ধারণার চেয়েও ভয়াবহ সংকটে সুদান, সহিংসতা-রোগ-দুর্ভিক্ষে দিশাহারা মানুষ

তানিয়া তাসনিম নীলিমা
তানিয়া তাসনিম নীলিমা তানিয়া তাসনিম নীলিমা , সিনিয়র সাব-এডিটর, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:১৫ পিএম, ১৮ মে ২০২৬
ধারণার চেয়ে ভয়াবহ সংকটে সুদান/ ছবি: এএফপি (ফাইল)

সুদানে চলমান গৃহযুদ্ধ এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। সংঘাতের কারণে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমানে সেখানে খাবার, ওষুধ ও অন্য প্রয়োজনীয় জিনিসের তীব্র সংকটে দিশাহারা সাধারণ মানুষ।

সুদান উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার একটি দেশ, যা আয়তনের দিক থেকে আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্তম। ২০২৩ সাল থেকে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) এবং আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে গৃহযুদ্ধ চলছে। বর্তমানে দেশের পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চল সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পশ্চিমাঞ্চলীয় দারফুর অঞ্চল ও কোর্দোফানের অধিকাংশ এলাকা আরএসএফের দখলে রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

সুদান পৃথিবীর সবচেয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ববহুল দেশগুলোর অন্যতম। এর উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক ভাবে অগ্রসর এলাকার অধিকাংশ মানুষ মুসলিম। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের অনগ্রসর এলাকার অধিবাসীদের অধিকাংশই অমুসলিম। সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিভাজন ও মতবিরোধের ফলে সুদানে আধুনিক কালের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে।

জনশূন্য রাজধানী
রাজধানী খার্তুমের পরিস্থিতিও ভয়াবহ। সেখানে কী ঘটেছে তা বিশ্ব এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি। যে শহরের জনসংখ্যা একসময় ৭০ লাখ ছিল, সেটি যেন এখন প্রায় জনশূন্য। গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলায় প্রায় সব ভবনই ধ্বংস বা আংশিকভাবে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। যেগুলো দাঁড়িয়ে আছে সেগুলোতে অসংখ্য গুলির ছিদ্র চোখে পড়ছে। গত ৩০ বছরের মধ্যে এত বড় মাপের ধ্বংসযজ্ঞ আর দেখা যায়নি।

অনেক এলাকায় পৌঁছানো বেশ কঠিন এবং সেখানকার পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ আর প্রকোট হয়ে উঠেছে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরেও পড়ছে না।

ধারণার চেয়েও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি
এখন পর্যন্ত ৫৮ হাজারের বেশি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে যে, প্রায় দেড় লাখ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে। যখন দেশের অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত তখন হতাহতের সংখ্যা নির্ণয় করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

দেশটিতে মানুষ শুধু সহিংসতার কারণেই মারা যাচ্ছে তা নয় বরং রোগ ও অনাহারেও মারা যাচ্ছে। বারবার কলেরা, ভাইরাল হেপাটাইটিস, মেনিনজাইটিস, ইয়েলো ফিভার এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। এই যুদ্ধ বিশ্বের বৃহত্তম ক্ষুধা সংকট তৈরি করেছে, যেখানে ২ কোটির বেশি অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৬২ শতাংশ এখন পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না। সেখানে ক্রমাগত দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ছে।

দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে পরিচালিত স্থানীয় কমিউনিটি কিচেন। কিন্তু জরুরি ভিত্তিতে সেখানে আরও সহায়তা প্রয়োজন। ইসলামিক রিলিফ সম্প্রতি একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে যেখানে দেখা গেছে, তহবিল ও সরবরাহের অভাবে গত ছয় মাসে দেশজুড়ে জরিপ করা ৮৪৪টি কিচেনের ৪২ শতাংশই বন্ধ হয়ে গেছে।

এখন ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত করছে এবং সুদানের খাদ্য সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। দেশটিতে খাদ্য ও জ্বালানির দাম দ্বিগুণ হওয়ায় আরও বেশি পরিবার নিজেদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাচ্ছে।

দারফুর ও কর্দোফানের পশ্চিমাঞ্চলে মানুষ ভয়াবহ নৃশংসতা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। হাসপাতাল ও স্কুলে ড্রোন হামলা হচ্ছে, শহরগুলো অবরুদ্ধ, বিভিন্ন গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং ত্রাণবাহী গাড়িবহরে বোমা হামলা চালানো হচ্ছে। কিন্তু এমন চরম পরিস্থিতিতেও কাজ করে চলছেন বিভিন্ন সহায়তা সংস্থার কর্মীরা এবং বাস্তুচ্যুতদের যথাসাধ্য সাহায্য করছেন তারা। তবে এখনো অনেক চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।

খার্তুম এবং দেশের পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিছুটা উন্নত হয়েছে এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো তাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ে ফিরতে শুরু করেছে। কিন্তু সেখানকার পরিস্থিতিও খুব একটা ভালো নয়।

অন্তত ১৩ লাখ মানুষ রাজধানীতে ফিরে এসে এক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। সেখানে তীব্র খাদ্য সংকট, কাজের সুযোগের অভাব এবং পরিষেবা ব্যবস্থার প্রায় অনুপস্থিত। যুদ্ধ অর্থনীতিকে বিধ্বস্ত করে দেওয়ায় দারিদ্র্য চরম আকার ধারণ করেছে। 

স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে

শুধু খার্তুমেই প্রায় ২০০ স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে; সেগুলো হয় ধ্বংস হয়ে গেছে অথবা বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে আশ্রয় দিয়েছে। ফলে ফিরে আসা শিশুদের পড়াশোনা পুনরায় শুরুর কোনো জায়গা নেই। যে হাসপাতালগুলো ধ্বংস হয়নি, সেগুলো লুট হয়ে গেছে এবং আংশিকভাবে চালু আছে। দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।

খার্তুমে ইসলামিক রিলিফ দল স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্নির্মাণে সাহায্য করছে এবং মানুষ যে মানসিক আঘাতের শিকার হয়েছে সেজন্য তাদের কাছে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা প্রদান করছে। কিন্তু চাহিদার পরিমাণ বিশাল এবং তা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

বেঁচে ফেরা লোকজনের অভিজ্ঞতাও বেশ ভয়াবহ। আয়েশা নামের এক নারী জানিয়েছেন, কীভাবে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর হাতে তার চার ছেলে নিহত হয়েছিল। পূর্ব সুদানের গাদারিফ শহরের বাস্তুচ্যুতদের একটি শিবিরে পৌঁছানোর জন্য তিনি পাঁচ দিন ধরে তার নাতি-নাতনিদের নিয়ে কী অবর্ণনীয় কষ্ট করেছেন। বেঁচে যাওয়া প্রত্যেকেই ক্ষয়ক্ষতির শিকার এবং তাদের সবার জীবনের গল্প প্রায় একই রকম।

মানুষ এখনো ভয় পাচ্ছে যে, যুদ্ধ চলতে থাকায় রাজধানীর উন্নয়নগুলো হয়তো ভেঙে পড়বে। গত মাসে বেশ কয়েকটি রাজ্যে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে, অন্যদিকে খার্তুমও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে।

অনেকেই এখন আতঙ্কে আছে যে, দেশের পশ্চিমে এই অন্তহীন যুদ্ধের ফলে আফ্রিকার অন্যতম বৃহত্তম দেশটি হয়তো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে।

টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা-নাগরিকদের সুরক্ষায় অগ্রগতি নেই

গত মাসে সুদান যুদ্ধের তৃতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্ব নেতারা বার্লিনে একটি বড় সম্মেলনে একত্রিত হয়েছিলেন। কিন্তু টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক সাফল্যের দিকে তেমন কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে, স্থিতিশীলতা ও স্থানীয় সহায়তা দলগুলোকে সমর্থন জোগাতে এবং প্রয়োজনে সবার কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সরকারগুলোর জরুরি ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা অপরিহার্য। দুঃখজনকভাবে বিদেশ থেকে আসা বহু সম্পদ যুদ্ধ নিরসনে সাহায্য করার পরিবর্তে একে আরও উসকে দিচ্ছে।

সুদানের জনগণের এখন একটাই চাওয়া তা হলো যুদ্ধের অবসান, নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাওয়া এবং মর্যাদা ও নির্ভয়ে জীবনযাপন করা। আপাতত দৃষ্টিতে এটা খুব বেশি কিছু চাওয়ার নয়। কিন্তু নিজ দেশে নির্ভয়ে দিন কাটানোটাও এখন তাদের কাছে অনেকটাই স্বপ্নের মতো।

যুদ্ধ উসকে দিচ্ছে ইথিওপিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত?

সাম্প্রতিক সময়ে সুদানের সামরিক সরকার ইথিওপিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সুদানের যুদ্ধে র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) সাথে কাজ করার জন্য অভিযুক্ত করে আসছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইথিওপিয়া উভয়ই এই দাবি অস্বীকার করেছে। গত জানুয়ারিতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক তদন্তে ইথিওপিয়ায় একটি গোপন প্রশিক্ষণ শিবিরের অস্তিত্ব প্রকাশ পায়, যা কথিতভাবে হাজার হাজার আরএসএফ যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হতো।

এদিকে সুদানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চলতি মাসে জানিয়েছে যে, যুদ্ধের কারণে তাদের ৩৭ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সুদানি সশস্ত্র বাহিনীর (এসএএফ) প্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং আরএসএফ নেতা মোহাম্মদ হামদান দাগালোরমধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ের জেরেই ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল দেশটিতে যুদ্ধের সূত্রপাত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) চলতি মাসের শুরুতে সুদানের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ওপর অন্তত ২১৭টি হামলার ঘটনা যাচাই ও নথিভুক্ত করেছে। এসব হামলায় দুই হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন। দেশটিতে বর্তমানে ৫ কোটি ২০ লাখ মানুষের প্রায় ৪০ শতাংশের জরুরি চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন।

পুষ্টিহীনতা, দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং কম টিকার হারের কারণে রোগের প্রাদুর্ভাব বিধ্বংসী প্রভাব ফেলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে যে, শিশুদের পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ।

পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস, সোনা, সিলভার, অ্যাসবেস্টস, ম্যাঙ্গানিজ, জিপসাম, জিংক, লোহা, সিসা, ইউরেনিয়াম, কপার, কোবাল্ট, গ্রানাইট, নিকেল ও তামাসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ হওয়ার পরে গৃহযুদ্ধের কারণে ভয়াবহ সংকটে ধুকছে সুদান।

সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি, উইকিপিডিয়া

টিটিএন

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।