ইরান যুদ্ধে জৌলুস হারাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ
মধ্যপ্রাচ্যের ছোট উপসাগরীয় দেশ কাতার। তিন দশক ধরে প্রাকৃতিক গ্যাসকে কেন্দ্র করে নিজেদের অর্থনীতিকে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ব্যবস্থায় পরিণত করেছিল তারা। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি করে দেশটি প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি ডলার আয় করেছে। সেই অর্থে গড়ে উঠেছে অত্যাধুনিক শহর, বিশাল অবকাঠামো, বিশ্বকাপ আয়োজন এবং শত শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তহবিল।
কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কাতারের সেই সমৃদ্ধির দুয়ার যেন আচমকা বন্ধ হয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে কাতার থেকে কোনো গ্যাসের জাহাজ আন্তর্জাতিক বাজারে যেতে পারেনি। একই সঙ্গে সমুদ্রপথে গাড়ি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী আমদানির পথও বন্ধ হয়ে গেছে দেশটির। আঞ্চলিক এই অস্থিরতার কারণে পর্যটন খাতে ধস নেমেছে এবং ব্যবসায়ী মহলে দেখা দিয়েছে চরম আতঙ্ক।
কাতারের মোট আয়ের ৬০ শতাংশের বেশি আসে জ্বালানি খাত থেকে। অথচ ইরান যুদ্ধের জেরে দেশটির গ্যাস উৎপাদনের প্রধান শিল্পাঞ্চল রাস লাফান এখন বন্ধ, অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে সড়কগুলো। দোহার দক্ষিণে বিশাল হামাদ বন্দরে লোডিং ক্রেনগুলো দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চল হয়ে। পুরো রাজধানীজুড়ে হোটেল ও বিলাসবহুল বুটিকগুলোতে এখন সুনসান নীরবতা। এলএনজি বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ব্যাপকভাবে কাটছাঁট করা হয়েছে।
আরও পড়ুন>>
কাতারে হামলা, সবচেয়ে বেশি গ্যাস সংকটে পড়বে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান
কাতারের রাস লাফান-ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশিদের জন্য কাতারে নতুন চাকরির সুযোগ
কৌশলগত পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ‘দ্য এশিয়া গ্রুপ’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ হেলাল দোহায় এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কাতারের জন্য গ্যাস রপ্তানি হলো তাদের ভিত্তির মতো। এই জ্বালানি সম্পদ ছাড়া কাতারের বর্তমান রূপ কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। আর ঠিক এই কারণেই কাতার দ্রুত একটি বড় ধরনের আর্থিক সংকটের দিকে যাচ্ছে।
বিশ্বের বুকে নতুন জ্বালানি পরাশক্তি
নব্বইয়ের দশকে কাতারের অর্থনৈতিক রূপান্তর শুরু হয়। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র ‘নর্থ ফিল্ড’ থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে তা মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঠান্ডা করে তরলে রূপান্তরের এক বড় জুয়া খেলেছিল তারা। এর ফলে আঞ্চলিক পাইপলাইনের ওপর নির্ভর না করে জাহাজে করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে গ্যাস পাঠানো সম্ভব হয়।
১৯৯৬ সালে জাপানে প্রথম ৬০ হাজার টন গ্যাস পাঠানোর মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন জ্বালানি পরাশক্তির জন্ম হয়। ২০১০ সালের মধ্যে কাতারের উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়ায় বছরে ৭ কোটি ৭০ লাখ টন। পরবর্তী এক দশক মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে কাতার ছিল বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। ৩২ লাখ জনসংখ্যার এই দেশে এখন প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশি কর্মী, যারা এই অবকাঠামো বিনির্মাণে ভূমিকা রেখেছেন। ২০১৯ সালে কাতার ঘোষণা দিয়েছিল, ২০২৭ সালের মধ্যে তারা নর্থ ফিল্ডের এলএনজি উৎপাদন ক্ষমতা বছরে ১২ কোটি ৬০ লাখ টনে উন্নীত করবে, যা হবে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জ্বালানি প্রকল্প।
ভৌগোলিক ফাঁদ ও ইরানি হামলা
ফেব্রুয়ারির শেষভাগে এসে এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে আসে। কাতারের প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের এমন পাইপলাইন রয়েছে যা দিয়ে হরমুজ প্রণালিকে এড়িয়ে পণ্য পাঠানো যায়। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কাতার এই জলপথের ভেতরে অবরুদ্ধ।
ইরানি অবরোধের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহে নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশ করে। এর দুই সপ্তাহ পর ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কাতারের রাস লাফান প্ল্যান্টে আঘাত হানে। এতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কাতারের উৎপাদন ক্ষমতা ১৭ শতাংশ কমে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি যদি আগামীকালও খুলে দেওয়া হয়, যুদ্ধপূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যেতে কাতারের কয়েক বছর সময় লাগবে। কাতারএনার্জি এরই মধ্যে কোটি কোটি ডলার হারিয়েছে এবং প্রতিদিন এই ক্ষতি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আশঙ্কা করছে, চলতি বছর কাতারের অর্থনীতি ৮ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
জ্বালানি-পরবর্তী অর্থনীতির ভবিষ্যৎও ঝুঁকিতে
এই যুদ্ধ কাতারের আরেকটি দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে কাতার নিজেকে আন্তর্জাতিক ব্যবসা, অর্থায়ন এবং পর্যটনের একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল। ফর্মুলা ওয়ান গাড়ি রেস থেকে শুরু করে বড় বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টের আয়োজন করা হচ্ছিল নিয়মিত।
কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ সতর্কতার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। বহু বহুজাতিক কোম্পানি আঞ্চলিক অস্থিরতার আশঙ্কায় তাদের কর্মীদের দেশ থেকে সরিয়ে নিয়েছে।
‘মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, বিশ্বজুড়ে কাতারের বিমানবন্দরে বিমান হামলার সাইরেন এবং রাস লাফানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দৃশ্য সম্প্রচারিত হয়েছে। এই নেতিবাচক ভাবমূর্তি সহজে দূর হওয়ার নয়। যুদ্ধ কাতারের হাইড্রোকার্বন (গ্যাস) এবং হাইড্রোকার্বন-পরবর্তী অর্থনৈতিক ভিত্তি—দুটিকেই একসঙ্গে আঘাত করেছে।
মেধা পাচারের আশঙ্কা
কাতার তার প্রয়োজনীয় খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে। সমুদ্রপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইউরোপের তাজা ফলমূল বা আমেরিকার শস্য এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল আকাশপথে কিংবা সৌদি আরবের ভেতর দিয়ে ট্রাকে করে নিয়ে আসতে হচ্ছে। সাধারণত এর ফলে বাজারে তীব্র মূল্যস্ফীতি ঘটার কথা থাকলেও সরকারের বিপুল ভর্তুকির কারণে আমদানিকৃত পণ্যের দাম মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ বেড়েছে, যাতে জীবনযাত্রার ব্যয় স্থিতিশীল থাকে।
অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস, কাতারের বিশাল সার্বভৌম তহবিল (প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার) থাকার কারণে গ্যাস রপ্তানি বছরের পর বছর বন্ধ থাকলেও তারা নাগরিকদের বেতন ও জরুরি সেবা চালু রাখতে পারবে। তবে আসল উদ্বেগ অন্য জায়গায়। যদি স্থানীয় ব্যবসাগুলো ভেঙে পড়ে, তবে কাতারের সিংহভাগ বিদেশি কর্মী ও মেধা দ্রুত দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারে।
এশিয়া গ্রুপের আহমেদ হেলাল বলেন, যদি বিদেশি কর্মীরা দলে দলে দেশ ছাড়তে শুরু করে, তবে পরিস্থিতি সত্যিই ভয়াবহ রূপ নেবে। কাতারি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার এবং শান্ত ভাবমূর্তি বজায় রাখার ভালো চেষ্টা করেছে। তবে সরকারের রাজকোষে যে একটি বিশাল ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সবকিছু এখন নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালি আর কতদিন বন্ধ থাকে, তার ওপর।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
কেএএ/