নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় লজ্জা নয়
নারীদের অধিকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা নিয়ে কথা বলার সময় এখন। সমাজে এখনও লজ্জা ও সামাজিক সংকোচের কারণে অনেক নারী প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে দূরে থাকেন। সচেতনতা ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া গেলে নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে কথাগুলো বলছিলেন জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের চিকিৎসক, চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সালাহ উদ্দিন জসিম।
জাগো নিউজ: নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নারীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের বর্তমান অবস্থা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি: বাংলাদেশে নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যে কিছু অগ্রগতি হলেও এখনও অনেক নারী নীরবে সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছেন। গ্রামাঞ্চলে সচেতনতার অভাব, লজ্জা ও সামাজিক সংকোচ অনেককে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে দূরে রাখে। শিক্ষা, সচেতনতা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রসার ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। প্রতিটি নারী যেন নিরাপদ মাতৃত্ব, সঠিক তথ্য ও সম্মানজনক স্বাস্থ্যসেবা পায়, এটা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। এই নারী দিবসে প্রতিজ্ঞা হোক, নারীর স্বাস্থ্যকে লজ্জা নয়, বরং অধিকার ও মর্যাদার বিষয় হিসেবে দেখার।
জাগো নিউজ: আমাদের সমাজে এখনও নারীর যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা কম, এর প্রধান কারণ কী বলে মনে করেন?
ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি: আমাদের সমাজে নারীর যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা কম হওয়ার প্রধান কারণ হলো দীর্ঘদিনের সামাজিক সংকোচ ও ট্যাবু। অনেকেই এখনও এ বিষয়কে লজ্জা বা নিষিদ্ধ আলোচনার বিষয় মনে করেন। ফলে অনেক নারী গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যাও নীরবে সহ্য করেন এবং সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হন। শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব এই নীরবতাকে আরও গভীর করে।
জাগো নিউজ: নারীরা সাধারণত কোন ধরনের যৌন বা প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে বেশি চিকিৎসকের কাছে আসেন?
ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি: বাংলাদেশে নারীরা সবচেয়ে বেশি চিকিৎসকের কাছে আসেন সাদা স্রাব, মাসিকের অনিয়ম, তলপেটের দীর্ঘদিনের ব্যথা ও বিভিন্ন সংক্রমণের সমস্যা নিয়ে। বিয়ের পর গর্ভধারণ, বন্ধ্যাত্ব বা গর্ভাবস্থার জটিলতা নিয়েও অনেক নারী চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে সচেতনতার অভাব ও ভুল ধারণা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাওয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের চিকিৎসক, চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি, ছবি: জাগো নিউজ
জাগো নিউজ: অনেক নারী লজ্জা বা সামাজিক সংকোচের কারণে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। এর ফলে কী ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি হতে পারে?
ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি: বাংলাদেশে অনেক নারী লজ্জা বা সামাজিক সংকোচের কারণে শরীরের সমস্যা দীর্ঘদিন গোপন রাখেন। ফলে ছোট একটি সমস্যা ধীরে ধীরে বড় রোগে রূপ নিতে পারে, যেমন সংক্রমণ, বন্ধ্যাত্ব বা জটিল প্রজনন সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে জরায়ু বা স্তনের রোগও দেরিতে ধরা পড়ে, যা চিকিৎসা কার্যক্রম কঠিন করে তোলে। লজ্জা নয়, সচেতনতাই একজন নারীর সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
জাগো নিউজ: কিশোরী মেয়েদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন?
ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি: কিশোরী মেয়েদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা গড়ে তুলতে পরিবারের উন্মুক্ত ও সহানুভূতিশীল আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানভিত্তিক ও সম্মানজনক এ বিষয়গুলো শেখালে নিজেদের শরীর ও নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। সচেতনতা বাড়ালে অল্প বয়সে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত, শারীরিক জটিলতা ও মানসিক চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
জাগো নিউজ: দাম্পত্য জীবনে সুস্থ ও সম্মানজনক যৌন সম্পর্ক বজায় রাখতে নারী-পুরুষের কী ধরনের সচেতনতা প্রয়োজন?
ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি: দাম্পত্য জীবনে সুস্থ যৌন সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, সম্মতি এবং খোলামেলা যোগাযোগ। উভয়েরই একে অপরের শারীরিক ও মানসিক অনুভূতি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। যৌন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও নিরাপদ সম্পর্ক সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। ভুল ধারণা, লজ্জা বা সামাজিক সংকোচ দূর করে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
জাগো নিউজ: গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের জন্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি: গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে সহজলভ্য, গোপনীয় ও সম্মানজনক যৌন এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা জরুরি। কিশোরী ও প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা সহজ ভাষায় পৌঁছে দিতে হবে। পরিবার ও সমাজে লজ্জা বা ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা উৎসাহিত করতে হবে।
জাগো নিউজ: আন্তর্জাতিক নারী দিবসে দেশের নারীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে আপনার বিশেষ বার্তা কী?
ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি: প্রতিটি নারী যেন নিরাপদ, বিজ্ঞানভিত্তিক যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে জানার ও পাওয়ার অধিকার পান। লজ্জা বা ভয় নয়, সচেতনতা ও সঠিক তথ্যই নারীর সুস্থ জীবন ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের পথ খুলে দেয়। মাসিক, গর্ভধারণ, পরিবার পরিকল্পনা বা যৌনস্বাস্থ্য, এসব বিষয়ে খোলামেলা ও সম্মানজনক আলোচনা প্রয়োজন।
এসইউজে/এসএনআর/এমএমএআর