মোবাইল অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখতে সন্দেহজনক ফোন কেটে দিন

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬:৪১ পিএম, ২৪ জানুয়ারি ২০২১

২০১৫ সালে গড়ে প্রতিদিন এমএফএসে ৩৩ লাখ বার লেনদেন হতো। ২০২০ সালে এসে সেই লেনদেন হচ্ছে গড়ে প্রতিদিন ৯০ লাখের বেশি, টাকার অঙ্কে গড়ে প্রতিদিন ১৬০০ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ প্রতিদিন কোটি গ্রাহক জীবন সহজ করা মোবাইল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নানা সেবা আস্থা ও নির্ভরতার সঙ্গে ব্যবহার করছেন এবং দিন দিন এর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েই চলছে।

এরপরও অজ্ঞতা, ভয়, লোভে পড়ে বহুল জনপ্রিয় এই মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হন অল্প কিছুসংখ্যক গ্রাহক। অথচ একটু সচেতন হলেই তারা নিরাপদে নিশ্চিতে ব্যবহার করতে পারেন এই সেবা। সচেতনতার কয়েকটি তথ্য সন্নিবেশিত হলো এখানে।

রোকেয়া সুলতানা অফিসের জরুরি কাজে ব্যস্ত। এর মাঝেই কাস্টমার কেয়ারের মতো একটা নম্বর থেকে ফোন এলো। বলা হলো, আপনার মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের তথ্য আপডেট করতে হবে, না হলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে। প্রয়োজনীয় অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় রোকেয়া অপরিচিত এই নম্বরেই তার ওটিপি, পিন সব জানিয়ে দিলেন এবং কিছুক্ষণ পর আবিষ্কার করলেন তার অ্যাকাউন্টে টাকা নেই।

ফরিদ আহমেদ একটা দোকান থেকে ২ হাজার টাকা ক্যাশ আউট করিয়েছেন। কিছুক্ষণ পরই ফোন এলো- আপনি ক্যাশ আউট করিয়েছেন, আপনার অ্যাকাউন্টে সমস্যা আছে। তিনি বিশ্বাস করেই তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সব গোপন তথ্য শেয়ার করেন এবং প্রতারণার শিকার হন।

অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবিনাকে বলে আপনি ৭০ হাজার টাকা লটারি জিতেছেন। ১০ হাজার টাকা পাঠান বা কিছু তথ্য দেন। সাবিনা খুশিতে পিন ও ওটিপি জানিয়ে দেন এবং প্রতারণার শিকার হন।

প্রতারণার অস্ত্র ‘অজ্ঞতা-ভয়-লোভ’

এই তিনটি সামাজিক অপকৌশলের কবলে পড়েই রোকেয়া, ফরিদ এবং সাবিনা টাকা হারিয়েছেন। সব প্রতারণার ক্ষেত্রেই সামাজিক এই অপকৌশলগুলো ব্যবহৃত হয়। গ্রাহকের মোবাইল ব্যাংকিংসেবার গোপন তথ্য সংগ্রহ করেই অসাধু প্রতারক চক্র প্রতারণা করার সুযোগ পায়। অথচ একটু সচেতন হলেই গ্রাহক তার অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখতে পারতেন। এমনকি সচেতনতার কারণেই অনেক গ্রাহক এমন ফোন পেয়ে কোনো তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকেন এবং অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখেন।

এক মনো-সামাজিক গবেষণায় দেখা যায়, গোপন তথ্য নিয়ে অসচেতনতা, প্রতারকের কথায় বিশ্বাস করা, অযথা ফোনে অপরিচিত নম্বরে দীর্ঘক্ষণ কথা বলা- এমন অনেক ভুল পদক্ষেপ নিয়েই ফাঁদে পড়েন ব্যবহারকারীরা।

প্রতারকদের প্রথম কৌশল থাকে গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জন করা। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কল সেন্টারের মতো প্রায় একইরকম দেখতে নম্বর থেকে ফোন করা, এজেন্ট পয়েন্ট থেকে কৌশলে ক্যাশ আউট বা সেন্ড মানির সংগৃহীত তথ্য গ্রাহককে বলা- যেমন আপনি তো টাকা ক্যাশ আউট করেছেন- এমন কথা বলে গ্রাহকের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে তারা। রোকেয়া ও ফরিদ দুজনই প্রতারণা হয় জানতেন, তবে তারা অপরিচিত নম্বরের ফোনে সন্দেহ না করে বরং তাদের কথায় বিশ্বাস করেছেন।

মোবাইল আর্থিক সেবা মানুষের অসংখ্য আর্থিক লেনদেন সহজ করে দেয়ায় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি গ্রাহকদের একধরনের ভালোলাগা থাকে। ফলে অপরিচিত নম্বরেও যখন ওই প্রতিষ্ঠান থেকে বলছি বলা হয়, তখন সন্দেহ না করে কথা বলা শুরু করেন। যিনি জানেন প্রতারণা হয়, তিনিও অনেক সময় বিশ্বাস করেন।

বিশ্বাস অর্জনের পরের ধাপে গোপন তথ্য নেয়ার জন্য ভয় দেখানো যেমন- অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে, লোভ দেখানো যেমন- চাকরি পেয়েছেন বা লটারি জিতেছেন এমন কথা বলে প্রতারক। গ্রাহক তখন দুশ্চিন্তায় পড়ে বা ভয় পেয়ে তথ্য দিতে প্রস্তুত হয়ে যান।

মনো-সামাজিক গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পিন নম্বর বা ওটিপি যে গ্রাহকের গোপন তথ্য সে বিষয়ে বেশিরভাগ গ্রাহকই সচেতন নন। ফলে তথ্যগুলো খুব সহজেই জানিয়ে দেন প্রতারকদের। ছয় সংখ্যার নম্বরটি বলুন, একটি সংখ্যা দিয়ে তার সঙ্গে পিন নম্বর যোগ করে বলুন, পিনের প্রথম সংখ্যার সঙ্গে এক বা দুই যোগ করে পরের সংখ্যা বলুন- এমন অনেক প্রশ্নের উত্তরে মোবাইল অ্যাকাউন্টের গোপন তথ্য শেয়ার করে বিপদে পড়েন গ্রাহক।

যারা প্রতারণার ঘটনার শিকার হয়েছেন তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা দীর্ঘক্ষণ অপরিচিত নম্বরে কথা বলেন। অনেক সময় নিজেই নিজের অন্য একটি মোবাইল নম্বর দিয়েও প্রতারকের সঙ্গে কথা চালিয়ে যান। ফলে প্রযুক্তিগতভাবে নিরাপদ করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য আসা ওটিপি এবং পিন উভয় তথ্য জানিয়ে দেন। ফলে প্রতারণার শিকার হন।

এমএফএস প্রতারণা থেকে নিরাপদ থাকতে করণীয়

মোবাইলে এই ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে গ্রাহক সচেতনতা খুব জরুরি।

প্রথমত: যে নম্বর থেকেই ফোন আসুক না কেন গ্রাহকের উচিত সন্দেহ করা এবং যাচাই করা। অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এলে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অপরিচিত কারো সঙ্গে মোবাইল আর্থিক সেবা নিয়ে কথা বললে শুরুতেই সন্দেহ করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত: ফোনে কথা শুনে ভয় না পাওয়া বা লোভে না পড়া। পাশাপাশি যে সেবা ব্যবহার করছেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আগেই জেনে নেয়া। যেমন- অ্যাকাউন্ট কেন বন্ধ হতে পারে বা অ্যাকাউন্ট বন্ধ হলেও টাকা হারানোর ভয় নেই ইত্যাদি তথ্য সম্পর্কে অবগত থাকা।

তৃতীয়ত: ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি), পিন বা কোনো ধরনের তথ্য না জানানো। এমনকি যোগ-বিয়োগের ছলেও কিছু জানতে চাইলে তা না জানানো। ওটিপি ও পিন যে গোপন তথ্য কাউকে জানানো যাবে না, সে বিষয়ে নিজে সচেতন হওয়া এবং প্রিয়জনকে সচেতন করা।

চতুর্থত: অপরিচিত কারোর সঙ্গে নিজের অন্য কোনো মোবাইল নম্বর বা পরিবারের অন্য কোনো মোবাইল নম্বর শেয়ার করা যাবে না। অপরিচিত নম্বরের সন্দেহজনক ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা না বলে লাইন কেটে দেয়া জরুরি।

পঞ্চমত: অপরিচিত সন্দেহজনক ফোন এলে তা কেটে দিয়ে গ্রাহক নিজেই সংশ্লিষ্ট এমএফএস সেবার কল সেন্টারের নম্বরে ফোন করে কথা বলে যেসব তথ্য পেয়েছেন তা সত্য কিনা যাচাই করে নিতে পারেন।

সচেতনতা আরেকটি পদক্ষেপেই গুটিকয়েক প্রতারককে রুখে দিয়ে নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে প্রয়োজনীয়, যুগোপযোগী এবং নিরাপদ এ সেবা ব্যবহার করতে পারেন গ্রাহক।

এআরএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]