রিজাইডিং অফিসারকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রিজাইডিং অফিসার সেলিম রেজা এলাঙ্গী ইউনিয়নের এলাঙ্গী উচ্চ বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন। ভোটগ্রহণ চলাকালে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে নৌকা মার্কার কর্মীরা কিছু ব্যালট পেপার ও সিল ভোট কেন্দ্রের বাহিরে নিয়ে যায়। এসময় অপর প্রার্থীর লোকজনের কাছে ধরা পড়লে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রের আমিনুর রহমান প্রিজাইডিং অফিসার সেলিম রেজাকে ভোট কেন্দ্র থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন।

ধুনটে একটি ভোট কেন্দ্রের পাশের খড়ের পালার ভেতর থেকে পাঁচটি পেট্রলবোমা উদ্ধার করেছে পুলিশ। এছাড়া সারিয়াকান্দী উপজেলার কাজলা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে বিএনপির চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীরা ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

পুলিশ জানায়, ভোটগ্রহণ চলাকালে ধুনট সদর ইউনিয়নের বেলকুচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের পাশের একটি খড়ের পালার ভেতর থেকে পাঁচটি পেট্রলবোমা উদ্ধার করা হয়। ওই কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশের পরিদর্শক আশিকুর রহমান জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খড়ের পালা তল্লাশি করে পেট্রলবোমাগুলো উদ্ধার করা হয়।

অন্যদিকে, সারিয়াকান্দি উপজেলার কাজলা ইউনিয়নের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে ভোট বর্জন করেছে বিএনপি।

বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম ভোট বর্জনের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, চরাঞ্চলের এই ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ নিতে আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনকে ম্যানেজ করেছে। এখানে ভোটের কোনো সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। সে কারণে বিএনপির চেয়ারম্যান এবং সদস্য প্রার্থীগণ ভোট বর্জন করেছেন।

এআরএ/এবিএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।