বই আলোচনা
আমার কবিতা: স্পর্শে বেঁচে থাকার আকুলতা
আমিরুল আবেদিন
কবি মামুন রশীদের সঙ্গে পরিচয় সংবাদপত্রে কাজ করার সুবাদে। সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। মামুন রশীদকে গোপনে আবিষ্কার করতে গিয়েই তার ‘এই বইটির কোনো নাম দেব না’ কাব্যগ্রন্থটি পড়া হয়। এই কাব্যগ্রন্থের ‘চোখ যে ছবি ধরে রাখে মন’ কবিতাটি দিয়েই কবিকে আবিষ্কার। কাব্যগ্রন্থটির এই কবিতা দিয়েই মূলত ব্যক্তিগতভাবে মামুন রশীদকে বিচ্ছিন্নভাবে জানার শুরু। মামুন রশীদ যখন লিখছেন—‘শুধু মানুষেরই সকল ব্যর্থতার চিহ্ন/ লাল-টকটকে সূর্যের রঙ/ অস্থিরতার হিমছটা, যাকে ভালোবাসি-মন থেকে…’ তখন স্বভাবতই মুগ্ধ হই। ওই সময়ই বুঝে যাই, কবি হিসেবে নিজের ব্যক্তিসত্তাকে মামুন রশীদ রেখে দিতে চান রহস্যে, গোধূলির আবছায়ার মধ্যে। কিন্তু কবিতার লাইনে একটা কমা এমনকি একটি হাইফেন বসানোর ক্ষেত্রেও তার যত্নের ছাপ চোখে পড়ার মতো। এই যে দীর্ঘদিন যত্ন নিয়ে তিনি লিখছেন, লিখে চলেছেন—এসব কিছুই তিনি করে যাচ্ছেন অন্তরালে।
পেশায় তিনি সাংবাদিক। নিজের পরিচয়কে সবার প্রথমে রাখেন। সাংবাদিকতার দরুণ বিশাল ব্যপ্ত পড়াশোনার যে জগতে তিনি ডুবে থাকেন, সেগুলোর প্রকাশ বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ করেছেন কবিতায়। পেশার তাগিদেই এত বিশাল বিশাল ধারণাকে জানতে হয়েছে অথচ কোনোটিকেই সম্পূর্ণভাবে তিনি আয়ত্ত করতে পারেননি বলেই হয়তো ভাবেন তার কবিতা দুর্বল। কিন্তু সময় তো বয়ে যায়। প্রভাব পড়ে শরীরে আর মনে। সেই তাগাদা থেকেই নিজের পুরোনো সব লেখাকে আবার গুছিয়ে এক মলাটে আনার ইচ্ছেটুকু হয়তো তিনি অনুভব করেছেন। সে তাগিদেই এক মলাটে প্রকাশ করলেন ‘আমার কবিতা’ নামে কাব্য সংকলন। বেহুলাবাংলা থেকে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থটি হাতে এসেছে কিছুদিন হলো। ব্যস্ততার মাঝেও বিভিন্ন সময়ে কবিতাগুলো নেড়েচেড়ে আবার মামুন রশীদকে বিস্তৃত পরিসরে আবিষ্কারের চেষ্টা করলাম।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। তার এই কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গপত্রে তিনি কারো নাম দেননি। বরং বলছেন, ‘কোনো পঙ্ক্তি যদি চিন্তায় অনুরণিত হয়ে অনুভব করায় আত্মীয়তার বন্ধন, তার স্মরণে।’ অর্থাৎ তিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছেন, তার কবিতায় চিন্তার ছাপ আছে। তাই তো তার কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ, পাতার সম্পাদনা, কাব্যগ্রন্থের পর্যায়ক্রম থেকে শুরু করে সবকিছুতেই তিনি কাব্যিক আবহ রাখার চেষ্টা করেছেন।
এতকিছু বোঝার পরও মামুন রশীদের সামনে আমরা ভয়াবহ সমালোচক। তার কবিতাকে আমরা ছিঁড়েখুঁড়ে তার সামনে আলোচনা করি আর তিনি হাঁসফাস করেন। ভাবেন তার কবিতা দুর্বল। কথাটি মোটেও সত্য নয়। বরং মনে হয়েছে, পাঠক হিসেবে আমাদের শক্তিমত্তার যে অহম; সেখানে ভয়াবহ দুর্বলতা রয়েছে। এই দুর্বলতাটুকু ঢাকার তাগিদ থেকেই আসলে লেখাটি আনা। মূলত সমালোচনা সাহিত্য এক ধরনের প্রশংসা। আবার এই প্রশংসা এমন এক সমালোচনা, যা কবিকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে দিতে বাধ্য। অস্বস্তিটুকুই তাকে দিতে চাই সাম্প্রতিক কবিতার সংকলন ‘আমার কবিতা’ দিয়ে।
০২.
কবিতার বইয়ের অলিগলি আবিষ্কারের আগে এখন সবার প্রথমে আসলে বইটির কাঠামোই চোখে পড়ে। পেপারব্যাকের বইটি একজন সৌখিন পাঠকের কাছে হয়তো কিছুটা অপ্রীতিকর মনে হবে। কবিতার বই থাকবে হার্ডব্যাক। তার স্পাইন, প্রচ্ছদ, পাতার সবকিছুতেই এক ধরনের জাঁকজমক থাকবে, এমনটিই কবিতার পাঠকেরা প্রত্যাশা করেন। বইটি পেপারব্যাক হলেও এখানে মমতার ছাপ স্পষ্ট। বইটি তিনি প্রকাশ করেছেন তার প্রচ্ছদ, ফন্ট, বানান থেকে শুরু করে পরিকল্পনা; সবকিছুতেই মামুন রশীদ আছেন। নিজেকে গুটিয়ে রাখার মানসিক চাপটুকু মামুন রশীদের মধ্যে প্রবল। অন্তত তার ‘আমি তোর রাফখাতা’ কাব্যগ্রন্থটির ‘অভিশাপ’ কবিতায় যখন তিনি বলেন, ‘নত হতে হতে কেঁচো হয়ে গেছি/ হেরে যেতে যেতে কেঁচো হয়ে গেছি/ ভয় পেতে পেতে কেঁচো হয়ে গেছি/ মুখোশ পরতে পরতে কেঁচো হয়ে গেছি…’ তখন আমাদের নাগরিক মন মফস্বল কিংবা গ্রামীণ পর্যায় থেকেই অস্বস্তিতে ভোগে। মামুন রশীদের কবিতার শব্দগুলো মফস্বল, গ্রামীণ, পুরাণের, বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য টার্মসের। কিন্তু চিন্তার জগতে তিনি ভীষণ নগরমুখী। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, সাংবাদিকতার দরুণ জাতীয় রাজনীতি এবং সমাজ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো সম্পাদনার মানসিক পীড়া তার ব্যক্তি জীবনেও প্রভাব ফেলেছে ভয়াবহভাবে। তাই দীর্ঘদিন আমরা যখন শহর থেকে গ্রামমুখী হতে চাই, মামুন রশীদের কবিতা আমাকে বলে, এই শহরেই অনেক কিছু রয়েছে।
- আরও পড়ুন
ঘরে বাইরে: প্রথা ভাঙার উপাখ্যান
০৩.
একটি কবিতার সংকলন নিয়ে আলোচনা করা সহজ নয়। যখন সংকলন নিয়ে আলোচনা করা হয়, তখন কবির সামগ্রিক অস্তিত্বকে নিয়ে প্রশ্ন করতে হয় পাঠককে। একজন কবির সঙ্গে একজন গদ্যকার এবং সাহিত্য সমালোচকের পার্থক্য অনেক। একজন কবি পঙ্ক্তিতে যা ফুটিয়ে তোলেন, তা একজন গদ্যকারকে বাস্তব প্রেক্ষাপটে ফুটিয়ে তুলতে হয় পাতার পর পাতা লিখে। তাই কবির রচনা দুর্বল কি না তা এই আধুনিক সময়ে অন্তত আমি দৃশ্যকল্প দিয়ে বিচার করতে পারি না। আমার দৃষ্টিতে, কবিতায় শব্দগুলো কি চিন্তার প্রকাশ ঘটাচ্ছে সেটিই বেশি জরুরি। এই চিন্তার খোরাক নাগরিক কবিতার ক্ষেত্রে শামসুর রাহমানে ভীষণভাবে পেয়েছি। ওপার বাংলার কবিদের মধ্যে পেয়েছি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায়।
কবিতায় প্রেম সব সময়ই একটি বিষয়বস্তু হয়ে থাকে। কিন্তু প্রেমের স্বরূপ কী? প্রেম শুধু নর-নারীর নয়। এই প্রেম নিজ অস্তিত্বের প্রতিও হতে পারে। আমাদের জীবনটুকু ভীষণ কায়ক্লেশে কাটছে। অন্তত এই শহরে সবার ভীষণ তাড়া। নিরন্তর ছুটছি আমরা। শহরে ফুটপাতে আনমনে ভেবে হাঁটার সুযোগ নেই। ঘরে একটানা বসে একটু সুখের আলাপের সুযোগ নেই। নিজ সন্তানও কেন যেন অনেকটাই চুপচাপ। তাই নিজের একটি ঘর থাকার পরও, সৃষ্টির উন্মাদে থাকা যে কেউই ভীষণ একাকিত্বে ভোগেন। এই একাকিত্বের অনুভূতি মামুন রশীদের কবিতায় পর্যায়ক্রমে ভীষণভাবে পাওয়া যায়।
‘আমার কবিতা’ কাব্যগ্রন্থটিতে মামুন রশীদের পাঁচটি কবিতার বই এক মলাটে এসেছে। কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদটি দেখে মনে হয়, মামুন রশীদ যেন জানালা দিয়েই জগতকে দেখেন। এই জানালা দিয়ে ঢুকতে গেলে মামুন রশীদের প্রথম প্রকাশিত কবিতার বইটি আসে না। আসে তার সর্বশেষ প্রকাশ পাওয়া কবিতার বই ‘আমি তোর রাফখাতা?’ (২০২০)। এর ৬ বছর আগে তিনি লিখেছিলেন ‘এই বইটির কোনো নাম দিব না’ (২০১৪)। তার এক বছর আগে তিনি লিখেছেন ‘তোমার পরে মেঘ জমলে’ (২০১৩)। এর ৪ বছর আগে ‘কুশল তোমার বাঞ্ছা করি’ (২০০৯) এবং তার সর্বপ্রথম কবিতার বই ২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘কালোপাতা, ওড়ো, সাদাছাই’।
অর্থাৎ নিজের পাঁচটি বই প্রকাশের জন্য তিনি অনেক লম্বা সময় নিয়েছেন। পাঁচটি সময়েই তার কবিতার ভাষা, শব্দ এবং বিষয়বস্তু পাল্টেছে। কিন্তু চিন্তার জায়গাতে তিনি সেই নাগরিক ভাবনারই প্রকাশ ঘটিয়েছেন বলে আমার মনে হয়েছে। সেটি কীভাবে? দেখা যাক।
০৪.
‘আমি তোর রাফখাতা’ যখন আমি প্রথম পড়ি; তখন সবগুলো কবিতাতেই প্রেমের আর্তিটুকু বেশি চোখে লেগেছে। কিন্তু এই প্রেম শুধু একজন নারীর প্রতি কামুক দৃষ্টিভঙ্গির মতো সংকীর্ণ নয়। বরং এই প্রেম শূন্যতার। ভীষণ একা মামুন রশীদ যখন তার ‘এক মিনিট’ কবিতায় বলেন—‘আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হয়/ তোমার সঙ্গে আমার দূরত্ব এক মিনিট’ ওই সময় এই দূরত্ব জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকার। হ্যাঁ, এই নাগরিক জীবনে আমরা সবাই প্রেমকে উদযাপন করতে চাই। সেই উদযাপনের মূল উপলক্ষ্য থাকে একাকিত্বকে বরণ করার। এজন্যই তিনি ‘একাকিত্ব’ কবিতায় আবার লেখেন, ‘লেভেল ক্রসিংয়ে হুটোপুটি করছে কয়েকটি নেকড়ে।/ দূরে, শ্বেতশুভ্র এক খরগোশ স্তব্ধ হয়ে আসা আকাশের/ রঙের কাছে শিখছে একাকিত্ব…’।
এই একাকিত্বকেই বর্ণমালায় ফুঁটিয়ে লিখছেন, ‘বর্ণমালা, প্রেমে না অপ্রেমে তাকিয়েছিলাম, বুঝিনি।/ প্রথম দেখার মুগ্ধতা তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছিল…’
অর্থাৎ সার্বিকভাবে মামুন রশীদ তার সব কবিতায় প্রেমকে ফুঁটিয়ে তুলতে চেয়েছেন ভাবনার শব্দে। প্রতিটা শব্দকেই তিনি টেনেছেন এমন সব শব্দে যেগুলো শহরের মানুষের কাছে পরিচিত। তার কবিতায় যেমন সুতো, নাটাই আছে তেমনি আছে শিমুলের কথা। তার কবিতায় যেমন আছে বুদ্ধ, বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের পরত, তেমনই আছে গৃহিণীর হেঁশেলের জগত। অর্থাৎ আমাদের এই সংকীর্ণ নাগরিক জীবনের সবটুকুই মামুন রশীদের কবিতায় বহুবার এসেছে। এই নগরজীবনের পৃষ্ঠাটুকু তিনি স্মৃতির ক্যানভাসে আঁকতে চেয়েছেন হয়তো। এসব আমাদের আসলে জানার সুযোগ হবে কম।
মামুন রশীদের ‘আমার কবিতা’ কাব্যগ্রন্থটি এখন পর্যন্ত তার লেখা কবিতা ভাবনার জ্বলজ্বলে নজির। বইটির সবগুলো কবিতা নিয়ে এখন সবিস্তারে আলোচনা করতে গেলে লেখাটি ভীষণ বড় হয়ে যাবে। সে চেষ্টা আপাতত করতে চাই না। একজন কবিকে আবিষ্কার করার শ্রেষ্ঠ সময় তার জীবদ্দশা। কিন্তু তিনি যখন পৃথিবীর ধূলিরেখা ছেড়ে যান, তখন তার মূল্যায়ন শুরু হয় বলেই সব সময় দেখছি। কিন্তু এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। কবিতা ছড়িয়ে পড়ুক চিন্তার অনুরণনে। ফেসবুকে চটকদার ভাষায় নয়, চিন্তায়।
মামুন রশীদের কবিতা আমাকে বরাবরই চিন্তার খোরাক জোগায়। এই চিন্তাটুকুকে পাঠকের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারলে এ সংকীর্ণ লেখাটি সার্থক হবে বলে মনে করি। কারণ মামুন রশীদ তো বলেছেনই, ‘স্পর্শের মাঝে রয়েছে বেঁচে থাকার আকুলতা।’ স্পর্শ আর বেঁচে থাকা আসলে পাঠকের মাঝে লুকিয়ে রয়েছে। ‘আমার কবিতা’ সংকলনটি হাতে নিলে কাগজ। কিন্তু এ কাগুজে স্পর্শ কবিকে আর তার ভাবনাকে জিইয়ে তুলতে পারে। হয়তো সামনে মামুন রশীদের ভাবনার আরও নতুন পরত পাবো। কারণ তিনি আরও লিখবেন সামনে। সেজন্য অপেক্ষায় থাকবো, আছি।
এসইউ