যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্রসহ ভারত-ফ্রান্সের যেসব চুক্তি হলো
ভারত আর ফ্রান্স তাদের সম্পর্ককে ‘বিশেষ বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ উন্নীত করেছে। মঙ্গলবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে মুম্বাইতে এক দীর্ঘ বৈঠকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গেই দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা আরও জোরালো করার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
সেখান থেকেই ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হেলিকপ্টার নির্মাণ কারখানার উদ্বোধন করা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ম্যাক্রোঁর সফর চলাকালীন দুই দেশের মধ্যে ‘হ্যামার’ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণসহ সামরিক ও বেসামরিক ক্ষেত্রে ২০টিরও বেশি চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে।
পৃথকভাবে ১১৪টি রাফায়েল যুদ্ধবিমান কেনা নিয়েও চুক্তি হয়েছে। তিনদিনের সরকারি সফরে সোমবার রাতে মুম্বাইতে সস্ত্রীক এসে পৌঁছেছেন ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। বুধ এবং বৃহস্পতিবার তিনি দিল্লিতে নানা কর্মসূচিতে অংশ নেবেন, যার মধ্যে অন্যতম হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করা।
যৌথ বিবৃতিতে যা বললেন দুই শীর্ষ নেতা
মুম্বাইয়ের রাজ্যপাল আবাস ‘লোকভবন’-এ দীর্ঘ বৈঠকের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে মোদী বলেন, ফ্রান্স ভারতের প্রাচীনতম কৌশলগত অংশীদারদের অন্যতম। ম্যাক্রোঁর শাসনামলে এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।
মোদী বলেন, এই ভরসা আর দুরদৃষ্টির ওপর ভিত্তি করে আমাদের সম্পর্ককে এখন বিশেষ বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করছি। এই সহযোগিতা শুধুমাত্র কৌশলগত নয়। গতিশীল বিশ্বের বর্তমান যুগে এই অংশীদারীত্ব বৈশ্বিক স্থায়িত্ব ও অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৬ সাল ভারত আর ইউরোপের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মোড় ঘোরানোর বছর। কিছুদিন আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের এক ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, গত আট বছরে ভারত আর ফ্রান্স বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে এসেছে। এখন এই সহযোগিতাকে আমরা বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করতে পেরে আনন্দিত।
সামরিক ক্ষেত্র ছাড়াও মহাকাশ গবেষণার মতো অন্য আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে ভারত আর ফ্রান্স হাত মেলাতে পারে।
এইচ-১২৫ হেলিকপ্টার কারখানা
মুম্বাইয়ের ওই সংবাদ সম্মেলনেই নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেন যে, ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এমন এক হেলিকপ্টার তৈরি হবে ভারতে, যা বিশ্বের একমাত্র হেলিকপ্টার হবে যেটি মাউন্ট এভারেস্টের শিখরের উচ্চতাতেও উড়তে পারবে।
এইচ-১২৫ নামের হেলিকপ্টার কারখানার উদ্বোধন করেছেন শীর্ষ দুই নেতা। এয়ারবাস এবং টাটা গোষ্ঠী যৌথ উদ্যোগে কর্ণাটকের ভিমাগালে এই কারখানা গড়ে তুলেছে।
এই কারখানা মূলত একটি ‘অ্যাসেম্বলি লাইন’ অর্থাৎ হেলিকপ্টারের বিভিন্ন অংশ যুক্ত করে এখানে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হবে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, এই কারখানায় প্রায় এক হাজার কোটি ভারতীয় টাকা বিনিয়োগ করা হবে এবং ভারতীয়দের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বড়ো সংখ্যায় চাকরির সুযোগ তৈরি করবে।
ভারতের কারখানা থেকে এই হেলিকপ্টার সারা বিশ্বে রফতানি করা হবে বলে জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। এই কারখানা ভারতের প্রথম বেসরকারি হেলিকপ্টার নির্মাণ কারখানা।
মোদীর প্রিয় প্রকল্প – মেক ইন ইন্ডিয়ার অন্তর্গত এইচ-১২৫ হেলিকপ্টার কারখানা একদিকে যেমন ভারতের সামরিক বাহিনীগুলোর জন্য ওজনে হাল্কা এবং নানা কাজে ব্যবহার করা যাবে-এরকম একটি হেলিকপ্টারের চাহিদা মেটাবে, তেমনই আবার এরকম হেলিকপ্টারের জন্য বেসরকারি ক্ষেত্রের বাজারও খুলে যাবে।
এটাই একমাত্র হেলিকপ্টার যেটা মাউন্ট এভারেস্টে নামতে পেরেছে। বিশেষ করে হিমালয়ের সুউচ্চ পর্বত অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর কাছে খুবই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে এই হেলিকপ্টারকে। আগামী দুবছরের মধ্যে ভারতে তৈরি প্রথম এইচ১২৫ হেলিকপ্টার বাজারে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
‘হ্যামার’ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণের চুক্তি
নরেন্দ্র মোদী ও এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বৈঠক ছাড়া দুই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের মধ্যে মঙ্গলবার সামরিক সহযোগিতা সংক্রান্ত বৈঠক হয়েছে বেঙ্গালুরুতে। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সামরিক সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তির মেয়াদ আরও দশ বছর বাড়ানো হয়েছে ওই বৈঠকে।
তবে এই বৈঠকটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে যৌথ উদ্যোগে ‘হ্যামার’ ক্ষেপণাস্ত্র ভারতেই নির্মাণ করার বিষয়টি।আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপের এই ‘হ্যামার’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের অতি গুরুত্বপূর্ণ কোনো লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত ভাবে হামলা চালাতে সক্ষম। সেই লক্ষ্যবস্তুটি যদি কংক্রিটের মোটা চাদরে মুড়ে রাখা থাকে বা ব্যাপক নিরাপত্তার মধ্যে থাকে তাতেও এই ‘হ্যামার’ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করতে পারে।
পার্বত্য এলাকা সহ দুর্গম অঞ্চলে এই ক্ষেপণাস্ত্র খুবই কার্যকর। রাফায়েল যুদ্ধবিমান এবং ভারতে নির্মিত তেজসে এই ক্ষেপণাস্ত্র সংযুক্ত করা যায়।
এর আগে ২০২০ সালে চীনের সঙ্গে যখন গালওয়ানে ভারতীয় বাহিনীর উত্তেজনা চরমে উঠেছিল, তখন জরুরি ভিত্তিতে এই ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছিল ভারত। অপারেশন সিন্দুরে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল ভারত।
ভারত ইলেক্ট্রনিক্স লিমিটেড আর ফ্রান্সের সাফরান ইলেক্ট্রনিক্স অ্যান্ড ডিফেন্স-এই দুটি সংস্থা হ্যামার তৈরির জন্য একটি পৃথক যৌথ উদ্যোগের সংস্থা এরই মধ্যে গড়ে তুলেছে। দুটি সংস্থার আধা-আধি শেয়ার থাকবে সদ্য গঠিত সংস্থাটিতে।
রাফায়েল যুদ্ধবিমান
ফরাসি প্রেসিডেন্টের সফরের ঠিক আগেই গত সপ্তাহে ভারত ১১৪টি রাফায়েল যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্তে সবুজ সংকেত দিয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ‘ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল’ ৩৬ লাখ কোটি ভারতীয় টাকা মূল্যের এই ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সাম্প্রতিককালে এটাই ভারতের সবচেয়ে বড়ো যুদ্ধাস্ত্র ক্রয়। ভারতের বিমান বাহিনীতে যুদ্ধবিমানের স্কোয়াড্রনের ঘাটতি আছে। দীর্ঘ সময় ধরে যে মিগ-২১ এর ওপর বিমান বাহিনী অনেকটাই ভরসা করে এসেছে। কিন্তু গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে সেগুলোকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে জাগুয়ার এবং মিরাজ ২০০০ বিমানগুলোকেও বসিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কয়েক দশক ধরেই বিদেশ থেকে যুদ্ধবিমান কিনছে ভারত। তবে সম্প্রতি যুদ্ধবিমানসহ নানা সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম দেশেই বানানোর পরিকল্পনার ওপরে জোর দিচ্ছে দেশটির সরকার। এই প্রেক্ষিতেই ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্স থেকে সরাসরি ১৮টি বিমান আনবে ভারত আর বাকি ৯০টিরও বেশি রাফায়েল বিমান ভারতেই তৈরি করা হবে বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
টিটিএন