অমোচনীয় কালি কি, কেন দেওয়া হয়?

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৫৮ পিএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
অমোচনীয় কালি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক চিহ্ন নয় এটি গণতন্ত্র রক্ষার এক কার্যকর ও পরীক্ষিত ব্যবস্থা

প্রথমে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পর পোলিং অফিসার ভোটার তালিকায় আপনার নাম এবং ক্রমিক নম্বর যাচাই করবেন। ভোটার তালিকায় নাম ও ছবি মিললেই ভোট দেওয়া সম্ভব। সবকিছু ঠিক থাকলে ভোটারের বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলে বা অন্য কোনো আঙুলে অমোচনীয় কালির দাগ দেবেন।

নির্বাচনের দিন ভোটারের আঙুলে যে বেগুনি কালি লাগানো হয় সেটাকেই বলে অমোচনীয় কালি। সেটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক চিহ্ন নয় এটি গণতন্ত্র রক্ষার এক কার্যকর ও পরীক্ষিত ব্যবস্থা। ভোটার একবার ভোট দিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে এবং একই ব্যক্তি যেন একাধিকবার ভোট দিতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই এই কালি ব্যবহার করা হয়। বহু দেশে এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কেন দেওয়া হয় অমোচনীয় কালি?
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‘এক ব্যক্তি, এক ভোট’ নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে ভোটকেন্দ্রে বিপুল মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘ লাইন এবং নানা প্রশাসনিক চাপে কখনো কখনো অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হয়। কেউ যদি একাধিক কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করেন, তা ঠেকাতে একটি দৃশ্যমান, দ্রুত এবং কম খরচের পদ্ধতি দরকার। অমোচনীয় কালি সেই কাজটাই করে।

ইতিহাসে বিশ্ব নেতাদের আলোচিত উত্থান, পতন ও পরিসমাপ্তি

ভোটার তালিকায় নাম মিলিয়ে ভোট দেওয়ার পর ভোটারের বাম হাতের তর্জনী বা নির্দিষ্ট আঙুলে কালি লাগানো হয়। এই কালি সাধারণ সাবান-পানি দিয়ে সহজে ওঠে না এবং কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত দাগ থাকে। ফলে একই ব্যক্তি আবার ভোটকেন্দ্রে গেলে সহজেই বোঝা যায় যে তিনি এরই মধ্যে ভোট দিয়েছেন।

কবে থেকে শুরু?
অমোচনীয় কালি ব্যবহারের ইতিহাস প্রায় ৬০ বছরেরও বেশি পুরোনো। ১৯৬২ সালে প্রথমবারের মতো ভারতের সাধারণ নির্বাচনে এই কালি ব্যবহৃত হয়। সে সময় দেশজুড়ে বিপুল ভোটার এবং বিশাল ভৌগোলিক বিস্তারের কারণে একাধিকবার ভোট দেওয়ার ঝুঁকি ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞানীদের সহায়তায় তৈরি হয় বিশেষ ধরনের এক কালি, যা সহজে মোছা যায় না।

এরপর ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ, আফ্রিকার বিভিন্ন রাষ্ট্র, এমনকি লাতিন আমেরিকার কিছু দেশেও এই পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বহু বছর ধরেই এই কালি ব্যবহার করা হচ্ছে। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবং একই ব্যক্তি যেন একাধিকবার ভোট দিতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যে অমোচনীয় কালি ব্যবহার করা হয়। তখন থেকেই এটি বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে।

এরপর জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ সব ধরনের নির্বাচনে ধারাবাহিকভাবে এই কালি ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন সাধারণত সিলভার নাইট্রেটসমৃদ্ধ বিশেষ কালি ব্যবহার করে, যা কয়েকদিন পর্যন্ত আঙুলে দাগ রেখে দেয়।

অর্থাৎ প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের নির্বাচনে অমোচনীয় কালি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

ভোটার আইডি কার্ড অনলাইন কপি ডাউনলোড করবেন যেভাবে

কালি তৈরি হয় কীভাবে?
এই অমোচনীয় কালির মূল উপাদান হলো সিলভার নাইট্রেট। এটি ত্বকের উপরের স্তরের সঙ্গে বিক্রিয়া করে এক ধরনের স্থায়ী দাগ তৈরি করে। সাধারণত ১০ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশ সিলভার নাইট্রেট মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। কালি আঙুলে লাগানোর পর এটি ত্বকের কোষের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে এবং সূর্যালোকের সংস্পর্শে এলে আরও গাঢ় হয়ে যায়। এই কালি শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়, কারণ খুব অল্প পরিমাণ ব্যবহার করা হয় এবং এটি শুধু ত্বকের উপরিভাগে কাজ করে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘষা, ব্লিচ বা রাসায়নিক ব্যবহার করলেও সঙ্গে সঙ্গে পুরোপুরি তোলা যায় না।

কতদিন থাকে এই দাগ?
সাধারণত ৭ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত দাগ স্পষ্ট থাকে। কারও ত্বক অনুযায়ী এটি কিছুটা কম বা বেশি সময়ও থাকতে পারে। ত্বকের ওপরের মৃত কোষ ঝরে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাগও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। এ কারণেই একে ‘অমোচনীয়’ বলা হলেও এটি স্থায়ী নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্যকর।

কীভাবে প্রয়োগ করা হয়?
ভোটার যাচাই-বাছাই শেষে পোলিং অফিসার একটি ছোট বোতল বা মার্কার পেনের মতো যন্ত্র দিয়ে আঙুলে কালি লাগান। সাধারণত নখের গোড়া থেকে আঙুলের ওপরের অংশ পর্যন্ত একটি সরু দাগ টানা হয়। কিছু দেশে বুড়ো আঙুলে, কোথাও আবার তর্জনীতে কালি লাগানো হয় দেশভেদে নিয়ম ভিন্ন হতে পারে।

জালিয়াতি রোধে কতটা কার্যকর?
অমোচনীয় কালি নির্বাচনী জালিয়াতি রোধে একটি কার্যকর ও সাশ্রয়ী উপায় হিসেবে স্বীকৃত। বিশেষ করে যেসব দেশে জাতীয় পরিচয়পত্র বা বায়োমেট্রিক যাচাই পুরোপুরি নির্ভুল নয়, সেখানে এটি একটি বাড়তি নিরাপত্তা স্তর যোগ করে।

তবে শুধু কালি থাকলেই সব অনিয়ম বন্ধ হয়ে যায় না। ভুয়া ভোটার তালিকা, কেন্দ্র দখল বা জাল ভোট দেওয়ার মতো বড় অনিয়ম ঠেকাতে প্রশাসনিক কঠোরতা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনাও জরুরি। তবু ব্যক্তিগত পর্যায়ে একাধিকবার ভোট দেওয়া ঠেকাতে এই কালি অত্যন্ত কার্যকর।

পোস্টারহীন নির্বাচন, সবুজ স্বপ্নের পথে বাংলাদেশের রাজনীতি

প্রযুক্তির যুগে কি এখনও প্রয়োজন?
বর্তমানে অনেক দেশে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন), বায়োমেট্রিক যাচাই, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবুও অমোচনীয় কালি এখনও প্রাসঙ্গিক। কারণ প্রযুক্তি ব্যর্থ হতে পারে, বিদ্যুৎ বা নেটওয়ার্ক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে একটি দৃশ্যমান চিহ্ন হিসেবে কালি দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সমাধান দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির সমন্বয়ই নির্বাচনী নিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি নিশ্চিত করে।

বিতর্ক ও সমালোচনা
কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে যে কালি যথেষ্ট গাঢ় নয় বা দ্রুত উঠে গেছে। আবার কোথাও কোথাও কালির মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে বেশিরভাগ দেশেই নির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে কালি তৈরি ও সংরক্ষণ করা হয়, যাতে কার্যকারিতা বজায় থাকে। এছাড়া মানবাধিকার সংক্রান্ত কিছু প্রশ্নও মাঝে মাঝে উঠে আসে যেমন, ভোট না দেওয়ার অধিকার থাকলেও কালি লাগানো মানে কি ভোটারকে চিহ্নিত করা? তবে সাধারণভাবে এটি স্বেচ্ছায় ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয়।

প্রতীকী গুরুত্ব
অমোচনীয় কালি শুধু একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়, এটি গণতন্ত্রেরও এক প্রতীক। ভোট দিয়ে বের হওয়ার পর আঙুলের কালির দাগ অনেকের কাছে গর্বের চিহ্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই আঙুলের ছবি শেয়ার করার প্রবণতাও দেখা যায়। এটি নাগরিক দায়িত্ব পালন করার এক দৃশ্যমান স্মারক। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে নির্বাচনের দিন কালিযুক্ত আঙুল যেন উৎসবের অংশ হয়ে উঠেছে। তরুণ ভোটারদের কাছে এটি প্রথম ভোট দেওয়ার এক আবেগঘন মুহূর্তের স্মৃতি।

কেএসকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।