ইএফডিতে ব্যবসায়ীদের ‘অসন্তোষ’

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:০৯ পিএম, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আদায়ে স্বচ্ছতা আনতে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) চালু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে প্রাথমিকভাবে ইএফডি বরাদ্দ পাওয়া ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই ভ্যাট আদায়ের এ পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

তাদের দাবি, ইএফডি’র মাধ্যমে পণ্য বিক্রির ইনভয়েস দেয়ায় পণ্যের দাম বেশি আসছে। এতে যেসব প্রতিষ্ঠানের ইএফডি নেই তাদের সঙ্গে ইএফডি থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

উদাহরণ দিয়ে একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, ‘ধরেন, তিনটি প্রতিষ্ঠান একই পণ্য বিক্রি করে। এখন ওই তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটিতে ইএফডি দেয়া হলো। ইএফডি দেয়া প্রতিষ্ঠানে কোনো পণ্য বিক্রি করতে গেলে তার ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আসছে, যা ক্রেতাকে বহন করতে হচ্ছে। ফলে বাকি দুই প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ইএফডি থাকা প্রতিষ্ঠানে পণ্য কিনতে গেলে ক্রেতাকে ৫ শতাংশ বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। এতে ইএফডি বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।’

ভ্যাট আদায়ে অনিয়ম বন্ধে গত ২৫ আগস্ট এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ইএফডি কার্যক্রম উদ্বোধন করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম। প্রাথমিকভাবে ১০০ ইএফডি মেশিন বিতরণ করা হয় বিভিন্ন শ্রেণির ব্যবসায়ীদের মাঝে। চলতি মাসের ১ তারিখ (সেপ্টেম্বর) থেকে এ ডিভাইসের মাধ্যমে পণ্য বিক্রির ইনভয়েস দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

efd3

ইএফডি কার্যক্রমের উদ্বোধনের সময় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘ভ্যাটের অনিয়ম বন্ধ করতেই ইএফডি চালু হচ্ছে। এ ব্যবস্থা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে রাজস্ব আহরণে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। কথিত হয়রানি দূর হবে এবং রাজস্ব আহরণের ব্যয় ও ব্যবসায়িক খরচ কমবে। কর পরিহারের সুযোগ থাকবে না। রাজস্ব আদায়ে গতি আসার পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অটোমেশনের আওতায় আসবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা চালু হলে ক্রেতাদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাবে, আশা করছি। ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি হবে। প্রাথমিকভাবে ১০০ মেশিন বসানো হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে আগামী তিন মাসের মধ্যে এক হাজার ইএফডি মেশিন বসানো হবে। আগামী জুনের মধ্যে এক লাখ ইএফডি মেশিন বসানোর ইচ্ছা আছে।’

প্রাথমিকভাবে ইএফডি বরাদ্দ পাওয়া ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ বসুন্ধরা সিটিতে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। সেখানে ইএফডি বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাপোলো কম্পিউটার’। গত বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মো. মুসা জাগো নিউজকে বলেন, ইএফডি’র কারণে আমাদের বাড়তি কোনো সুবিধা হচ্ছে না। সব সুবিধা তো সরকারের। আমাদের শুধুই অসুবিধা।

efd3

তিনি বলেন, ইএফডি’র কারণে পণ্য বিক্রিতে ক্রেতাদের কাছ থেকে আমাদের ৫ শতাংশ ভ্যাট নিতে হচ্ছে। ফলে অন্য দোকানের তুলনায় আমাদের পণ্যের দাম বেশি পড়ছে। যে কারণে আমাদের ক্রেতা কমে যাচ্ছে। যদি সবাইকে ইএফডি’র আওতায় আনা হতো তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না।

ইএফডি বরাদ্দ পেয়েছে ‘মিয়াকো ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের প্রতিষ্ঠানও। গৃহস্থালির সামগ্রী বিক্রি করা প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মো. ইয়াসিন জাগো নিউজকে বলেন, ইএফডি’র কারণে আমরা সমস্যায় পড়েছি। ক্রেতা কমে যাচ্ছে আমাদের।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ইউনিলিভারের একটি পিওরইটের দাম ৩ হাজার ৬৯০ টাকা। এর মধ্যে ৯০ টাকা আমরা কমিশন পাই। অনেক সময় আমরা এটা ৩ হাজার ৬৫০ টাকায় বিক্রি করি। এখন ৩ হাজার ৬৫০ টাকায় বিক্রি করলেও, এর ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হয়ে মোট দাম পড়ে ৩ হাজার ৮৩২ টাকা। এই দাম শুনে ক্রেতারা চলে যাচ্ছেন। কারণ তারা পাশের দোকান থেকে ৩ হাজার ৬৫০ থেকে ৩ হাজার ৬৯০ টাকার মধ্যে এটি কিনতে পারছেন।’

একই মন্তব্য ‘দি ক্যামেরা হাউজ’র ম্যানেজার মায়নুল হুদার। তিনি বলেন, ‘এখানে তো শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠানই নয়, আমাদের প্রতিযোগী অনেক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। তাদের ইএফডি দেয়া হয়নি। ফলে আমাদের চেয়ে তারা কম দামে পণ্য বিক্রি করছে। কিন্তু আমরা ইএফডির কারণে পারছি না। স্বাভাবিকভাবে আমাদের বিক্রিতে মন্দা দেখা দিয়েছে।’

efd3

পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘আনখি’র মালিক আহসান কবিরও ইএফডির কারণে ক্রেতা হারানোর অভিযোগ করেন। বলেন, ‘পণ্য বিক্রি করলে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট দিতে হচ্ছে। কিন্তু যাদের ইএফডি নেই তাদের এই ভ্যাট দেয়া লাগছে না। ফলে তারা আমাদের চেয়ে কম দামে সেল (বিক্রি) করতে পারছে। আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছি।’

তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, ‘যাদের সেল (বিক্রি) বেশি, তাদের ইএফডি দেয়া হয়নি। আমার মতো ছোট প্রতিষ্ঠানে দেয়া হয়েছে। এমনিতেই ক্রেতা নেই, এখন বাড়তি ভ্যাটের কারণে ক্রেতা আরও কমে গেছে। একই পণ্যের সব প্রতিষ্ঠানে যদি ইএফডি দেয়া হতো তাহলে এ সমস্যা হতো না।’

অধিকাংশ ব্যবসায়ী ইএফডি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও কেউ কেউ সন্তোষও প্রকাশ করেন। এমন একটি প্রতিষ্ঠান ‘জার্মান কম্পিউটার’। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. আতিক জাগো নিউজকে বলেন, আমরা যে প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছি ইএফডি তারই উদাহরণ। ইএফডি’র কারণে আমাদের ভোগান্তি অনেক কমে যাচ্ছে। আগে ভ্যাট দিতে ব্যাংকে যেতে হতো, এনবিআর অফিসে যেতে হতো, অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হতো। এখন ভ্যাট সরাসরি এনবিআরের সার্ভারে জমা হচ্ছে। সুতরাং আমাদের ভোগান্তিও কমে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ীদের অনেকেই লেখাপড়া কম জানেন। তারাই ইএফডি’র নানা সমস্যার কথা তুলছেন। আসলে মেশিনটা ব্যবহার করতে জানতে হবে। এটা ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারলে অনেক সুবিধা। ইএফডি ছোট মেশিন। ফলে বহন করা সহজ। আবার ইসিআর (ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার) মেশিনের মতো সবসময় বিদ্যুতের লাইনে দিয়ে রাখতে হয় না। একবার চার্জ দিলে সারাদিন চলে যায়।

efd3

ঘড়ি বিক্রির প্রতিষ্ঠান ‘টাইম ভিউ’র ম্যানেজার জাহিদুল ইসলাম বলেন, ইসিআর মেশিন থেকে ইএফডি ভালো। জায়গা লাগে কম। আবার প্রতিষ্ঠানে কত পণ্য আছে তার হিসাবও রাখা যায়। ইএফডিতে পণ্যগুলো একবার ইনপুট দিলে, প্রতিটি পণ্য বিক্রির পর কত মজুত থাকছে তাও সহজে জানা যায়। ফলে দোকানের কোনো কর্মীর পক্ষে পণ্য চুরির সুযোগ থাকে না।

ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগ-অনুযোগের বিষয়ে জাগো নিউজের পক্ষ থেকে ভ্যাট অনলাইন প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ইএফডি মেশিন প্রথমে যাদের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, প্রাথমিকভাবে তাদের কিছু সমস্যা হতে পারে। আবার উপকারও হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, দ্রুত সময়ের মধ্যে সবাইকে ইএফডির আওতায় আনতে হবে এবং এটা কার্যকর করতে হবে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে সংশ্লিষ্টদের তা সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে।’

এমএএস/এমএআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]