ইরান

একসময়ে খামেনির অনুগত ব্যবসায়ীরা কেন বিক্ষোভে নামলেন?

সাজিদ হাসান
সাজিদ হাসান সাজিদ হাসান , সহ -সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৩:৩০ পিএম, ১১ জানুয়ারি ২০২৬
অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রার মান পতনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখানোর সময় সময় তেহরানের একটি সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা/ ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে তোলা ছবি/ এএফপি

ইরানে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। রাজধানী তেহরানের পাশাপাশি দেশটির বিভিন্ন শহরে নতুন করে বিক্ষোভের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এবারের এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছে মূলত ব্যবসায়ী ও দোকানিদের মাধ্যমেই, যারা খামেনিরই সমর্থক ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, কেন একসময়ে খামেনির অনুগত ব্যবসায়ীরা এখন বিক্ষোভে নামলেন। আসুন, উত্তরটা জানার চেষ্টা করি...

ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরুর পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে কথা বলেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) তিনি বিক্ষোভকারীদের নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে ‘বাজারের বৈধ দাবি’ ও সারা দেশে চলমান ‘বিদ্রোহ’ এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টানার চেষ্টা করেন।

খামেনির ভাষায়, আমরা প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে কথা বলি; কর্মকর্তাদেরও তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। কিন্তু দাঙ্গাবাজদের সঙ্গে কথা বলে কোনো লাভ নেই। দাঙ্গাবাজদের তাদের জায়গা বুঝিয়ে দিতে হবে।

এই বিভাজন ছিল সচেতন ও কৌশলগত। খামেনি তার বক্তব্যে ইরানের বাজার ও ব্যবসায়ীদের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ‘সবচেয়ে অনুগত অংশগুলোর একটি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রের শত্রুরা বাজারকে ব্যবহার করে পুরো শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে পারবে না।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তার এই বক্তব্যকে আড়াল করতে পারেনি। তেহরানের ঐতিহ্যবাহী বাজারে এখনো বিক্ষোভ চলছে। সরকার বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করছে। বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে, এমনকি সর্বোচ্চ নেতাকে লক্ষ্য করেও স্লোগান উঠছে। ফলে বাজারকে সামগ্রিক অস্থিরতা থেকে আলাদা দেখানোর রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা বাস্তবে ব্যর্থ হচ্ছে এবং সরকারের বয়ান নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

খামেনির বক্তব্যের পেছনে ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে বাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, যার ফলে মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির পতন ঘটে। বিপ্লব-পরবর্তী কয়েক দশক ধরে বাজার রক্ষণশীল রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। কিন্তু এই ঐতিহাসিক আনুগত্য আর রাজনৈতিক নীরবতার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।

গত দুই দশকে বাজারের অর্থনৈতিক অবস্থান ক্রমাগত দুর্বল হয়েছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ও বড় বড় ধর্মীয়-বিপ্লবী ফাউন্ডেশনের (বোনিয়াদ) প্রতি রাষ্ট্রীয় পক্ষপাত, নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে বাজার, অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা আগের শক্তি হারিয়েছে। একসময় যে বাজার ছিল শাসকগোষ্ঠীর শক্ত ভিত, আজ সেটি আজ ব্যবস্থাগত অচলাবস্থার শিকার।

ক্ষমতা থেকে প্রান্তিককরণ

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর শক্তিশালী বাজার ব্যবসায়ীরা, যারা সাধারণত বাজার-সংযুক্ত ইসলামিক কোয়ালিশন পার্টির মাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন, তারা নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরেই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয় এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয়ে প্রভাব বিস্তার করেন। এই রাজনৈতিক প্রভাব তাদের আর্থিক সুবিধায় রূপ নেয়।

বিপ্লব-পরবর্তী শাসনে অনেক প্রভাবশালী নেতা পূর্ণ জাতীয়করণের পক্ষে থাকলেও, ১৯৮০-এর দশকজুড়ে ইরানের বাণিজ্যে বাজারের প্রভাব বজায় থাকে। বাজার ব্যবসায়ীরা আমদানি লাইসেন্স পান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সবচেয়ে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন ও সরকারি বিনিময় হারের সুবিধা পান, যা বাজারদরের তুলনায় অনেক কম ছিল। এসব পণ্য পরে বাজারদরে বিক্রি করে তারা বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জন করতেন।

১৯৯০-এর দশকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র যখন অর্থনৈতিক উদারীকরণের পথে হাঁটে, তখন বাজারঘেঁষা রাজনৈতিক শক্তি, যাদের ‘প্রচলিত ডানপন্থি’ বলা হয়, তারা প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানিকে সমর্থন দেয়। এই জোট ইসলামপন্থি বামদের মন্ত্রিসভা ও পার্লামেন্ট (মাজলিস) থেকে সরিয়ে দিতে সহায়তা করে। যদিও রাফসানজানির কিছু সংস্কার বাজারের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় ও পরে ‘নতুন ডানপন্থি’ গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে, তবু বাজার ও তার মিত্ররা রাষ্ট্রের ভেতরে বড় ধরনের প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

রাফসানজানির উত্তরসূরি প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির সংস্কার কর্মসূচিও বাজারের অর্থনৈতিক অবস্থান বা রাজনৈতিক ক্ষমতাকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ করেনি। গার্ডিয়ান কাউন্সিল, বিশেষজ্ঞ পরিষদ ও বিচার বিভাগ তখনও ‘প্রচলিত ডানপন্থিদের’ নিয়ন্ত্রণে ছিল, যা বাজারকে বড় ধরনের চাপ থেকে সুরক্ষা দেয়।

২০০৫ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতাকে বাজার বিপুলভাবে সমর্থন করলেও, তার সরকারের অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতিই শেষ পর্যন্ত বাজারের শক্তি ক্ষয়ের গতি বাড়িয়ে দেয়।

আহমাদিনেজাদের শাসনামলে ‘বেসরকারিকরণ’ কার্যত রাষ্ট্রীয় সম্পদ আইআরজিসি ও বোনিয়াদ-সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তরের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদের নতুন ব্যাখ্যার মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে ‘সরকারি নয়, জনস্বার্থমূলক সংস্থা’ হিসেবে পুনরায় শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।

সর্বোচ্চ নেতার সমর্থন এবং সামরিক ও নিরাপত্তা খাতের সাবেক আইআরজিসি সদস্যে পূর্ণ একটি মন্ত্রিসভার কারণে সম্পদ পুনর্বণ্টনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। এর ফলে ইরানের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। আইআরজিসি অবকাঠামো, পেট্রোকেমিক্যাল, ব্যাংকিংসহ নানা খাতে আধিপত্য বিস্তার করে। মোস্তাজাফান ফাউন্ডেশন, ইমাম রেজা দরগাহ ফাউন্ডেশন ও সেটাদসহ বড় বোনিয়াদগুলোও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে বিশাল করপোরেট সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। এই সামরিক ও বিপ্লবী ফাউন্ডেশনগুলোর জোট থেকেই গড়ে ওঠে রাষ্ট্রের ভেতরের নতুন শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্লক- প্রিন্সিপালিস্টরা (ইরানের রক্ষণশীল রাজনৈতিক ধারা)।

বাজারের অসন্তোষ

এই শক্তি কেন্দ্রীকরণের মূল্য দিতে হয় বাজারকে ও তাদের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক মিত্রদের। আহমাদিনেজাদ সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে হতাশ হয়ে বাজার ব্যবসায়ীরা ২০০৮ সালে বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য ধর্মঘটে নামে। বিভিন্ন শহরে তারা কাজ বন্ধ করে প্রতিবাদ জানায়।

পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। আহমাদিনেজাদের কঠোর পারমাণবিক নীতির কারণে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়তে থাকে। ২০১২ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিষেধাজ্ঞা ইরানের তেল ও ব্যাংকিং খাতকে প্রায় অচল করে দেয় ও দেশটিকে সুইফট ব্যবস্থার (আর্থিক লেনদেনের ব্যাপারে বার্তা আদান-প্রদানকারী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক) বাইরে ঠেলে দেয়।

রাষ্ট্র তখন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বিকল্প পথ তৈরি করে। প্রতিবেশী দেশগুলোর মাধ্যমে চোরাচালানসহ নানা উপায়ে পণ্য আমদানি করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় আইআরজিসি মুখ্য ভূমিকা পালন করে, নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে পণ্য আনে। সময়ের সঙ্গে এই নিষেধাজ্ঞা-নির্ভর অর্থনীতি আইআরজিসি ও বোনিয়াদগুলোর আধিপত্য আরও পোক্ত করে এবং বাজারকে আরও প্রান্তিক করে তোলে।

রাজনৈতিক দিক থেকেও এর ফল ছিল গুরুতর। প্রিন্সিপালিস্টরা (রক্ষণশীল) রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় ও ‘প্রচলিত ডানপন্থিরা’ ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ছিটকে পড়ে। বাজারের আনুগত্যের বিনিময়ে প্রভাব ও প্রবেশাধিকার দেওয়ার যে দীর্ঘদিনের সমঝোতা ছিল, তা ভেঙে পড়ে।

শাসনব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ

চলমান বাজার বিক্ষোভ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বহু বছরের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরের সতর্ক সংকেত। এই পরিবর্তন এমনকি, রাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত ভিত্তিকেও ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে শাসকগোষ্ঠী বাজারকে স্থিতিশীলতার রক্ষাকবচ ও সংকটকালে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার নিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক আনুগত্যের ভরসা হিসেবে দেখেছে। কিন্তু আজ বিক্ষোভের সূচনা ও কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে সেই বাজারই। খামেনির বক্তব্য তাই আত্মবিশ্বাস নয়, বরং উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ। বাজারের প্রকাশ্য অমান্যতা দেখাচ্ছে যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চ্যালেঞ্জ আর সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়।

তাত্ত্বিকভাবে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে ও আইআরজিসি-সংযুক্ত করপোরেট শক্তির লাগাম টেনে সরকার চাইলে বাজারকে আবার কাছে টানতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। পারমাণবিক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা ক্ষীণ। অন্যদিকে, আইআরজিসি ও বোনিয়াদগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কমানো শাসনব্যবস্থার জন্য আকর্ষণীয়ও নয়, বাস্তবসম্মতও নয়।

এই সীমাবদ্ধতার মুখে রাষ্ট্রের হাতে কার্যত একটিই পথ খোলা- দমননীতি। কিন্তু সেই পথ বেছে নিলে শাসনব্যবস্থা আরও দূরে ঠেলে দেবে সেই ঐতিহ্যগত শক্তিকে, যাদের ওপর একসময় স্থিতিশীলতা ও আনুগত্যের জন্য সবচেয়ে বেশি ভরসা করা হয়েছিল।

সূত্র: আল-জাজিরা

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।