ফার্স্ট-পারসন ভিউ

হিজবুল্লাহর সস্তা ‘এফপিভি সুইসাইড ড্রোন’ হামলায় ধরাশায়ী ইসরায়েল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৫২ পিএম, ০২ মে ২০২৬
‘ফার্স্টপারসন ভিউ’ (এফপিভি) ড্রোন/ছবি: প্যালেস্টাইন ক্রনিকলস

গাজায় আগ্রাসন চালানোর সময় ভারী সাঁজোয়া যান ও ট্যাংক থাকার কারণে ইসরায়েলি সৈন্যদের হতাহতের সংখ্যা অনেকটাই কম হয়েছিল। তবে এসব ভারী যানবাহন নিয়ে লেবাননে হামলা চালাতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। শিশুদের খেলনাসদৃশ এক ধরনের সুইসাইড ড্রোনের হামলায় এসব ভারী যুদ্ধাস্ত্র এখন মৃত্যুকূপে রূপ নিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য মতে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর অবস্থানের বিরুদ্ধে এখন সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে ‘ফার্স্টপারসন ভিউ’ (এফপিভি) ড্রোন।

ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে ছোট আকৃতির এই এফপিভি ড্রোন ব্যবহার করছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। এই ড্রোনগুলো ‘সস্তা হলেও অত্যন্ত কার্যকর’ এবং ইসরায়েলি অবস্থানকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে সক্ষম।

ফার্স্ট পার্সন ভিউ (এফপিভি) সুইসাইড ড্রোন

ফার্স্টপারসন ভিউ (এফপিভি) ড্রোন

ড্রোন হলো ছোট আকারের কোয়াডকপ্টার, যেগুলোর সামনে ক্যামেরা থাকে এবং তা সরাসরি লাইভ ভিডিও অপারেটরের কাছে পাঠায়। অপারেটর বিশেষ গগলস ব্যবহার করে সেই লাইভ ফিড দেখে রিয়েল টাইমে ড্রোনটি লক্ষ্যবস্তুর দিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

এই ড্রোনগুলো সাধারণত প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার আকারের হয় এবং এগুলোর সঙ্গে বিস্ফোরক যুক্ত করে ‘কামিকাজে’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে সেখানেই বিস্ফোরিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ড্রোনের দাম মাত্র ২০০ থেকে ১,০০০ ডলারের মধ্যে, যা প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক কম ব্যয়বহুল।

লেবাননের সংবাদমাধ্যম আল-মায়েদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা কৌশলের মতোই ইসরায়েলি সেনারা ভারী সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে দক্ষিণ লেবাননের শহর ও গ্রামে প্রবেশ করছে এবং বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করছে। তবে লেবাননের ভূখণ্ড ও গেরিলা যুদ্ধ কৌশলের কারণে এই পদ্ধতি কার্যকর হচ্ছে না।

লেবাননের প্রতিরোধ গোষ্ঠীটি শুক্রবার (১ মে) জানিয়েছে, তাদের যোদ্ধারা দক্ষিণ লেবাননে একাধিক ইসরায়েলি সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে। সংগঠনটি দাবি করেছে, ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে এসব হামলা করা হয়েছে।

হিজবুল্লাহর বিবৃতি অনুযায়ী, আল-বায়াদা এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের একটি সমাবেশ লক্ষ্য করে একটি এফপিভি ড্রোন হামলা চালানো হয়, যা সরাসরি লক্ষ্যভেদ করেছে বলে দাবি করা হয়।

এছাড়া বিন্নত জবেইলের মুসা আব্বাস কমপ্লেক্সের কাছে ইসরায়েলি সেনাদের একটি সমাবেশে আর্টিলারি গোলাবর্ষণ করা হয়। একই সময়ে হুলা গ্রামের একটি স্কুলের কাছে আরেকটি সেনা সমাবেশেও গোলা নিক্ষেপ করা হয়।

একই দিন দুপুরের পর লেবাননের আল-বায়াদা এলাকায় ইসরায়েলি একটি সামরিক যান এবং আল-তাইবেহ এলাকায় একটি হামভি গাড়িতে আরও দুটি এফপিভি ড্রোন হামলার দাবি করেছে সংগঠনটি।

২০২৪ সালের নভেম্বরের পর ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চলাকালেও হিজবুল্লাহ-ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে বহুবার সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে বহুবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে ইসরায়েল। এর জবাবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি ট্যাংক ও সামরিক কনভয়ে আইইডি (আইইডি) বিস্ফোরণ ঘটায়।

তবে গত ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চালানো পাল্টা হামলায় এফপিভি ড্রোন ব্যবহারে সাফল্য পেতে থাকে হিজবুল্লাহ। এই ড্রোনগুলো মাত্র কয়েকশ ডলারে তৈরি করা যায় এবং ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তির কারণে এগুলো ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে।

এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ড্রোন অপারেটররা ১০ কিলোমিটারেরও বেশি দূর থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম হচ্ছে। এতে ইসরায়েলি সেনাদের জন্য এগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে নানামুখী সমস্যা সম্মুখীন হচ্ছে।

ইসরায়েলের দৈনিক ইয়াদিয়োথ আহরোনোথে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহু বছর ধরে ইসরায়েল উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করলেও এফপিভি ড্রোনের মতো নিম্ন প্রযুক্তির হুমকি মোকাবিলায় তারা সমস্যায় পড়েছে।

অন্যদিকে হেরাৎজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বহুদিন ধরেই এই হুমকির বিষয়ে জানলেও কার্যকর সমাধান তৈরি করতে পারেনি।

সাম্প্রতিক এক হামলায় লেবাননের তাইবেহ এলাকায় এফপিভি ড্রোনের আঘাতে ইসরায়েলি সেনারা হতাহত হন এবং একজন সার্জেন্ট নিহত হয় বলে জানানো হয়েছে।

পরে একটি মেডিভ্যাক হেলিকপ্টারেও ড্রোন হামলা চালানো হয়। এই ড্রোন হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি সেনারা। তবে ভিডিও প্রকাশ নিয়ে দেশটির ভেতরেই সমালোচনা শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ড্রোন যুদ্ধ ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য মানসিক চাপ তৈরি করছে এবং দক্ষিণ লেবাননে তাদের সামরিক কার্যক্রম আরও জটিল করে তুলছে।

একই সঙ্গে বলা হয়েছে, অত্যন্ত ব্যয়বহুল ইসরায়েলি ট্যাংক ও সামরিক যানবাহন তুলনামূলকভাবে সস্তা ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে এক ধরনের অসম পরিস্থিতি তৈরি করছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার দিনই লেবাননের হিজবুল্লাহর ওপর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরায়েল। এরপর ওয়াশিংটনের ঘোষিত ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ১৭ এপ্রিল কার্যকর হলেও বাস্তবে তা অনেকটাই অকার্যকর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: প্যালেস্টাইন ক্রনিকলস, টাইমস অব ইসরায়েল/ইএফই

কেএম 

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।