ভারত-পাকিস্তানের সামরিক কৌশল যেভাবে বদলে দিচ্ছে ড্রোন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৪৩ পিএম, ১৮ মে ২০২৬
ভারতের একটি সামরিক ড্রোন/ ফাইল ছবি: পিটিআই

এক বছর আগে পাকিস্তানের কিছু স্থাপনায় হামলা চালায় ভারতীয় সামরিক বাহিনী। ভারতের দাবি অনুযায়ী যেগুলো ছিল—‘সন্ত্রাসবাদীদের শিবির’।

ভারতশাসিত কাশ্মীরের পাহেলগামে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল বন্দুকধারীদের গুলিতে ২৬ জন পর্যটক ও স্থানীয় একজন ব্যক্তি নিহত হন। তারপরেই ওই সামরিক অভিযান চালায় ভারত, যার সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সিঁদুর’।

ভারত অভিযোগ করেছিল, ‘পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোই’ পাহেলগাম হামলার জন্য দায়ী। তবে পাকিস্তান ওই ঘটনার দায় অস্বীকার করে।

এরপর উপমহাদেশের দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ১০ মে যে সামরিক সংঘাত হয়, তা বলতে গেলে যুদ্ধকৌশলের একটি নতুন দিক খুলে দেয়। বলা যেতে পারে, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সেটিই ছিল প্রথম ড্রোন যুদ্ধ।

আরও পড়ুন>>
ইরানের ড্রোন যেভাবে বিশ্বে ক্ষমতার ধারণা বদলে দিয়েছে
হিজবুল্লাহর সস্তা ‘এফপিভি সুইসাইড ড্রোন’ হামলায় ধরাশায়ী ইসরায়েল
বেইজিংয়ে ড্রোন বিক্রিতে কেন নিষেধাজ্ঞা দিলো চীন?

সামরিক পরিভাষায় যুক্ত হয় একাধিক নতুন শব্দ—‘ইহা’, ‘হারোপ’ এবং ‘সংগার’। দুই দেশই এই ধরনের আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেম ব্যবহার করে।

এ ধরনের সিস্টেম কয়েক দশক ধরেই ব্যবহার হচ্ছে। মার্কিন প্রিডেটর ড্রোন আগেও আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইয়েমেনে বেশ কিছু হামলা চালিয়েছে; কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে আগের সেই আধিপত্য এখন আর কোনো একটি দেশের একচেটিয়া নয়।

ড্রোন প্রযুক্তি উচ্চ গতি, কম খরচ ও সহজলভ্যতার কারণে আধুনিক যুদ্ধের ধারাকে আমূল বদলে দিয়েছে। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পর্যন্ত—ড্রোনকেন্দ্রিক যুদ্ধই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।

এক বছর আগে, পাকিস্তানের রাডার ধ্বংস করার জন্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গেই হামলা চালাতে সক্ষম—এমন ড্রোন ব্যবহার করেছিল ভারত। ওই ধরনের ড্রোনগুলোকে ‘লয়টারিং মিউনিশন’ বলা হয়।

পাকিস্তানও সেই সময় ভারতীয় স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ‘সোয়ার্ম ড্রোন’ বা গুচ্ছ-ড্রোন ব্যবহার করেছিল।

এক বছর পরেও, সেই চারদিনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে দুই দেশের সামরিক মহল।

‘আকাশে নজর’

ড্রোন যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলো স্বীকার করছেন ভারতের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনী অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে গোটা দেশের জন্য ড্রোন-প্রতিরোধী নীতি প্রণয়নের কাজ করছে।

তবে, ভারতীয় সামরিক শীর্ষ কর্তারা আরও বলছেন, ড্রোন ব্যবহারের এই ঝোঁক ২০২৫ সালের মে মাসের অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ৩ হাজার ৩২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে ১ হাজার ৮১৬টি ড্রোন দেখা গেছে।

ভারতের সীমান্তরক্ষা বাহিনী বিএসএফের মতে, পাকিস্তান থেকে ভারতে মাদক, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের জন্য ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছিল।

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাও ২০২৩ সালে বলেছিলেন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ড্রোন দিয়ে পাচারকারীরা হেরোইন পাঠাচ্ছে।

জম্মুতে ২০২১ সালের জুন মাসে, ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটিতে দুটি বিস্ফোরণ ঘটে। পুলিশ পরে জানায়, ওই হামলায় ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল। হামলার লক্ষ্য ছিল বিমানবাহিনীর বিমানগুলো। তবে কোনোরকম ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি ওই সময়।

এ ঘটনার পর থেকে সামরিক স্থাপনাগুলোর চারপাশের নিরাপত্তা এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়।

ইসলামাবাদে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সৈয়দ মুহাম্মদ আলী বলেছেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও তালেবানের ড্রোনের কারণে পাকিস্তানকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

২০২৫ সাল পর্যন্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা এবং হামলা চালানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ড্রোনের।

গত কয়েক বছর ধরে সংঘাতের কারণে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত রক্ষা এবং আকাশসীমা সুরক্ষিত করায় জোর দিয়েছে ভারত। তেমনি ২০২৪ সাল থেকে পাকিস্তানও ভারত, আফগানিস্তান ও ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে।

এজন্যই ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে অস্ত্রসহ ড্রোন যেমন আছে, তেমনই রয়েছে বিনা-অস্ত্রের ড্রোনও।

নতুন চ্যালেঞ্জ, নয়া প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

ভারতীয় বিমানবাহিনীর ডিরেক্টর জেনারেল—এয়ার অপারেশনস, এয়ার মার্শাল একে ভারতী সম্প্রতি জানিয়েছেন, কীভাবে পাকিস্তানের অনবরত ড্রোন অভিযান ভারতকে বাধ্য করেছিল পাল্টা অভিযান চালাতে।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আগে আমরা শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার বা ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে নজর রাখতাম। পাশাপাশি এখন আমাদের সব আকার ও আকৃতির এবং বিভিন্ন উচ্চতায় থাকা ড্রোনও শনাক্ত করতে হচ্ছে।

আর এর প্রভাব শুধু সংঘাতেরই সীমাবদ্ধ নয়।

‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযানের ক্ষেত্রে ড্রোন কীভাবে ধীরে ধীরে প্রচলিত বিমান হামলার জায়গা নিচ্ছে তা পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কথিত ‘সন্ত্রাসবাদীদের’ বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযানে থাকা একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, ড্রোন-ভিত্তিক অভিযানগুলো বেশি কার্যকর, কারণ ড্রোন হামলায় পারিপার্শ্বিক ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হয়।

প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ডিআরডিওর সাবেক চেয়ারম্যান ড. জি সতীশ রেড্ডি জানান, ভারত কীভাবে তাদের সমন্বিত ব্যবস্থা ‘কাইনেটিক ইন্টারসেপ্টর, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার জ্যামার’ এবং ‘লেগ্যাসি’ নামে আকাশ প্রতিরক্ষা কামান মোতায়েন করে সফলভাবে বড় ধরনের হামলা প্রতিহত করেছে।

যদিও তাদের মতে খরচ একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, শত্রুর ছোড়া সস্তা ড্রোন ধ্বংস করার জন্য দামি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা যায় না। তাই খরচের কথা মাথায় রেখেই সমাধান খুঁজতে হয়।

তবে এয়ার মার্শাল একে ভারতীও যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু স্বল্পমূল্যের ড্রোনের প্রভাবকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

‘আমাদের বিপুল সংখ্যক ড্রোন প্রয়োজন। স্বল্পমূল্যের ড্রোন বড়জোর শত্রুকে ক্রমাগত হয়রানি করতে পারে, কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য সেগুলোতে লক্ষ্যবস্তু সম্পূর্ণ ধ্বংস করার ক্ষমতা থাকতে হবে।’

‘ব্রহ্মোস’ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্রের দ্বারাই তা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

জয়পুরের এক সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে একথা জানান ভারতী। তিনি আরও বলেন, এজন্যই ড্রোনের সঙ্গেই এ ধরনের উন্নত প্রযুক্তিরও প্রয়োজন আছে।

পাকিস্তানও বলছে, তারা সংঘর্ষের সময়ে ড্রোনের বড়সড় হামলা নিষ্ক্রিয় করেছে।

ইসলামাবাদ-ভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক সৈয়দ মুহাম্মদ আলী বলেছেন, পাকিস্তান ড্রোনের বিরুদ্ধে অস্ত্র দিয়ে রোখা যায়, এমন কাইনেটিক পদ্ধতি যেমন ব্যবহার করেছে, তেমনই প্রযুক্তি দিয়ে আটকানো যায়, অর্থাৎ ‘নন-কাইনেটিক’ প্রতিরোধী ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে।

তার কথায়, ভারতের ব্যবহৃত ইসরায়েল-নির্মিত ‘হেরন’ ড্রোনের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে এসব পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযানে প্রচলিত বিমান হামলার পরিবর্তে ড্রোন-ভিত্তিক অভিযান ক্রমশ প্রাধান্য পাচ্ছে।

কিন্তু ড্রোনের বিরুদ্ধে আকাশ প্রতিরক্ষার এই বৃহত্তর চ্যালেঞ্জ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)-এর একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরে চার হাজারেরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।

যদিও খুব কম সংখ্যকই তাদের লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে, এই হামলাগুলো বিশ্বের জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে উল্লেখযোগ্য অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।

বিশ্লেষণটিতে আরও বলা হয়েছে, যদিও ‘গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল’ (জিসিসি) সদস্য রাষ্ট্রগুলো ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর বড় অংশই প্রতিহত করতে পেরেছে, তা সত্ত্বেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইরান যে হামলা চালাতে সক্ষম হলো, তাতে প্রমাণ হলো যে তাদের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কাঠামোর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে।

ভারত বলছে, তারা তাদের সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে একটি বহুস্তরীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করে এই ধরনের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেছে।

সামরিক শক্তিবৃদ্ধি

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে ভারত বিশ্বের পঞ্চম অবস্থানে ছিল, ওই বছর তারা প্রায় ৯ হাজার ২১০ কোটি ডলার ব্যয় করে এ খাতে।

তুলনামূলকভাবে, পাকিস্তান এ সময় ব্যয় করেছে প্রায় ১ হাজার ১৯০ কোটি ডলার।

ভারতের সশস্ত্র বাহিনীতে ইসরায়েল-নির্মিত একাধিক সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীতে প্রধানত নজরদারির জন্য হেরন এবং সার্চার এমকে-ওয়ান/টু ড্রোন ব্যবহার করা হয়।

এই দুটিই মাঝারি উচ্চতায় দীর্ঘ সময় ধরে উড়তে সক্ষম। মূলত নজরদারির জন্যই এগুলো ব্যবহার করা হয়।

সার্চার ছিল ভারতের প্রথম ড্রোন, যা ১৯৯৯ সালে কেনা হয়েছিল।

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল বেদ প্রকাশ মালিক ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে সার্চার ১-এর একটি প্রদর্শনী দেখার কথা মনে করে বলেন, সেটি ছিল এই ধরনের প্রথম প্রদর্শনী।

যদিও দাবি করা হয় যে মিশনের ওপর নির্ভর করে হেরন ৩৫ হাজার ফুট উচ্চতায় ৪৫ ঘণ্টা পর্যন্ত আকাশে থাকতে পারে, সার্চারের ক্ষমতা তার থেকে তুলনামূলকভাবে কম।

ভারত এখন শুধু দীর্ঘ সময় উড়তে পারবে—এমন ড্রোনের পাশাপাশি আঘাত করার ক্ষমতা আরও বেশি হবে, এমন ড্রোনও চাইছে।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত ৩৫০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করেছে, যার অধীনে ৩১টি এমকিউ-৯বি ‘হাই অল্টিটিউড লং এনডিউরেন্স’ বা ‘হেল’ অর্থাৎ, অতি উচ্চতায় দীর্ঘ সময় ধরে উড়তে পারবে, এমন ড্রোন কিনবে।

এগুলোর মধ্যে নৌবাহিনীর জন্য ১৫টি এবং স্থলসেনা ও বিমানবাহিনীর জন্য আটটি করে ড্রোন থাকবে।

এই ড্রোনগুলো ২০২৯ সাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নৌবাহিনীর বিমান শাখার অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল পিজি ফিলিপোস, এমকিউ-৯বি ড্রোনগুলোকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তিনি উল্লেখ করেন, নৌবাহিনী এরই মধ্যে এর একটি সংস্করণ সমুদ্র উপকূলে ব্যবহার করছে লিজ নিয়ে। নজরদারি, মানবিক সহায়তাসহ আরও অনেক কাজে সক্ষম এই ড্রোনকে ‘গেম চেঞ্জার’ বলে মনে করেন তিনি।

তবে হামলা চালানোর ড্রোন—যাকে ‘লয়টারিং মিউনিশন’ বা কামিকাজি ড্রোন বলা হয়, যেগুলোতে বিস্ফোরক থাকে এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার পরে ফেটে যায়, সেরকম ড্রোনের জন্য ভারত এখনো মূলত আমদানির ওপরেই নির্ভরশীল।

আইআইএসএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারত যে প্রধান প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তার মধ্যে আছে ইসরায়েলি হারোপ, মিনি-হার্পি এবং স্কাই স্ট্রাইকার (বেঙ্গালুরু-ভিত্তিক আলফা ডিজাইন টেকনোলজিসের সঙ্গে যৌথভাবে নির্মিত)।

একই সঙ্গে ভারতে নির্মিত ‘নাগাস্ত্র’ও ব্যবহার করা হয়।

ভারত ছোট আকারের কৌশলগত ড্রোন—যেমন নজরদারি চালানো ও সোয়ার্ম অপারেশনে ব্যবহৃত কোয়াডকপ্টার নির্মাণের ব্যাপারে আত্মনির্ভর হওয়ার দিকে জোর দিচ্ছে।

সোয়ার্ম অপারেশন বলতে এমন সমন্বিত অভিযানকে বোঝায় যেখানে একগুচ্ছ ড্রোন বা রোবট বা যানবাহন, অথবা এর সবগুলোই একটি দল হিসেবে কাজ করে এবং একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ব্যবহৃত হয়।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন যে একটি ‘হিউম্যান-ইন-দ্য-লুপ’ সিস্টেম নিয়ে কাজ চলছে, যার সাহায্যে একজন অপারেটর একই সঙ্গে অনেকগুলো ড্রোন পরিচালনা করতে পারবে।

আমদানির ঝুঁকি এবং চীননির্ভরতা

ভারতের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহ ব্যবস্থা।

মেজর জেনারেল মনদীপ সিং (অবসরপ্রাপ্ত) বর্তমানে একটি বেসরকারি ড্রোন সংস্থার প্রতিরক্ষা বিভাগের দায়িত্বে আছেন।

তিনি জানান, ফ্লাইট কন্ট্রোলার, স্পিড কন্ট্রোলার এবং কমিউনিকেশন হার্ডওয়্যারসহ ড্রোনের মূল যন্ত্রাংশের আমদানি বাজারে চীনের আধিপত্য রয়েছে।

তিনি বলেন, একটি ড্রোনের চারটি প্রধান অংশ থাকে। প্রথমটি হলো ফ্লাইট কন্ট্রোলার যা ড্রোনের মস্তিষ্ক। এরপর রয়েছে স্পিড কন্ট্রোলার, যা ফ্লাইট কন্ট্রোলার থেকে মোটরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং এই মোটরগুলোই ড্রোনটিকে ওড়ার সময় নির্দেশ দেয়।

‘তারপর রয়েছে ড্রোনের রিসিভার ও ট্রান্সমিটার, যা ড্রোন এবং অপারেটরের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং সবশেষে এর ক্যামেরা। এই চারটি মূল অংশের ক্ষেত্রে আমরা মূলত আমদানির উপর নির্ভরশীল ছিলাম, কিন্তু এখন কিছুটা পরিস্থিতির বদল হয়েছে,’ বলেন মনদীপ সিং।

তিনি আরও বলেন, সস্তা চীনা যন্ত্রাংশের বদলে নিজেদের দেশেই এগুলো তৈরি করার ব্যাপারে আমাদের এখনো অনেকটা পথ যেতে হবে।

তার কথায়, ‘অপারেশন সিঁদুর’ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ভারতকে তার সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য চীনের ওপরে নির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে এটা সুনিশ্চিত করতে হবে যাতে সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তপোক্ত ও নির্ভরযোগ্য থাকে।

ভারতের সশস্ত্র বাহিনীকে সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘আইজি ডিফেন্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বোধিসত্ত্ব সঙ্ঘপ্রিয় বলেন, চীনা সিস্টেমগুলোর ডেটা নিরাপত্তা, সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ আছে। ভারতকে তার নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, এবং আমরা ঠিক সেদিকেই মনোযোগ দিচ্ছি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।