আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চড়া সুদে ১৬০ কোটি ডলার ঋণ নিতে তোড়জোড়

মফিজুল সাদিক
মফিজুল সাদিক মফিজুল সাদিক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৪৮ পিএম, ০২ মে ২০২৬
এরই মধ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের পাঁচটি ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার/ ছবি- এআই নির্মিত

বাজেট সহায়তা হিসেবে ১৯০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৯৫ পয়সা ধরে এই ঋণের পরিমাণ ২৩ হাজার ৩৬০ কোটি ৫ লাখ টাকা। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো এই ঋণের বড় অংশই সহজ শর্তের নয়। মোট প্রস্তাবিত অর্থের প্রায় ১৬০ কোটি মার্কিন ডলারই নন-কনসেশনাল অর্থাৎ বেশি সুদ, কম গ্রেস পিরিয়ড এবং দ্রুত পরিশোধযোগ্য ঋণ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে ও ব্যয়সংযম ছাড়া এমন ঋণ ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ব্যয়, বিদেশ সফর ও অপচয় কমানো গেলে চড়া সুদে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে।

এরই মধ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের পাঁচটি ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার। চার উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে এ অর্থ নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ১০৫ কোটি ডলার, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) থেকে ৫০ কোটি ডলার, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে ২৫ কোটি ডলার এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওএফআইডি) থেকে ১০ কোটি ডলার উচ্চ সুদে ঋণ নেবে সরকার। মূলত এই অর্থ দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিদ্যমান আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা হবে।

এসব ঋণের মধ্যে ১৬০ কোটি ডলার নেওয়া হবে কঠিন শর্তে। এতে ৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হবে। এর মধ্যে দুই প্রকল্পে এডিবি দেবে ৭৫ কোটি ডলার। এছাড়া এআইআইবি দেবে ২৫ কোটি ডলার, ৫০ কোটি ডলার মিলবে জাইকা থেকে এবং ওএফআইডি দেবে ১০ কোটি ডলার।

সহজ শর্তের ঋণে সুদের হার এক দশমিক ৫ শতাংশ, অব্যবহৃত অর্থের ওপর সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ প্রতিশ্রুতি ফি (কমিটমেন্ট ফি) প্রযোজ্য হয়। এ ঋণের মেয়াদ থাকে ২৫ বছর, যার মধ্যে ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ড অন্তর্ভুক্ত। অথচ কঠিন শর্তের ঋণে গ্রেস পিরিয়ড মাত্র ৩ বছর এবং ১২ বছরেই এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ক্ষেত্র বিশেষে এই ঋণে ৫ শতাংশের ওপরে সুদ পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকে।

গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত নন-কনসেশনাল ঋণসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভায় তুলনামূলক কঠিন শর্তের এসব ঋণের অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

আরও পড়ুন
৯ মাসেই ব্যাংক ঋণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়াল 
৪৩ দিনেই সরকারের ব্যাংকঋণ ৪১ হাজার কোটি টাকা 
সরকারের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার: সংসদে অর্থমন্ত্রী 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বলেন, ‘বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।’ কঠিন শর্তে ঋণের পরিমাণ কত?- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফিগার ফাইনাল হলে জানাবো।’

তবে ইআরডি থেকে জানা গেছে, এসব ঋণের মধ্যে ১৬০ কোটি ডলার নেওয়া হবে কঠিন শর্তে। এতে ৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হবে। এর মধ্যে দুই প্রকল্পে এডিবি দেবে ৭৫ কোটি ডলার। এছাড়া এআইআইবি দেবে ২৫ কোটি ডলার, ৫০ কোটি ডলার মিলবে জাইকা থেকে এবং ওএফআইডি দেবে ১০ কোটি ডলার।

ঢাকা-সিলেট ফোর লেন প্রকল্পে ৩০ কোটি ডলার দেবে এডিবি

ঢাকা-সিলেট করিডর রোড ইনভেস্টমেন্ট প্রকল্পে চড়া সুদে ৩০ কোটি ডলার ঋণ দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বাংলাদেশ সরকার (জিওবি) এবং এডিবির অর্থায়নে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্পের মোট অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয় ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা। এর মধ্যে এডিবির ঋণ ১৩ হাজার ২৪৪ কোটি ৬৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। যার মধ্যে ৩০ কোটি ডলার বা ৩ হাজার ৬৮৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি একনেকে অনুমোদিত হয় প্রকল্পটি।

বিদেশি ঋণ ছাড় ও পরিশোধ এখন প্রায় সমান। জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ের হালনাগাদ প্রতিবেদনে ইআরডি জানিয়েছে, এই সময়ে বিদেশি ঋণ ও অনুদান এসেছে ৩০৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। বিপরীতে একই সময়ে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ঋণদাতা সংস্থা ও দেশকে প্রায় ২৯০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে।

খসড়া ঋণচুক্তিতে শর্তাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে এবং চলতি বছরের ২০ এপ্রিলে নির্ধারিত সুদ ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ বিবেচনায় নিলে এই ঋণে মোট সুদ আসবে ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। এ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা (কাঁচপুর)-সিলেট মহাসড়কে পৃথক সার্ভিস লেনসহ প্রায় ২১০ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হবে।

৭৫ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা দেবে এডিবি

স্ট্রেনদেনিং ইকোনোমিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড গভর্নেন্স সুপর্ণগ্রাম-২ প্রকল্পের আওতায় বাজেট সহায়তা বাবদ ৭৫ কোটি ডলার ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক। এর মধ্যে ৩০ কোটি ডলার সহজ শর্তের ঋণ, বাকি ৪৫ কোটি ডলার দেবে চড়া সুদে। এ ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ৩ বছর ও ঋণ পরিশোধকাল ১২ বছর। সবমিলিয়ে ১৫ বছরে এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এই ঋণের সুদহার ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।

এআইআইবি থেকে মিলবে ২৫ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা

স্ট্রেনদেনিং ইকোনোমিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড গভর্নেন্স সুপর্ণগ্রাম-২ প্রকল্পে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ২৫ কোটি ডলার ঋণ দেবে বাজেট সহায়তা হিসেবে। এই ঋণে সুদহার ৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ।

৫০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা দেবে জাইকা

জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা) বাজেট সহায়তা হিসেবে ৫০ কোটি ডলার দেবে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব সংক্রান্ত চিঠি গত ২০ এপ্রিল জাইকাকে পাঠিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ।

আরও পড়ুন
৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি 
চ্যালেঞ্জ ঋণ পরিশোধ, পাশে থাকার আশ্বাস দাতাদের 
গভীর সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতি, দ্রুত সংস্কারের তাগিদ বিশ্বব্যাংকের 

ওএফআইডি থেকে ১০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা নেবে সরকার

ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওএফআইডি) থেকে উচ্চ সুদে ১০ কোটি ডলার ঋণ নেবে সরকার। বাংলাদেশ সরকারের জরুরি আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই ঋণ ব্যবহার করা হবে। বিরাজমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ব্যয় নির্বাহ অব্যাহত রাখাসহ এই অর্থায়ন সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে। এই ঋণে সুদহার ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ।

বাড়ছে বৈদেশিক সুদ পরিশোধের চাপ

বিদেশি ঋণ ছাড় ও পরিশোধ এখন প্রায় সমান। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) যত বিদেশি ঋণ এসেছে, এর প্রায় সমান পরিমাণ ঋণের সুদ ও আসল শোধ করতে হয়েছে।

জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ের হালনাগাদ প্রতিবেদনে ইআরডি জানিয়েছে, এই সময়ে বিদেশি ঋণ ও অনুদান এসেছে ৩০৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। বিপরীতে একই সময়ে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ঋণদাতা সংস্থা ও দেশকে প্রায় ২৯০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে।

এ অবস্থায় বৈদেশিক ঋণ নিয়ে বাজেট বড় করার চেয়ে গুণগত মানের সাশ্রয়ী বাজেট জরুরি বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা।

বাজেটে অনেকে ক্ষেত্রে অপচয় হয়েছে। চড়া সুদে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে বাজেট বাড়ানোর মানে হয় না। তবে সরকার বড় আকারের বাজেট করার পরিকল্পনা করছে। স্বাভাবিকভাবে রাজস্ব আদায় বাড়াতে না পারলে বাড়তি সুদে ঋণ নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। - বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমানে বৈদেশিক ঋণের পরিস্থিতি ভালো না। আমাদের বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ দ্রুত গতিতে বাড়ছে। বাজেটের বড় অংশই বৈদেশিক ঋণ শোধ করতে চলে যাচ্ছে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত এটা বাড়বে।

তিনি বলেন, বাজেটে অনেকে ক্ষেত্রে অপচয় হয়েছে। চড়া সুদে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে বাজেট বাড়ানোর মানে হয় না। তবে সরকার বড় আকারের বাজেট করার পরিকল্পনা করছে। স্বাভাবিকভাবে রাজস্ব আদায় বাড়াতে না পারলে বাড়তি সুদে ঋণ নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

সরকারকে গুণগত বাজেটে নজর দেওয়া উচিত মন্তব্য করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বার্ষিক উন্নয়ণ কর্মসূচি সঠিকভাবে প্রণয়ন করা জরুরি। সাশ্রয়ী বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি করতে হবে। এডিপিতে অহেতুক ব্যয় কমাতে হবে। বিদেশ ভ্রমণের নামে প্রকল্পের টাকা খরচ করা যাবে না। যদি অপচয় রোধ করা যায় তাহলে অল্প অর্থে বেশি উপকার পেতে পারি।

এমওএস/কেএসআর/এমএমএআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।