জিআই ট্যাগ বানালো সরকার, ব্যবহার করতে হবে পণ্যের প্রচার-বাজারজাতে

মাসুদ রানা
মাসুদ রানা মাসুদ রানা , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:১৮ পিএম, ০৫ মে ২০২৬
জিআই ট্যাগের লোগো

দেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করতে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) ট্যাগ ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে জিআই ট্যাগ তৈরি করা হয়েছে। এ ট্যাগ ব্যবহার করে পণ্যের প্রচার, বাজারজাতকরণ এবং প্রদর্শনী কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে দেশীয় পণ্যের ব্র্যান্ড ভ্যালু ও রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়ে। তবে, এ ট্যাগ বিকৃতি করলে পড়তে হবে শাস্তির মুখে।

ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) বিধিমালা সংশোধন করে ট্যাগের ডিজাইন এবং এর ব্যবহারসংক্রান্ত নিয়ম-কানুন যুক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে এ সংশোধিত বিধিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

জিআই পণ্য এমন একটি পণ্য, যার বিশেষ গুণ, মান বা খ্যাতি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। অর্থাৎ কোনো পণ্য যদি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে উৎপাদিত হয় এবং সেই অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া, ঐতিহ্য বা কারিগরি দক্ষতার কারণে আলাদা বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, সেটিই জিআই পণ্য।

লাল কাপড়ে ফুটে উঠছে জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা, জিআই পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত

বাংলাদেশে পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর পণ্যের জিআই সনদ দিয়ে থাকে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এরই মধ্যে ৬২টি পণ্যকে জিআই সনদ দেওয়া হয়েছে। দুটি পণ্যের (রাজবাড়ীর চমচম ও সাতক্ষীরার মাটির টালি) জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে, আর দুটি পণ্যকে (মানিকগঞ্জের হাজারি গুড় ও জয়পুরহাটের লতিরাজ কচু) জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট জারির জন্য বিজি প্রেসে পাঠানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের জিআই পণ্য এখন ৫৫টি
জিআই স্বত্ব নিতে দেড় শতাধিক সম্ভাব্য পণ্যের তথ্য হাইকোর্টে
জিআই স্বীকৃতি পেলো কুমিল্লার ‘খাদি’

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ট্যাগ চালুর ফলে দেশের জিআই পণ্যের একটি অভিন্ন পরিচিতি তৈরি হবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা বাড়াবে। একই সঙ্গে ভেজাল বা নকল পণ্য শনাক্ত করাও সহজ হবে।

এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা ২০১৫ সালের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) বিধিমালায় সংশোধন এনেছি। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী জিআই পণ্যে ট্যাগ ব্যবহার করতে হবে। ট্যাগটিও আমরা তৈরি করে দিয়েছি।’

‘সংশোধিত বিধিমালায় জিআই পণ্যে নির্ধারিত ট্যাগ ব্যবহারের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। অনুমোদিত এ ট্যাগ ব্যবহার করে জিআই পণ্যের মান ও স্বকীয়তা চিহ্নিত এবং রপ্তানি সহজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’— শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান

তিনি বলেন, ‘জিআই পণ্যকে চেনার জন্য একটা লোগো লাগে, সারা ওয়ার্ল্ডেই আছে। এটা আমরা নিজেরা একটা ঠিক করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি ভেটিংয়ের জন্য। তারা সেটি অনুমোদন দেওয়ার পর সংশোধিত বিধিমালাটি জারি হয়েছে।

যাদের আমরা জিআই পণ্যের মালিকানা দিয়েছি, এদের আমরা বলবো যে এই জিআই পণ্যের সাথে এই ট্যাগটা যেন ব্যবহার করে। মানুষ যেন জানতে পারে যে এটা জিআই পণ্য এবং কোয়ালিটি সম্পন্ন পণ্য। এটার জন্যই ট্যাগটা করা হয়েছে। বিদেশে যদি রপ্তানি করে, তাহলে এই ট্যাগটা লাগিয়ে বিদেশে রপ্তানি করবে।’

নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি

পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, আমরা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দিচ্ছি, কিন্তু এটা যে জিআই পণ্য মোড়কে সেই সংক্রান্ত কোনো প্রামাণ্য কিছু ছিল না। এখন থেকে যারা জিআই পণ্য উৎপাদন করবে তারা এ ট্যাগটা ব্যবহার করবে। সবাই ট্যাগটা দেখলেই বুঝতে পারবে, এটি একটি জিআই পণ্য।

ট্যাগের ডিজাইন, রং কী হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে বিধিমালায় বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

২০১৫ সালের বিধিমালা সংশোধন করে ২৮ এর পর নতুন তিনটি বিধি (বিধি ২৮ক, ২৮খ ও ২৮গ) যুক্ত করা হয়েছে। জিআই ট্যাগের ডিজাইনও দেওয়া হয়েছে।

যেমন হবে জিআই ট্যাগ

বিধিমালায় বলা হয়, ভৌগোলিক নির্দেশক ট্যাগে ‘G’ বর্ণ দিয়ে Geographical (ভৌগোলিক) শব্দকে নির্দেশ করবে এবং ‘i’ বর্ণ দিয়ে indication (নির্দেশক) শব্দকে নির্দেশ করবে। এ ট্যাগে সবুজ রঙের ‘G’ ব্যবহৃত হবে এবং ‘i’ এর উলম্ব অংশটি লাল রঙের ও উপরে সবুজ রঙের বৃত্তাকার ফোঁটার ভেতরে সাদা রঙে বাংলাদেশের মানচিত্র থাকবে। ট্যাগ লাইন হিসেবে ‘UNIQUE TREASURE OF BANGLADESH’ শব্দগুলো ব্যবহৃত হবে এবং ট্যাগ লাইনটি ট্যাগের বাম পাশের পাদদেশ থেকে শুরু করে ঘড়ির কাঁটার দিকে মুদ্রিত হয়ে ‘G’ এর ওপরের অংশে শেষ প্রান্ত বরাবর সমাপ্ত হবে। ‘G’ এর নিচে বক্রাকার অংশের বামপাশে এবং ট্যাগ লাইনের ভেতরের দিকে নির্দেশক চিহ্ন হিসেবে নিম্নমুখী তীরের দুইটি ফলা থাকবে, যার নিচের ফলাটি সবুজ ও ওপরের ফলাটি লাল রঙের হবে। ভৌগোলিক নির্দেশক ট্যাগটি বর্গাকৃতির (অনুপাত ১:১) হবে।

নিবন্ধিত ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের লেবেলিং ও মোড়কে জিআই ট্যাগ এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে তা সহজেই দৃশ্যমান হয়। অনুমোদিত ব্যবহারকারীদের জিআই ট্যাগ ব্যবহারের পাশাপাশি নিজস্ব ব্র্যান্ডের নাম বা লোগো ব্যবহার করতে হবে।

কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে ট্যাগ

ভৌগোলিক নির্দেশক ট্যাগ নিবন্ধিত স্বত্বাধিকারী, অনুমোদিত ব্যবহারকারী, সরকার, বাংলাদেশ দূতাবাস বা মিশন বা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া কোন কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারবে তা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে বিধিমালায়।

আরও পড়ুন

জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেলো টাঙ্গাইলের ‘জামুর্কীর সন্দেশ’
জিআই পেলো আরও ৩ পণ্য
জিআই পেলো আরও ৪ পণ্য

ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের নিবন্ধিত স্বত্বাধিকারী বা অনুমোদিত ব্যবহারকারীরা নিবন্ধিত ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য প্রচার, প্রসার, বাজারজাতকরণ বা বাণিজ্যিকীকরণ; শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সরকারের অন্যান্য দপ্তর তাদের দাপ্তরিক ও প্রচার কার্যক্রম; সরকারি উদ্যোগে পর্যটন শিল্প বিকাশে বিমান বন্দর ও পর্যটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রচার এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিক্রি ছাড়া প্রকাশ, প্রচার বা প্রদর্শনী কার্যক্রমে জিআই ট্যাগ ব্যবহার করা যাবে।

জিআই ট্যাগ ব্যবহারের নিয়মাবলি

সংশোধিত বিধিমালায় বলা হয়েছে, নিবন্ধিত ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের লেবেলিং ও মোড়কে জিআই ট্যাগ হুবহু ব্যবহার করতে হবে। এতে কোনো ধরনের পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংযোজন বা বিয়োজন করা যাবে না।

নিবন্ধিত স্বত্বাধিকারী নিশ্চিত করবে যে, জিআই ট্যাগ অনুমোদিত ব্যবহারকারীদের দিয়ে বাংলাদেশে তার নিবন্ধিত জিআই পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে। জিআই ট্যাগযুক্ত বা প্রত্যেক পণ্যের লেবেল বা মোড়কের পেছনের অংশে নিচের বাম দিকে রঙিন কালিতে প্রদর্শন করতে হবে এবং অন্যান্য প্যাকেট বা মডেলের ক্ষেত্রে সুস্পষ্টভাবে রঙিন কালিতে প্রদর্শন করতে হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শত বছর পুরোনো ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ছানামুখী

জিআই ট্যাগ বিকৃত, অবৈধ বা জনস্বার্থের পরিপন্থি কোনো কার্যে ব্যবহার করা যাবে না। কেই এটা করলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।

ভৌগোলিক নির্দেশক ট্যাগের স্বত্বাধিকার শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর সংরক্ষণ করবে।

জিআই পণ্য

বাংলাদেশের নিবন্ধিত ৬২টি জিআই পণ্যের মধ্যে রয়েছে— কালিগঞ্জের তোয়ালে, মেহেরপুরের সাবিত্রী মিষ্টি, ফরিদপুরের পাট, মেহেরপুরের হিমসাগর আম, ফুলবাড়িয়ার লাল চিনি, নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি, মেহেরপুরের মেহের-সাগর কলা, ঢাকাই ফুটি কার্পাস তুলার বীজ ও গাছ, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের জামুর্কির সন্দেশ, নওগাঁর নাক ফজলি আম, মুন্সিগঞ্জের পাতক্ষীর, দিনাজপুরের বেদানা লিচু, কুমারখালির বেডশিট, বরিশালের আমড়া, অষ্টগ্রামের পনির, কিশোরগঞ্জের রাতা বোরো ধান, গাজীপুরের কাঁঠাল, সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি, শেরপুরের ছানার পায়েস, সুন্দরবনের মধু এবং গোপালগঞ্জের ব্রোঞ্জের গহনা।

এ তালিকায় আরও আছে— ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী মিষ্টি, কুমিল্লার খাদি, ঢাকাই ফুটি কার্পাস তুলা, মিরপুরের কাতান শাড়ি, সিলেটের মনিপুরি শাড়ি, সিরাজগঞ্জের গামছা, মাগুরার হাজরাপুরী লিচু, ভোলার মহিষের দুধের কাঁচা দই, মধুপুরের আনারস, নরসিংদীর লটকন, টাঙ্গাইল শাড়ি, জামালপুরের নকশিকাঁথা, গোপালগঞ্জের রসগোল্লা, রাজশাহীর মিষ্টি পান, নরসিংদীর অমৃত সাগর কলা, যশোরের খেজুরের গুড়, মুক্তাগাছার মণ্ডা, মৌলভীবাজারের আগর আতর, মৌলভীবাজারের আগর, রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা আম এবং কুষ্টিয়ার তিলের খাজা।

এছাড়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে— কুমিল্লার রসমালাই, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আশ্বিনা আম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া আম, শেরপুরের তুলশীমালা ধান, বগুড়ার দই, বাংলাদেশের শীতল পাটি, বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ি, রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম, ঢাকাই মসলিন, রাজশাহী সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি, বাংলাদেশ কালিজিরা, দিনাজপুর কাটারিভোগ, বিজয়পুরের সাদা মাটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম, বাংলাদেশ ইলিশ এবং জামদানি শাড়ি।

আরএমএম/এমএএইচ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।