ভর্তি হতে মাসের পর মাস অপেক্ষা, ভোগান্তিতে রোগীরা

সালাহ উদ্দিন জসিম
সালাহ উদ্দিন জসিম সালাহ উদ্দিন জসিম , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:২৯ এএম, ০১ মে ২০২৬
জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউট এবং হাসপাতালে ভর্তির জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করছেন রোগীরা, ছবি: জাগো নিউজ

আলেয়া বেগম (৪৫)। ছয় মাস আগে গলায় ব্যথা নিয়ে এসেছিলেন ঢাকায়। জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউট এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিভিন্ন সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছেন, তার ক্যানসার হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা করতে হবে। কিন্তু ভর্তির জন্য ঘুরছেন গত চার মাস।

আলেয়া বেগমের স্বামী কামাল মন্ডল জাগো নিউজকে বলেন, ‘ছয় মাস ধরে অসুস্থ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এখানে (জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউট এবং হাসপাতাল) আবার ঢাকা মেডিকেল, এভাবে ছয় মাস ধরে ঘুরছি। চার মাস যাবত নাক কান গলা ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ভর্তির জন্য ঘুরছি। প্রথমে বলছে, দেড় মাসের ওষুধের কোর্স শেষ করে আসতে। আসছি। পরে বলছে, ১৫ দিন পরে আসতে। আসার পর আবার বলছে, সাত দিন পরে আসতে। আজকে সেই সাত দিন পর আসলাম। দেখি কী করে!’

কামাল মন্ডলের বাড়ি রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। প্রতিবার এত দূর থেকে হাসপাতালে আসেন। বললেন, ‘আপডাউন ব্যয়বহুল। আসা-যাওয়া করতে করতে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। ক্যানসার মানে মরণ রোগ।’

ভর্তি হতে মাসের পর মাস অপেক্ষা, ভোগান্তিতে রোগীরাজাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউট এবং হাসপাতাল, ছবি: জাগো নিউজ

কামাল মন্ডল বলেন, ‘এখান থেকে ঢাকা মেডিকেল পাঠায়। আবার ঢাকা মেডিকেল থেকে এখানে পাঠায়। এখানেও চার মাস ঘুরছি।’

ননী দাস (৭০)। গলার মধ্যে কী যেনো হয়েছে। কিছু খেতে পারেন না। খেলেই বমি করেন। চিকিৎসক দেখাতে এসেছিলেন গত ২৮ এপ্রিল। সেদিন ওষুধ দিয়ে বলেছিলেন কিছু পরীক্ষা করে ১৪ দিন পরে আসতে।

রোগীর ছেলে শিপন জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত দুদিন ওষুধ খাইয়ে দেখেছি। ওষুধ খাওয়ালেও বমি করে ফেলে দেন। খাওয়া তো ফেলে দেন-ই। আজ (৩০ এপ্রিল) আবার আসছি। নতুন টিকিট কাটলাম দেখাতে। তারা পাঠালো ৭ নম্বর রুমে (আবাসিক সার্জনের রুম)। এখানে তো ঢুকতেই দিচ্ছে না। বলে আগের নির্দেশনা ফলো করতে।’

ভর্তি হতে মাসের পর মাস অপেক্ষা, ভোগান্তিতে রোগীরাজাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউটে আবাসিক সার্জনের কক্ষের সামনে রোগীদের ভিড়, ছবি: জাগো নিউজ

আরও পড়ুন
উদ্বোধনের আড়াই বছরেও চালু হয়নি ২০ কোটি টাকার হাসপাতাল
হাসপাতালের পরিবেশে রোগীর মন ভালো না হলে তা পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নয়
অবশেষে যশোরবাসীর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বপ্ন পূরণের পথে
চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তারের দেখা পান দুই মিনিট

এ নিয়ে ৭ নম্বর কক্ষে কথা বলে জানা গেলো, মূলত রোগীর বায়োপসি পরীক্ষা করতে হবে। গলা অবশ করে ভেতর থেকে অস্বাভাবিক টিস্যুর নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করবে। এজন্য হাসপাতালে ভর্তি করা লাগবে। কিন্তু শয্যা খালি না থাকায় ১৪ দিন পরে আসতে বলা হয়েছে।

শুধু আলেয়া ও ননী দাসের গল্প এমন নয় জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউট এবং হাসপাতালে ভর্তি হতে চাইলে বেশিরভাগ রোগীকেই তিন থেকে চার মাস ঘুরতে হয়।

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের লাভ রোডে অবস্থিত জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউটট এবং হাসপাতালে বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালটি বেশ নিরিবিলি এলাকায়। সরকারি অন্য হাসপাতালের মতো রোগীর চাপ বেশি নেই। অব্যবস্থাপনাও নেই।

ভর্তি হতে মাসের পর মাস অপেক্ষা, ভোগান্তিতে রোগীরাজাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউটে টিকিট কাউন্টারে ভিড় নেই, ছবি: জাগো নিউজ

বেলা ১১টায় হাসপাতালের টিকিট কাউন্টারে তেমন সিরিয়াল দেখা যায়নি। জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগেও তেমন চাপ নেই। রোগী যা আছে, বেশ ভালোভাবেই সামাল দিচ্ছিলেন চিকিৎসকরা।

বহির্বিভাগের রুমগুলোর সামনে চেয়ার দেওয়া হয়েছে, অন্য হাসপাতালের মতো রোগীদের সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে না। বসেই অপেক্ষা করছেন। সিরিয়াল অনুযায়ী রোগী দেখাচ্ছেন। কারও কোনো অভিযোগ নেই।

ভর্তি হতে মাসের পর মাস অপেক্ষা, ভোগান্তিতে রোগীরাজাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউটে চিকিৎসককে দেখানোর জন্য রোগীদের অপেক্ষা, ছবি: জাগো নিউজ

কী কী ওষুধের সরবরাহ আছে, তারও তালিকা দেওয়া আছে, পাশেই টিক মার্ক দেওয়া। ভোগান্তি নেই তেমন। ভর্তি রোগীদের সেবা নিয়েও অভিযোগ নেই। হাসপাতাল করিডোর বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। তবে, হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে রোগীর চাপ অনেক।

হাসপাতালের আবাসিক সার্জনের (আরএস) রুমের সামনে অপেক্ষমাণ রোগীরা জানিয়েছেন, ভর্তির জন্য তাদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও স্বীকার করছে, শয্যার অভাবে এমনটা হচ্ছে।

আরও পড়ুন
প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’
বুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল
যন্ত্র সংকটে ধুঁকছে বিশেষায়িত ইউনিট, সেবা পাচ্ছে না নবজাতক
জনবল সংকটে পড়ে আছে হাসপাতালের ৪৮ কোটি টাকার ছয়তলা নতুন ভবন

জানা গেছে, রাজধানীর বিশেষায়িত এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে গত ২৯ এপ্রিল চিকিৎসা নিয়েছেন ৪৬৫ জন। জরুরি বিভাগে স্বাভাবিক চিকিৎসা নিয়েছেন ২৪ জন। জরুরি সার্জারি করা হয়েছে ৪৫ জনের। ভর্তি করা হয়েছে ১১ জনকে। তবে বৃষ্টিপাতের কারণে এদিন রোগী স্বাভাবিকের তুলনায় কম ছিল।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের হিসাবে দেখা গেছে, জরুরি ও বহির্বিভাগে ১৯ হাজার ৯০৪ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। জরুরি বিভাগে সার্জারি করতে হয়েছে ১ হাজার ১১২ জনের। নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৩০৫ জন। ছাড়প্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৩১০ জন। 

ফেব্রুয়ারি মাসে জরুরি ও বহির্বিভাগে ১৯ হাজার ৩০ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। মাসটিতে জরুরি বিভাগে সার্জারি করতে হয়েছে ৯৭৮ জনের। নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ২১৭ জন। ছাড়পত্রপ্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২০৪ জন।

মার্চ মাসে জরুরি ও বহির্বিভাগে ১৬ হাজার ৯৩১ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। জরুরি বিভাগে ৯৪০ জনের সার্জারি করা হয়েছে। নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ২২৩ জন। ছাড়পত্রপ্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৯৫ জন।

একই চিত্র এপ্রিল মাসেও। হাসপাতালটির চার মাসের তথ্য এবং রোগীদের প্রতিক্রিয়া সন্তোষজনক। কিন্তু শয্যা কম থাকায় সময় মতো ভর্তি করা যায় না। এক্ষেত্রে দীর্ঘ সিরিয়ালে পড়তে হয়।

বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ও অবগত। কারণ, জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউট এবং হাসপাতালে ২৫০ শয্যার অবকাঠামো আছে। কিন্তু চলমান ১৩৫ শয্যা। বাকি ১১৫ শয্যা চালু করার জন্য এরই মধ্যে শয্যা স্থাপন থেকে শুরু করে সব কাজ হয়ে গেছে। এখন শুধু অপেক্ষা অনুমোদনের। অতিরিক্ত লাগবে কিছু জনবল।

আরও পড়ুন
ঢামেক হাসপাতালে চালু হলো স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসা ‘থ্রম্বোলাইসিস’
১১ মাস ধরে বন্ধ উখিয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতাল, সেবাবঞ্চিত লাখো রোগী
চিকিৎসকদের নিরাপত্তায় ৫০০ হাসপাতালে মোতায়েন হচ্ছে আনসার
সরকারি হাসপাতালের দুঃখ জনবল খরা, আধুনিক যন্ত্রপাতি যেন ‘শো-পিস’

জানা গেছে, হাসপাতালটিতে এই মুহূর্তে অবেদনবিদ চিকিৎসকের ঘাটতি আছে। যে কারণে অস্ত্রোপচার কম হয়। ইকো ছাড়া সব ধরনের পরীক্ষা হয়। কিন্তু রেডিওলজিতে তিনজন চিকিৎসকের বিপরীতে আছেন মাত্র একজন। তাকেই সিটিস্ক্যান, এক্স-রে, এমআরআই এবং আল্ট্রা করতে হয়। হাসপাতালটিতে কার্ডিওলজিস্টের পদ নেই, তবে একজন থাকলে ভালো হয়।

এ বিষয়ে হাসপাতালটির পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তার দপ্তরে গিয়েও পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে দফায় দফায় কল ও খুদে বার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি তিনি।

হাসপাতালটির আবাসিক সার্জন (আরএস) ডা. সফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের যে পরিমাণ বেড আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভর্তি উপযোগী রোগী আসেন। এরই মধ্যে ১৩৫ থেকে ২৫০ শয্যা করার জন্য সব কাজ হয়ে গেছে। অবকাঠামো, বেড বিছানো শেষ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চালু করার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। তাদের অনুমোদন পেলেই ২৫০ শয্যার সেবা দেওয়া শুরু করবো। প্রয়োজন হবে আরও কিছু জনবল।’

এসইউজে/এমএমএআর/এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।