ড্রপ সাইট নিউজের দাবি

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহায়তায় ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:২৯ পিএম, ১৮ মে ২০২৬
পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান/ ছবি: এএফপি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরাতে কলকাঠি নেড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, আর তাতে সহায়তা করেছিল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের কৌশল হিসেবে নিয়েছিল পাক সামরিক বাহিনী ও পরবর্তী বছরগুলোতে তারা ওয়াশিংটনের বিভিন্ন দাবি পূরণ করে। রোববার (১৭ মে) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী গণমাধ্যম ড্রপ সাইট নিউজের প্রতিবেদনে এই দাবি করা হয়েছে।

ড্রপ সাইট জানায়, তাদের অনুসন্ধানটি লিক হওয়া কূটনৈতিক তার, নথিপত্র ও বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সূত্রের সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। প্রতিবেদনের অংশ হিসেবে তারা প্রথমবারের মতো ‘কেবল আই-০৬৭৮’ প্রকাশ করেছে, যেটিকে তারা দাবি করেছে ‘ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করা নথি’। তবে প্রতিবেদনে মার্কিন প্রশাসনের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই টানাপোড়েনে ছিল। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতকে জানান, যদি ইমরান খানকে অনাস্থা ভোটে সরানো হয়, তাহলে সব কিছু ‘ক্ষমা করা হবে’।

‘সবকিছু ক্ষমা করা হবে’

ড্রপ সাইটের দাবি অনুযায়ী, ২০২১ সালের জুনে সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম জে. বার্নস ইসলামাবাদ সফর করেন। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের আগে পাকিস্তানের সহযোগিতা নিশ্চিত করা, বিশেষ করে ড্রোন অভিযানের জন্য ভূখণ্ড ব্যবহার- এই বিষয়গুলো ছিল আলোচনার মূল লক্ষ্য।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বার্নসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানান বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। তার দপ্তর জানায়, তিনি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গেই সরাসরি কথা বলবেন। তবে বাইডেন তখন পর্যন্ত ইমরান খানের ফোন কলের অনুরোধে সাড়া দেননি।

বার্নস একদিন অপেক্ষা করেও কোনো সাক্ষাৎ পাননি বলে দাবি করা হয়। কয়েক সপ্তাহ পর কাবুল তালেবানের দখলে চলে যায়, যা বাইডেন প্রশাসনের জন্য বড় কূটনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পর পাকিস্তানের মাটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুরোধও ইমরান খান প্রত্যাখ্যান করেন।

ড্রপ সাইটের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে উষ্ণ থাকলেও বাইডেন প্রশাসন ইমরান খানকে ‘অপ্রত্যাশিত, পশ্চিমবিরোধী ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের সঙ্গে অসংগত’ হিসেবে দেখতো।

একই সময়ে সৌদি আরবও ইসলামাবাদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছিল একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির জন্য, যা ইমরান খান প্রত্যাখ্যান করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয় যে দেশটি কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

সেনাবাহিনীর গোপন লবিং ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

ড্রপ সাইটের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ২০২১ সালের জুলাইয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ওয়াশিংটনে সাবেক এক সিআইএ স্টেশন চিফকে লবিস্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়, যা সরকারকে না জানিয়ে করা হয়েছিল।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সময় ইমরান খান মস্কো সফরে ছিলেন, যেটি বাতিল করতে নিষেধ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ও মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু’র মধ্যকার একটি গোপন বৈঠকের তার ফাঁস হয়। ওই তারে বলা হয়, ইমরান খানকে সরালে ‘সবকিছু ক্ষমা করা হবে’।

যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ অস্বীকার করলেও এই নথি ইমরান খানের ক্ষমতাচ্যুতির কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়।

৯ এপ্রিল ২০২২: ক্ষমতা হারান ইমরান খান

২০২২ সালের ৯ এপ্রিল অনাস্থা ভোটে ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়। এরপর তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) রাজনৈতিকভাবে কঠোর চাপের মুখে পড়ে। দলটির নির্বাচনী প্রতীক বাতিল করা হয়, শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হয় ও অনেককে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করা হয়। ইমরান খান বর্তমানে কারাবন্দি।

এরপর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার হয় ও চীনের সঙ্গে কিছু প্রকল্পে ধীরগতি দেখা দেয় বলে দাবি করা হয়।

ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক চুক্তি

ড্রপ সাইটের দাবি, সেনা-সমর্থিত নতুন সরকারের অধীনে পাকিস্তান গোপনে ইউক্রেনে গোলাবারুদ ও আর্টিলারি শেল সরবরাহ করেছে, যা মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের মাধ্যমে পাঠানো হয়। আইএমএফ থেকে ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলারের সহায়তা অনুমোদনের পেছনে এই সহযোগিতা ভূমিকা রেখেছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করেছে ড্রপ সাইট।

জেনারেল বাজওয়ার যুক্তরাষ্ট্র সফর

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া ২০২২ সালের অক্টোবরে ওয়াশিংটন সফরে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দেন বলে বলা হয়।

এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পাকিস্তানকে ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশগুলোর একটি’ হিসেবে মন্তব্য করেন।

আসিম মুনিরের উত্থান

২০২২ সালের নভেম্বরে জেনারেল আসিম মুনির পাকিস্তানের সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ধীরে ধীরে পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন। তার নেতৃত্বে পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা গড়ে তোলে বলে দাবি করা হয়।

ড্রপ সাইট আরও দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৫০০ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি ডলারের বিরল খনিজ চুক্তি ও গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীল বাহিনীতে অংশ নেওয়ার প্রস্তাবও পাকিস্তান দেয়।

শেষে সংবাদমাধ্যমটি দাবি করে, পাকিস্তানের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থান কোনো হঠাৎ পরিবর্তনের ফল নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের মার্কিন চাপ এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক টিকে থাকার কৌশলের ফল।

সূত্র: ড্রপ সাইট নিউজ

এসএএইচ 

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।