ঈদের পর বইমেলা আয়োজনের দাবি প্রকাশকদের

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ , লেখক ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০২:৫৭ পিএম, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির বইমেলা স্ট্যান্ডিং কমিটির মতবিনিময় সভা

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর আয়োজন ও সময়সীমা নিয়ে প্রকাশকদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির বইমেলা স্ট্যান্ডিং কমিটির মতবিনিময় সভায় সৃজনশীল প্রকাশকেরা সেই উদ্বেগ ও বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। কেননা প্রকাশকেরা রমজান মাসে বইমেলার আয়োজন চান না। বাপুসের পক্ষ থেকে ২৫ জানুয়ারি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বরাবর এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

জানা যায়, ২০২৬ সালের অমর একুশে বইমেলা নির্ধারিত হয়েছে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। তাই প্রকাশকেরা দাবি করছেন, পবিত্র রমজান মাসে বইমেলার আয়োজন মানেই প্রকাশকদের জন্য প্রায় নিশ্চিত লোকসান। তাই সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে অমর একুশে বইমেলা অবশ্যই ঈদের পর আয়োজন করা জরুরি। করোনাকালীন দীর্ঘ স্থবিরতার ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই একের পর এক লোকসানি বইমেলা, পাঠকসংখ্যার ভয়াবহ পতন এবং কাগজ ও মুদ্রণ ব্যয়ের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি প্রকাশনা শিল্পকে চরম অস্তিত্ব সংকটে ঠেলে দিয়েছে। বহু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। যারা টিকে আছেন; তারা কার্যত শেষ সম্বল আঁকড়ে ধরে আছেন।

কিংবদন্তী পাবলিকেশনের প্রকাশক অঞ্জন হাসান পবন বলেন, ‘প্রকাশনা শিল্প বর্তমানে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। করোনা-পরবর্তী হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টিকে থাকলেও অধিকাংশ প্রকাশকই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকেই সব হারিয়ে পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন। এই অস্থির বাস্তবতার মধ্যে বইমেলার সময়সূচি প্রকাশকদের জন্য আরও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বইমেলার সম্ভাব্য সময়ের ঠিক আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, এরপর রমজান ও ঈদের প্রস্তুতি। ঈদের এক সপ্তাহ আগেই ঢাকা কার্যত ফাঁকা হয়ে যায়। এমন সময়ে বইমেলা আয়োজন কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। পাঠকের উপস্থিতি থাকবে নগণ্য, ফলে মেলাটি সার্থক হবে না। আমরা বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রায় কোটি টাকার বিনিয়োগ করি। রমজানে বইমেলা হলে লাভ তো দূরের কথা, নিশ্চিতভাবেই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। তাই স্পষ্টভাবে বলতে চাই—কোনো অবস্থাতেই আমরা রমজানে বইমেলা চাই না। ঈদের পর বইমেলা আয়োজনই এখন সময়ের দাবি।’

আহমেদ পাবলিশিং হাউজের প্রকাশক মেসবাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা একটি প্রকাশকবান্ধব বইমেলা চাই—এটাই আমাদের মূল ও স্পষ্ট দাবি। কিন্তু বাংলা একাডেমি যে সময়সীমার মধ্যে বইমেলা আয়োজন করতে চাইছে, তা কোনোভাবেই প্রকাশকবান্ধব নয়। বাস্তবতা হলো, এই সময়সূচি প্রকাশকদের জন্য অনুকূল নয় এবং এতে অংশগ্রহণ করলে অধিকাংশ প্রকাশককেই নিশ্চিত আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।’

তিনি বলেন, ‘রমজান মাস সিয়াম সাধনার মাস। মাসজুড়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নানান ধর্মীয় কার্যক্রম থাকে। তারাবির নামাজ, ইবাদত-বন্দেগি এবং ধর্মীয় প্রস্তুতিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সঙ্গে সময়টি গভীরভাবে জড়িত। স্বাভাবিকভাবেই এ সময়ে পাঠক সমাগম কমে যায়, বই বিক্রি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায় না। বইমেলার স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্য বজায় থাকে না।’

মেসবাহউদ্দিন বলেন, ‘আমার জানা মতে, কোনো সচেতন প্রকাশকই এই নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বইমেলা আয়োজনের পক্ষে নন। কারণ এই সময় বইমেলায় অংশগ্রহণ করা মানেই নিশ্চিত ক্ষতির ঝুঁকি নেওয়া। এমন বাস্তবতায় বইমেলা আয়োজন করা হলে তা প্রকাশনা শিল্পকে আরও সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বইমেলার বিরোধিতা করছি না। আমরা চাই বইমেলা হোক—তবে এমন সময়ে, এমন বাস্তবতায়, যেখানে প্রকাশকেরা সম্মানের সঙ্গে অংশ নিতে পারেন এবং টিকে থাকার ন্যূনতম সুযোগ পান। প্রকাশকদের এই যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত দাবিকে উপেক্ষা করা হলে একটি সফল ও প্রাণবন্ত বইমেলা আয়োজন সম্ভব হবে না।’

অনন্যার প্রকাশক মনিরুল হক বলেন, ‘আমরা অনন্যা প্রকাশনা এবারের বইমেলায় অংশগ্রহণ করতে অনিচ্ছুক। কারণ পুরো বইমেলার সময়জুড়েই রমজান মাস থাকবে। রমজানে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ইবাদতে ব্যস্ত থাকেন, ফলে পাঠক উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। তাছাড়া ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে এই সময়ে বইমেলা আয়োজন না করাই উত্তম বলে মনে করি।’

বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. গফুর হোসেন বলেন, ‘আমরা বইমেলার বিরুদ্ধে নই। আমরা বইমেলা চাই—কিন্তু এমন একটি সময় ও বাস্তবতায়, যেখানে প্রকাশকেরা অন্তত টিকে থাকার সুযোগ পাবেন। এটি কোনো আবেগী দাবি নয়; এটি সাধারণ প্রকাশকদের যৌক্তিক, ন্যায্য ও সময়োপযোগী দাবি।’

তিনি বলেন, ‘রমজান মাসে বই বিক্রির বাস্তব চিত্র কারও অজানা নয়। দিনের বেলা পাঠক প্রায় অনুপস্থিত থাকেন। সন্ধ্যার পর ইফতার, তারাবি ও ধর্মীয় ব্যস্ততায় মেলায় আসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা রমজানের শেষভাগে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের কেনাকাটা, বাজার-সদাই এবং ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। গ্রামের বাড়ি ফেরার হিড়িক শুরু হয়, ধীরে ধীরে ঢাকা শহর ফাঁকা হতে থাকে। ফলে পরিবার নিয়ে বইমেলায় আসার যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রবণতা, তা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।’

গফুর হোসেন বলেন, ‘অথচ এ সময়েও স্টল ভাড়া, স্টল নির্মাণ ব্যয়, স্টল প্রতিনিধি ও কর্মচারীদের বেতন, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ এক টাকাও কমবে না। ফলে রমজান মাসে বইমেলায় অংশগ্রহণ করা মানেই প্রকাশকদের জন্য নিশ্চিত ও পরিকল্পিত লোকসান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ভয়াবহ অনিশ্চয়তা। নির্বাচন, নির্বাচনী ফলাফল, নতুন সরকার গঠন ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে সারাদেশ থাকবে এক ধরনের উৎকণ্ঠা ও অস্থিরতার মধ্যে। এই বাস্তবতায় বইমেলার প্রস্তুতি ও আয়োজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ কখন বইমেলার কাঠামোগত কাজ—যেমন বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন, ইটের সোলিং, স্টল নির্মাণসহ সার্বিক অবকাঠামো সম্পন্ন করে স্টল হস্তান্তর করবে, কবে লটারি অনুষ্ঠিত হবে—এসব বিষয়ে এখনো কোনো সুস্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সময়সূচি দিতে পারছেন না। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রকাশকদের বিনিয়োগ করা মানে অজানার দিকে ঝাঁপ দেওয়া। সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পকে বাঁচাতে এবং সাধারণ প্রকাশকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বইমেলা ঈদের পর আয়োজন করা ছাড়া আর কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প নেই। এটি কারও বিরুদ্ধে নয়—এটি একটি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।’

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি বইমেলা অবশ্যই অনুষ্ঠিত হবে। সে লক্ষ্যেই প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়েছে। প্রকাশকেরা অংশগ্রহণ না করলেও একাডেমি নিজ উদ্যোগেই মেলার আয়োজন করবে।’

এসইউ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।