টাকা ফিরে পেতে পি কে’র চার প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে আইএলএফএসএল

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:১৪ পিএম, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
আইএলএফএসএল’র বার্ষিক সাধারণ সভা

একসময় ভালো ব্যবসা করলেও প্রশান্ত কুমার হালদার বা পি কে হালদারের ব্যাপক লুটপাটের কারণে এখন নানা সমস্যায় পতিত হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড (আইএলএফএসএল)। পি কে তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে আইএলএফএসএল থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঋণ হিসেবে নিয়ে গেছে।

এর মধ্যে রেপ্টাইলস ফার্ম লিমিটেড, আনান কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, রহমান কেমিক্যালস এবং নর্দান জুটের কাছে বর্তমানে আইএলএফএসএল’র পাওনা ২৬০ কোটি টাকা। তবে এই চার প্রতিষ্ঠানের বন্ধকি সম্পত্তির মূল্য মাত্র ৩৬ কোটি টাকা। এজন্য আটকে যাওয়া ঋণের টাকা আদায় করতে পি কে হালদারের এই চার প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে আইএলএফএসএল।

বৃহস্পতিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) কোম্পানিটির ২৬তম বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) শেষে সংবাদ সম্মেলনে আইএলএফএসএল’র চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম খান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. মশিউর রহমান এসব কথা বলেন।

এ উদ্যোগের বিষয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, পি কে হালদারের অনেকগুলো কোম্পানি ছিল। আমরা প্রথম চেষ্টা করি হালদারকে যদি আনতে পারি, তাহলে তার কাছে থেকে এগুলো নেওয়া সোজা হবে। কিন্তু প্রক্রিয়ায় গেলে বিক্রি করতে অনেক বছর লাগে। আবার এমন প্রক্রিয়ায় করেছে তাকে সরাসরি ধরা যায় না। আমরা চেয়েছিলাম হারদার আনতে, সেজন্য কোর্টে আবেদন করেছিলাম। কোর্টও বলেছিলেন, কিন্তু তিনি আর আসেননি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বলেছিল রেড অ্যালার্ট দিয়ে তাকে নিয়ে আসবে, কিন্তু খবর নেই। আগামীতে আসবেন কি না জানি না।

‘সে কারণে আমরা তার কোম্পানি রেপ্টাইলস ফার্ম লিমিটেড পুনর্গঠন করে চিন্তা করছি কিছু আয় করা যায় কি না। কেন করেছি? ওখানে প্রায় দেড় হাজার কুমির মারা গেছে। দুই বছর খেতে পায়নি। অনেক জিনিসপত্র লোকজন নিয়ে গেছে। সেটা এখন পুনর্গঠন করা দরকার। আমরা দেখছি কুমিরের ওখানে লোকজন বেশি গেলে আর ডিম পাড়ে না, প্রজনন হয় না। সেজন্য আমরা ভাবছি সব জায়গায় ডিস্টার্ব না করে, একটা জায়গায় দিলে লোকে যাবে, এজন্য টিকিট কাটবে। আর একটা আমাদের চিন্তায় আছে, ওখানে রিসোর্ট থাকবে। লোকজন ইনভেস্ট করবে, আমরা ইনভেস্টর খুঁজছি। তারা ঘর বানাবে, তার পাশে ওখান থেকে আমরা কুমির দেব। তাদের সঙ্গে আমাদের একটা জয়েন্ট ভেঞ্চার হবে, প্রফিট শেয়ারিং হবে।’ বলেন নজরুল ইসলাম খান।

তিনি বলেন, আর একটা কোম্পানি আনান কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ। এটা খুবই ভালো মুনাফার কোম্পানি। ফিটকিরি তৈরির কোম্পানি, তার-টার চুরি করে নিয়ে গেছে লোকজন। সেটা কোর্টের অনুমোদন নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন হয়েছে। এখন আমরা হাত দিয়েছি। চেয়ারম্যান আছেন, পরিচালক আছেন। তারা চেষ্টা করছেন এটা চালু করতে পারেন কি না। এটা যদি চালু করতে পারেন, তাহলে প্রফিট হবে।

তিনি আরও বলেন, তৃতীয় কোম্পানি হলো রহমান কেমিক্যালস, এটা গ্লুকোজ তৈরি করে। সেটা আমরা অনুমতি পেয়েছি, কিন্তু বোর্ড এখনো পুনর্গঠন করিনি। আমরা দেখছি কী কী অসুবিধা আছে, কতদূর এগোতে পারবো। আর একটা নর্দান জুট। আমরা লোকজন খুঁজছি, পুরোনো ঋণ থাকলো, এর ওপর তাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হবে, এটা চালাবে এবং আমাদের কিছু টাকা দেবে।

আমরা এটা করছি, কারণ আমরা হিসাব করে দেখেছি মোট ঋণ ২৬০ কোটি টাকা, কিন্তু আমরা বিক্রি করলে ৩৬ কোটি টাকার মতো পাবো। তাহলে বিক্রি করে তো আমাদের কোনো লাভ নেই। সে কারণে আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি। বলেন সাবেক এই সচিব।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইএলএফএসএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. মশিউর রহমান বলেন, ৪ হাজার ৬৫২ জন গ্রাহককে এরই মধ্যে ১৩৯ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া ঋণ বিতরণের পরিমাণ আছে প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ খেলাপি।

এর আগে লিখিত বক্তব্যে আইএলএফএসএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. মশিউর রহমান বলেন, ২০১৫-২০১৯ সময়ের মধ্যে আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে ক্ষতি হওয়ার পরে প্রতিষ্ঠানটি পুনরুদ্ধার এবং পুনর্গঠনের পথে রয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে সামগ্রিক ব্যয় ২১ শতাংশ কমেছে, সুদের আয় প্রায় একই পর্যায়ে ছিল, তবে তা বাড়বে। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে আমাদের ৭০ শতাংশ সামগ্রিক ক্ষতি কমানো হয়েছে। পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ও এর গতিশীলতা ত্বরান্বিত করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের আমানত ও ঋণের দায়কে ইক্যুইটিতে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে এরই মধ্যে সোনার বাংলা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে ইস্যু ম্যানেজমেন্ট পরিষেবার জন্য একটি চুক্তি সই হয়েছে। যার মাধ্যমে আমাদের সামগ্রিক দায়ের সঙ্গে অর্জিত সম্পদের পরিপূরক সহাবস্থান বজায় রেখে নগদ প্রবাহ সৃষ্টির পথকে মসৃণ করবে।

তিনি আরও বলেন, ২০২০ সালের জুন থেকে উচ্চ আদালত হতে নিযুক্ত স্বাধীন পর্ষদের নেতৃত্বের প্রতি আমরা অনুগত এবং তাদের প্রণীত নিয়ম ও প্রবিধান অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করছি। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আমরা এরই মধ্যে আমাদের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনেছি।

মশিউর রহমান বলেন, আইএলএফএসএল’র একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান আইএল ক্যাপিটাল ২০২০ সালে ৭৫ লাখ টাকার নিট লোকসান থেকে ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা নিট মুনাফা অর্জন করে রেকর্ড করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ক্রমে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে এবং ২০২২ সালের জুনে আইএলএফএসএল-কে ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে। আরেকটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজ লিমিটেড ২০২০ সালের নাট লোকসান ১৩৭ মিলিয়ন থেকে ২০২১ সালে ২৩ মিলিয়নে নামিয়ে এনেছে। ঋণের দায়কে ইক্যুইটিতে রূপান্তরিত করে ব্যালেন্স শিট পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে।

তিনি বলেন, আমাদের চারটি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান, যাদের প্রতিষ্ঠিত কারখানা এবং লাভজনক প্রকল্প ছিল। কিন্তু তাদের পরিচালনা পর্যদ পলাতক এবং নিষ্ক্রিয় থাকার কারণে এই খেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এমতাবস্থায়, আইএলএফএসএল একটি সৃজনশীল উদ্যোগ নিয়েছে। হাইকোর্টে তিনটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের আবেদন করা হয়েছে। এই চারটি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের নিকট আইএলএফএসএল’র বকেয়া প্রায় ২৬০ কোটি টাকা, কিন্তু তাদের বন্ধকি সম্পত্তির তাৎক্ষণিক মূল্য মাত্র ৩৬ কোটি টাকা।

তিনি আরও বলেন, এরই মধ্যে হাইকোর্ট বেন্টাইলস ফার্ম লিমিটেড এবং আনান কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছেন। পরিবর্তিত নতুন পর্ষদ আইএলএফএসএল’র ঋণ পরিশোধ করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার লক্ষ্যে তাদের স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন আইএলএফএসএল’র স্বতন্ত্র পরিচালক সেয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অব.) মো. সফিকুল ইসলাম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মেফতাউল করিম, ব্যারিস্টার মুহাম্মদ আশরাফ আলী এবং মো. এনামুল হাসান।

এমএএস/ইএ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।