দেশের একটি সরকারি হাসপাতালেও পেডিয়েট্রিক আইসিইউ নেই


প্রকাশিত: ০৩:৩০ পিএম, ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৫

দেশের কোনো সরকারি হাসপাতালে নেই পেডিয়েট্রিক আইসিইউ। মুমূর্ষু শিশুদের প্রাণ বাঁচাতে ও জরুরিভিত্তিতে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে পিআইসিইউতে চিকিৎসা অত্যাবশ্যক হলেও হাজার হাজার শিশু রোগী উপযুক্ত চিকিৎসা না পেয়ে ফেরত যাচ্ছে।

চার বছর বয়সী শিশু সাদমান কেসপারের মৃত্যুর পর জাগো নিউজের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে মুমূর্ষু শিশুদের জরুরি চিকিৎসার অপ্রতুলতার এই করুণ চিত্র।

বর্তমানে রাজধানীসহ সারাদেশে পাঁচশ ৯২টি সরকারি হাসপাতাল (মেডিকেল কলেজ, বিশেষায়িত হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স) পরিচালিত হচ্ছে। শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও এই হাসপাতালগুলোর একটিতেও পেডিয়েট্রিক আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) নেই!

শিশু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, এক থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগে  (গুইলেনভেরি সিন্ড্রোম, হৃদরোগ, কিডনি ফেইলিউর, অ্যানফেলাইটিস ও নিউমোনিয়া, সাপে কাটা ও পানিতে ডোবা ইত্যাদি) আক্রান্ত মুমূর্ষু শিশুদের তীব্র শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত জটিলতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে পিআইসিইউ বেডে রেখে সুচিকিৎসা দেয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সরকারি কোনো হাসপাতালে পিআইসিইউ না থাকায় যথাযথ চিকিৎসার (কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস প্রদান, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি) অভাবে শত শত শিশু রোগীর করুণ মৃত্যু হচ্ছে।

শিশু চিকিৎসকদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, দুধের সাধ ঘোলে মেটানোর মতো বেশিরভাগ সময় অাম্বুব্যাগের (হাত দিয়ে চেপে চেপে) মাধ্যমে শ্বাস প্রশ্বাস দেয়ার মাধ্যমে আইসিইউর বিকল্প চিকিৎসা দেয়া হয়।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বেসরকারি পর্যায়ে রাজধানীতে বেশ কিছু ফাইভ স্টার হোটেলখ্যাত বেসরকারি  প্রাইভেট হাসপাতালে (স্কয়ার, ইউনাইটেড,অ্যাপোলো, সেন্ট্রাল, ল্যাব এইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল)  সীমিত সংখ্যক পিআইসিইউ থাকলেও চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় অধিকাংশ অভিভাবকই তাদের  মুমূর্ষু শিশুদের সেখানে নিয়ে যেতে পারেন না।

এ সব হাসপাতালে পিআইসিইউতে রেখে চিকিৎসা করতে প্রতিদিনের খরচ কমপক্ষে ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা।  সঙ্গত কারণেই অসহায় বাবা-মায়েরা সরকারি হাসপাতালে সন্তানদের ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেখেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে ১৪ শয্যার পৃথক একটি পেডিয়েট্রিক আইসিইউ ইউনিট রয়েছে। অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় আইসিইউ বেড ভাড়া কম হলেও দামি ওষুধপত্র বাইরে থেকে কিনতে হয়।

ঢাকা  শিশু হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আইনাল হক জাগো নিউজকে জানান, বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যাদের তীব্র শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট থাকে তাদের পিআইসিইউ সাপোর্টে চিকিৎসা দেয়া হয়। প্রতিদিনের বেড ভাড়াসহ খরচ মাত্র সাড়ে তিনহাজার টাকা। তবে ওষুধপত্র বাইরে থেকে কিনতে হয়। প্রায় ৬শ’ শয্যার হাসপাতালে রোগীর তুলনায় ১৪টি পিআইসি সংখ্যা খুবই কম।

বেড ফাঁকা না থাকা অবস্থায় পিআইসি প্রয়োজন হলে শিশুকে কী করেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা অন্য হাসপাতালে রেফার করে দেই। যাদের টাকাপয়সা আছে তারা বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়। যাদের টাকা নেই তাদের কী হয় তা আমরা জানি না।

পিআইসিইউ’র অপ্রতুলতার বিষয়টি বছরের পর বছর ধরে চলে আসলেও সম্প্রতি শিশু কেসপারের মৃত্যুর পর সমস্যাটি আলোচনায় আসে। শিশুটির শরীর থেকে অনবরত রক্তপাত হতো।

চট্টগ্রামে এক দফা অস্ত্রোপচার হলেও রক্তক্ষরণের কারণ নির্ণয় হয়নি। বিএসএমএমইউ’র উপাচার্যের উদ্যোগেই উন্নত চিকিৎসার জন্য কেসপারকে চট্টগ্রাম থেকে বিএসএমএমইউতে নিয়ে আসা হয়।

শিশুটির চিকিৎসায় শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শফিকুল হককে প্রধান করে ৮ সদস্যের মেডিকেল বোর্ডও গঠন করা হয়। বিএসএমএমইউতে শিশু সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকরা সফল অস্ত্রোপচার করলেও এর পরবর্তী সময়ে তীব্র শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা দেখা দিলে পেডিয়েট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু বিএসএমএমইউতে পিআইসিইউ না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেয়া সম্ভব হয়নি। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিলম্বে তাকে সেন্ট্রাল হাসপাতালের পিআইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কেসপারের মৃত্যু হয়।

শিশুটির মৃত্যুতে দুঃখপ্রকাশ করে বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান জানান, বিএসএমএমইউতে নবজাতক (শূন্য থেকে ২৮ দিন বয়সী) ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৬৮টি আইসিইউ বেড থাকলেও একটিও আইসিইউ নেই। কেসপারের মৃত্যুর পর বিষয়টি সম্পর্কে জেনেছেন।

আগামী কিছুদিনের মধ্যে পৃথকভাবে অন্ততপক্ষে ১/২টি পিআইসিইউ স্থাপন করবেন বলে জানান তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগের চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার জানা মতে সরকারি কোনো হাসপাতালেই পিআইসিইউ নেই। যদিও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা করতে গিয়ে তারা এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

শিশু হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৪ শয্যার যে পিআইসি স্থাপন করতে মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইসিইউর একজন দায়িত্বশীল চিকিৎসক জাগো নিউজকে জানান, মূলত ভেন্টিলেটর মেশিন কিনতেই (প্রতিটি ১২-১৫ লাখ টাকা) বেশী টাকা খরচ হয়।

এ ছাড়া অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের মেশিন (কার্ডিয়াক মনিটর, ইসিজি মেশিন, অটোমেটেড নন ইনভেসিভ ব্লাড প্রেসার অ্যাপারেটাস, ইনকিউবেটর, পালস অক্সিমিটার, ট্রাকেসটমি ট্রে, ইনট্রাকানিয়াল প্রেসার মনিটরিং ট্রে, সার্জিক্যাল কাটডাউন ট্রে, পেরিটনিয়াল ডায়ালাইসিস ইক্যুপমেন্ট, ব্লাড ওয়ার্মিং অ্যাপরেটাস,ইলেকট্রিক ব্রেস্ট পাম্প, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটার, কন্ট্রিনিউয়াস অক্সিজেন অ্যানালাইজার, হার্ট রেট উইথ ডাইসথারমিয়া মনিটরিংঅ্যাভিলিটি, রেসপিরেশন, টেম্পারেচার  ইত্যাদি) ক্রয়ে অন্যান্য খরচ হয়।

জাতীয় অধ্যাপক ডা. এমআর খান বলেন, এক মাস থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য পিআইসিইউ স্থাপনা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এটি স্থাপনের সাথে আর্থিক সঙ্গতি ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে পিআইসিইউ স্থাপনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের উদ্যোগ গ্রহণ করে হাসপাতাল পরিচালকের মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের পিআইসিইউ স্থাপনের উপযোগিতা, অবকাঠামো নির্মাণসহ অন্যান্য খরচের বাজেট ইত্যাদি সম্পর্কে ভালভাবে বুঝাতে হবে। তাছাড়া এটি পরিচালনার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্টও তৈরি করতে হবে।

তিনি জানান, আমাদের দেশে নবজাতকের (শূন্য থেকে ২৮ দিন বয়সী) মৃত্যুহার বেশী। অগ্রাধিকার বিবেচনায় হয়তো সরকার নিওনেটাল আইসিইউ স্থাপনে অধিক নজর দিচ্ছে। তবে শিশু সে বড় বা ছোট যাই হউক না কেন শিশুর অকাল মৃত্যু কাম্য নয়। তবে পিআইসিইউ পরিচালনার সাথে বড় ধরনের খরচ জড়িত বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুসারে সর্বশেষ জনসংখ্যা জরীপ অনুসারে দেশে মোট আনুমানিক জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৬২ লাখ ৮০ হাজার ৭১২জন। তন্মধ্যে শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৫ কোটি ৩৭ লাখ ৩৭ হাজার ৪৪৩ জন। তাদের মধ্যে পুুরুষ শিশু ২ কোটি ৭২ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬০ ও মেয়ে শিশুর সংখ্যা ২ কোটি ৬৪ লাখ  ৬৮ হাজার ৮৮৩ জন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানান,  দেশে প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. রুহুল হকের আমলে প্রত্যেক উপজেলা হাসপাতালের জন্য একটি করে আইসিইউ স্থাপনের জন্য মেশিন কেনা হয়। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ না করেই ঠিকাদারদের চাপের মুখে এ সব জীবনরক্ষাকারী মেশিন কেনা হয়। বার বার তাগাদা দেয়ার পরও অবকাঠামো না থাকায় বহু উপজেলা হাসপাতাল সে সব আইসিইউ বেড ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সরবরাহ নিচ্ছেন না। অথচ এক থেকে ১২ বছর বয়সী লাখ লাখ শিশুর জন্য পৃথক পিআইসিইউ গড়ে তোলা হচ্ছে না। যা খুবই দুঃখজনক বলে বর্ণনা করেন ওই কর্মকর্তা।

# পিআইসিইউ চিকিৎসার নামে শিশুদের গিনিপিগ বানানো হচ্ছে!
# পিআইসিইউ সংকটে জিবিএস আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু-পঙ্গুত্ব বাড়ছে
# মানহীন আইসিইউ এখন মরণফাঁদ

এমইউ/একে/এএইচ/আরআইপি

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]