চট্টগ্রাম বন্দর অচল
সরকার দ্রুত টেকসই সমাধান নিশ্চিত করলে সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব
জাতীয় অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) চুক্তি সংক্রান্ত সকল প্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ রেখে আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে হবে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আলোচনায় বলা হয়, সরকারের সক্রিয় উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত একটি টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা গেলে বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) উদ্যোগে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) এক জরুরি সভায় এসব মতামত দেন তারা। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিজিএমইএর পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম।
শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনার পর সভায় অংশগ্রহণকারীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অভিন্ন মত প্রকাশ করেন। আলোচনায় বন্দরে অন্তর্ভুক্ত শ্রমিক ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে গৃহীত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে স্টেকহোল্ডার ও বন্দর সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে সরকারের ধারাবাহিক আলোচনা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেন অংশগ্রহণকারীরা।
আলোচনা সভায় বিজিএমইএ ছাড়াও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ), চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা), বাংলাদেশ ইপিজেড ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশন (বেপজিয়া), বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং চট্টগ্রাম বন্দরের আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে বিজিএমইএ পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখা যায়নি। চলমান লাগাতার কর্মবিরতির কারণে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিছুদিনের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং এর পরপরই রমজান মাস শুরু হবে। এ সময়ে আমদানি করা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দ্রুত খালাস ব্যাহত হলে বাজার পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠবে, যার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে।’
তিনি জানান, তৈরি পোশাকসহ সকল খাতের আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশ। পাশাপাশি বন্দরে কনটেইনার জটের কারণে ডেমারেজ চার্জসহ বন্দর চার্জ ও স্টোরেজ রেন্ট বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পণ্যমূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা ও ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ বাণিজ্যের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ সময় উপস্থিত অন্যান্য ব্যবসায়ী নেতাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা জানান, বহির্নোঙরে জাহাজ আটকে থাকায় পরিস্থিতি আরও গুরুতর আকার ধারণ করছে এবং এতে বিদেশি ব্যবসায়ীদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, যা সার্বিক অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের ওপর জোর দেন তারা।
আরও পড়ুন
আটকে আছে ৫১ হাজার কনটেইনার, গভীর সংকটে ব্যবসা-বাণিজ্য
সভায় চিটাগাং কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল ইসলাম বলেন, আসন্ন রমজানকে কেন্দ্র করে আমদানি পণ্য খালাস ব্যাহত হলে বাজার পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এ জন্য জরুরি ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে অচলাবস্থা নিরসনের আহ্বান জানান তিনি।
সংগঠনটির সেক্রেটারি মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, বন্দরে বিরাজমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। তিনি এনসিটি ইজারা সংক্রান্ত আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
নাগরিক কমিটির একরামুল করিম বলেন, আসন্ন নির্বাচন ও পবিত্র রমজানের প্রাক্কালে এ ধরনের পরিস্থিতি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত। জাতীয় রপ্তানির বৃহত্তর স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত বন্দর কার্যক্রম স্বাভাবিক করার আহ্বান জানান তিনি।
শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি শাহেদ বলেন, বহির্নোঙরে জাহাজ আটকে থাকায় এবং খালাস কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত সমাধানের জন্য সরকারের উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন বলেন, জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বদলি কর্মচারীদের বদলি বাতিলসহ শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে গৃহীত সকল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহারের দাবি জানাই।
সভায় উপস্থিত আন্দোলনরত শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা এনসিটি বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তারা জানান, সরকার এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া বাতিল করলে এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে গৃহীত সকল বদলি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হলে চলমান আন্দোলন প্রত্যাহার করা হবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ পরিচালক ও সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আবদুস সালাম, ভারপ্রাপ্ত সহ-সভাপতি এনামুল আজিজ চৌধুরী, পরিচালক এমডিএম মহিউদ্দীন চৌধুরী, বেপজিয়ার সহ-সভাপতি ও বিজিএমইএ পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর, বিজিএমইএ পরিচালক সাইফ উল্যাহ মনসুর, বিকেএমইএর পরিচালক আবদুল বারেক, ব্যবসায়ী নেতা একরামুল করিম, আমান উল্লাহ আল সগীর (ভুট্টো), চিটাগাং কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল ইসলাম, সেক্রেটারি মোহাম্মদ শওকত আলীসহ অন্যান্য ব্যবসায়ী ও আন্দোলনরত শ্রমিক নেতৃবৃন্দ।
বিএ/এমএস