ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’
ভারত পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দিলেও সদস্যপদে অনীহা কেনো?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানে ওয়াশিংটনে গাজা ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) প্রায় ৫০টি দেশের প্রতিনিধির সঙ্গে পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নিয়েছে ভারত। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্যপদ গ্রহণ থেকে এখনো বিরত রয়েছে নয়াদিল্লি। কেন এই সতর্ক অবস্থান-তা নিয়েই চলছে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা।
‘বোর্ড অব পিস’ কী?
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে গাজায় যুদ্ধবিরতি ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে এই বোর্ড গঠিত হয়। ট্রাম্প নিজেকে এই বোর্ডের আজীবন চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন। প্রথম বৈঠকে তিনি গাজার পুনর্গঠনে ১০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। পাশাপাশি অন্যান্য দেশ মিলিয়ে প্রায় ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই বোর্ড ভবিষ্যতে জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবেও ভূমিকা নিতে পারে—যা ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি মিত্র দেশের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ভারত কী বলেছে?
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, ভারত ১৯ ফেব্রুয়ারির বৈঠকে পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নিয়েছে এবং গাজা শান্তি উদ্যোগকে সমর্থন করে। তবে সদস্যপদ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
চলতি বছর জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প চিঠি দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বোর্ডে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু গ্লোবাল কনফ্লিক্ট সমাধানে নতুন সাহসী পদক্ষেপ—এই প্রস্তাব নিয়েই ভারতের সংশয় রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
কেন সতর্ক ভারত?
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের অনীহার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে-
কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন:
ভারত দীর্ঘদিন ধরে ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা কৌশলগত স্বনির্ভরতার নীতি অনুসরণ করে। জাতিসংঘকেন্দ্রিক বহুপাক্ষিক কাঠামোর বাইরে ব্যক্তিনির্ভর নতুন প্ল্যাটফর্মে যোগ দিলে সেই অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে টানাপড়েন:
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের শুল্কনীতি, ভারত-পাকিস্তান সংঘাত নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য, এবং রুশ তেল কেনা বন্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ-এসব ইস্যু নয়াদিল্লির অস্বস্তি বাড়িয়েছে। সম্প্রতি দুই দেশের অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি হলেও ভারতের ওপর শুল্ক আরোপ গড়ে ১৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে যা ভারতের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
বোর্ডের কাঠামো ও ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন:
বোর্ডে ১ বিলিয়ন ডলার অনুদান দিলে আজীবন সদস্যপদ—এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান হিসেবে ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা ও সদস্য আমন্ত্রণের একক অধিকার থাকায় সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হবার আশঙ্কা রয়েছে।
‘মিশন ক্রিপ’ আশঙ্কা:
গাজা পুনর্গঠন দিয়ে শুরু হলেও বোর্ডের ম্যান্ডেট ভবিষ্যতে অন্য সংঘাত অঞ্চলে সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে কাশ্মীরের মতো সংবেদনশীল ইস্যু আন্তর্জাতিকীকরণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে যা ভারত এড়িয়ে চলতে চায়।
কৌশল বিশ্লেষক ব্রহ্মা চেল্লানির মতে, এই বোর্ডে যোগ দিলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অগ্রাধিকার মেনে নেওয়ার বার্তা যেতে পারে। সাবেক পররাষ্ট্রসচিব নিরুপমা মেনন রাও বলেছেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক উদ্যোগের বদলে বহুপাক্ষিক বৈধতাসম্পন্ন কাঠামোই ভারতের মত মধ্যম সারির শক্তিগুলোর জন্য নিরাপদ।
সাবেক কূটনীতিক কানওয়াল সিবাল সতর্ক করে বলেন, বোর্ডটি ট্রাম্পকেন্দ্রিক হয়ে উঠলে অন্য সদস্যদের সিদ্ধান্তের প্রভাব কমে যেতে পারে।
ভারত গাজায় যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠনের পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তবে বোর্ডের চূড়ান্ত কাঠামো, বৈধতা ও ম্যান্ডেট স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত এই সদস্যপদে যোগ না দিয়ে ভারত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নয়াদিল্লির এই সতর্ক অবস্থান তার দীর্ঘদিনের জোটবিহীন ও স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: দ্য স্টেটসম্যান
কেএম