বিলুপ্ত-বিরল মাছের অনন্য সংগ্রহশালা চাঁদপুরের ফিশ মিউজিয়াম

শরীফুল ইসলাম শরীফুল ইসলাম , চাঁদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০২:০৪ পিএম, ১৮ মে ২০২৬
চাঁদপুরে ফিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষণ আছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ/ ছবি: জাগো নিউজ

নদীমাতৃক বাংলাদেশের মাছের বৈচিত্র্যকে জীবন্ত করে তুলেছে চাঁদপুরের ফিশ মিউজিয়াম। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই সংগ্রহশালায় রয়েছে ইলিশসহ তিন শতাধিক মাছের নমুনা। হারিয়ে যেতে বসা নানা প্রজাতির মাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মৎস্যসম্পদ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কাজও করছে প্রতিষ্ঠানটি।

চাঁদপুর শহরের ওয়্যারলেস এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট নদী কেন্দ্রের ইলিশ ভবনের নিচতলায় গড়ে তোলা হয়েছে এই ফিশ মিউজিয়াম। দর্শনার্থীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত না হলেও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও মৎস্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত এখানে এসে মাছের বিভিন্ন প্রজাতি সম্পর্কে জানছেন এবং গবেষণামূলক তথ্য সংগ্রহ করছেন।

‘বর্তমানে ফিশ মিউজিয়ামে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩২৫টি জারে বিভিন্ন মাছ সংরক্ষিত রয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগই নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলের মাছ। গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা করতেই মূলত এসব নমুনা সংরক্ষণ করা হচ্ছে’

বিলুপ্ত-বিরল মাছের অনন্য সংগ্রহশালা চাঁদপুরের ফিশ মিউজিয়াম
ফিশ মিউজিয়ামে ৩২৫টি জারে মাছ সংরক্ষিত/ ছবি: জাগো নিউজ

স্থানীয়রা জানায়, এই ফিশ মিউজিয়াম শুধু একটি সংগ্রহশালা নয়, বরং দেশের নদী ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ইলিশের শহর চাঁদপুরে গড়ে ওঠা এই অনন্য মিউজিয়াম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদের ইতিহাস ও বৈচিত্র্য তুলে ধরছে নীরবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৬২ সালে প্রথমবারের মতো এই ফিশ মিউজিয়াম স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় মৎস্য বিভাগের পরিচালক মো. ইউসুফ আলী এবং কর্মকর্তা এ কে আতাউর রহমান দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও জলাশয় থেকে নানা প্রজাতির মাছ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে সেই সংগ্রহ আরও সমৃদ্ধ হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ফিশ মিউজিয়ামে রূপ নেয়।

আরও পড়ুন:
আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস আজ
১৭০ বছরের ইতিহাস ধরে রেখেছে দেশের একমাত্র চা জাদুঘর
হাজার নিদর্শনের জাদুঘরে দিনে দর্শনার্থী আসে মাত্র ২৫-৩০ জন
ফসিল থেকে একতারা—সবই আছে, নেই শুধু দর্শনার্থী

দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত এ সংগ্রহশালাকে আধুনিক রূপ দিতে ২০২৩ সালে নতুন করে মিউজিয়ামটির সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ করা হয়। বর্তমানে এখানে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে ৩২৫টি বড় ও ছোট জার। প্রতিটি জারে কেমিক্যালের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা গবেষণার প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন নদী, মোহনা ও সমুদ্র উপকূল থেকে মাছ সংগ্রহ করেন। গবেষণা কার্যক্রম শেষ হলে গুরুত্বপূর্ণ ও বিরল প্রজাতির মাছগুলো সংরক্ষণ করা হয় এই মিউজিয়ামে। ফলে এটি এখন শুধু একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র নয়, বরং মৎস্য গবেষণা ও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।

‘১৯৬২ সালে প্রথমবারের মতো এই ফিশ মিউজিয়াম স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় মৎস্য বিভাগের পরিচালক মো. ইউসুফ আলী এবং কর্মকর্তা এ কে আতাউর রহমান দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও জলাশয় থেকে নানা প্রজাতির মাছ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ শুরু করেন’

মিউজিয়ামে সংরক্ষিত মাছগুলোর মধ্যে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় মহাশোল, বিরল প্রজাতির জইয়া মাছ, রানি মাছ, চিতল, গারুয়া, তারা বাইম, মধু পাবদাসহ অসংখ্য দেশীয় প্রজাতির মাছ। এছাড়া সমুদ্রের হাঙর মাছ, ঝিনুক, বামশ মাছ, ইলিশ এবং বিভিন্ন মাছের ডিমও সংরক্ষণ করা হয়েছে বিশেষ পদ্ধতিতে।

বিলুপ্ত-বিরল মাছের অনন্য সংগ্রহশালা চাঁদপুরের ফিশ মিউজিয়াম
জারে সংরক্ষণ করা আছে বিলুপ্তপ্রায় মাছ/ ছবি: জাগো নিউজ

চাঁদপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, দেশীয় মাছ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে হলে নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ের দূষণ রোধে সবাইকে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে। নদী বাঁচলে দেশীয় মাছও বাঁচবে। কিন্তু নদী দূষিত হতে থাকলে একসময় এসব মাছ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, নদীর তীরে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানা, বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি এবং পৌরসভার বর্জ্য অবশ্যই পরিশোধনের মাধ্যমে অপসারণ করতে হবে, যাতে নদীর পানি দূষিত না হয়। একসময় যেসব দেশীয় মাছ সহজেই পাওয়া যেত, এখন সেগুলোর মধ্যে অধিকাংশই আর দেখা যায় না। কিছু প্রজাতি শুধু জাদুঘরে সংরক্ষিত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে।

‘দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে যারা ফিশারিজ বিষয়ে পড়াশোনা করছেন, তারা নিয়মিত এখানে আসেন। বাস্তবে মাছের বিভিন্ন প্রজাতি দেখে শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু জানতে পারছেন এবং গবেষণার প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন’

মিজানুর রহমান আরও বলেন, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাস্তবে নয়, শুধু জাদুঘরেই এসব মাছ দেখতে পাবে। আমরা তা চাই না। আমরা চাই সচেতনতার মাধ্যমে দেশীয় মাছসহ সব প্রজাতি সংরক্ষণ ও টিকিয়ে রাখতে, যাতে মানুষ বাস্তবেই এসব জীববৈচিত্র্য দেখতে পারে।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ জাগো নিউজকে জানান, বর্তমানে ফিশ মিউজিয়ামে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩২৫টি জারে বিভিন্ন মাছ সংরক্ষিত রয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগই নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলের মাছ। গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা করতেই মূলত এসব নমুনা সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

বিলুপ্ত-বিরল মাছের অনন্য সংগ্রহশালা চাঁদপুরের ফিশ মিউজিয়াম
চাঁদপুরে ফিশ মিউজিয়ামে দেখা মিলবে বিলুপ্তপ্রায় মাছের/ ছবি: জাগো নিউজ

আরও পড়ুন:
বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর স্মৃতি জাদুঘরে নেই কোনো স্মৃতিচিহ্ন
জিয়া স্মৃতি জাদুঘর দ্রুত হেরিটেজ ঘোষণা করা হবে: অর্থমন্ত্রী
হারিয়ে গেছে মহাস্থান জাদুঘরের একটি মূর্তি, জানা গেলো ১৯ বছর পর

তিনি আরও জানান, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে যারা ফিশারিজ বিষয়ে পড়াশোনা করছেন, তারা নিয়মিত এখানে আসেন। বাস্তবে মাছের বিভিন্ন প্রজাতি দেখে শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু জানতে পারছেন এবং গবেষণার প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জানান, আপাতত সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য মিউজিয়ামটি উন্মুক্ত করার কোনো পরিকল্পনা নেই। কারণ এটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত জনবল। বর্তমানে জনবল সংকট থাকায় সীমিত পরিসরে এটি সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তবে গবেষণার কাজে কর্মকর্তারা যখন নতুন বা বিরল কোনো মাছ সংগ্রহ করেন, তখন সেগুলোও এই মিউজিয়ামে যুক্ত করা হয়।

এনএইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।