সেতু ভেঙে পড়ে আছে খালে, দুর্ভোগে ১৫ হাজার মানুষ
একটি সেতুর অভাবে টানা সাত বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার আলীরপাড়া ও গোপালপুর এলাকার অন্তত ১৫ হাজার মানুষ। বগারচর ইউনিয়নের টাকিমারি খালের ওপর নির্মিত সেতুটি ২০১৯ সালের বন্যায় ভেঙে যায়। পরে পুনর্নির্মাণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রতিদিন ১০টি গ্রামের মানুষ এই পথ ব্যবহার করলেও সেতুটি ভেঙে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে বগারচর ইউনিয়নের আলীরপাড়া-গোপালপুর সড়কের টাকিমারি খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণ করা হয়। প্রায় সাত বছর আগে বন্যায় সেতুটি ভেঙে পড়লেও এরপর আর পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নতুন করে সেতুটি নির্মাণে আনুমানিক আট কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন অনিশ্চিত অবস্থায় পড়ে আছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সেতুর ভাঙা অংশ এখনো খালের দুই পাশে পড়ে আছে। দুই পাশে পাকা সড়ক থাকলেও মাঝখানে সংযোগ না থাকায় পুরো সড়ক কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে। মাঝখানের অংশটুকু ভেঙে সম্পূর্ণ পানিতে। শুকনা মৌসুমেই বিলের দুই ধারে শুকিয়ে গেলেও মাঝখানে রয়েছে পানি। এতে স্থানীয়রা পাশের সরু মাটির পথ দিয়ে কোনোভাবে হেঁটে বা মোটরসাইকেলে চলাচল করেন। তবে বড় যানবাহন চলাচল একেবারেই বন্ধ। তবে বর্ষা এলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পথ ডুবে যায় পানিতে। তখন যাতায়াতের মাধ্যম নৌকাই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে প্রতিদিন উপজেলা সদরে যেতে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হয়। ধরারচর, ভাটিপাড়া, চরটসাপাড়া, গোপালপুর, সারমারা, বগারচর, খাসিরপাড়া ও আলীরপাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দারা এই পথে যাতায়াত করেন। এতে সময় যেমন বেশি লাগছে, তেমনি বাড়তি লাগছে যাতায়াতের ভাড়াও ।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। গাজী আমানুজ্জামান মডার্ন কলেজ ও আলীরপাড়া উচ্চবিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। অনেককে খুব ভোরে বের হতে হয়। বর্ষা মৌসুমে নৌকায় চলাচল করতে গিয়ে বই-খাতা নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এমনকি দুর্ঘটনার শঙ্কাও রয়েছে প্রতিনিয়ত।
উপজেলা সদরের মডার্ন কলেজের ইন্টার প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শফিকুল বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের কয়েক কিলোমিটার ঘুরে কলেজে যেতে হয়। যদি এই ব্রিজটা ঠিক থাকতো, তাহলে আমরা অল্প সময়েই কলেজে যেতে পারতাম।’
শুধু শিক্ষার্থী নয়, রোগী পরিবহন ও কৃষিপণ্য বাজারজাত করতেও চরম সমস্যায় পড়ছেন স্থানীয়রা। জরুরি রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়িছে। কৃষকরাও সময়মতো পণ্য বাজারে নিতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
স্থানীয় মুসা মিয়া বলেন, ‘ব্রিজটি না থাকায় আমাদের অনেক সমস্যা হয়। ক্ষেত দিয়ে যেতে হয়। যদি একটু বৃষ্টি হয়, তাহলে আর আমরা যেতে পারি না। ব্রিজটা হলে আমাদের সবার জন্যই ভালো হবে।’
গাজী আমানুজ্জামান মডার্ন কলেজের প্রভাষক জুলফিকার মামুন বলেন, ‘বন্যায় সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। দ্রুত সেতুটি নির্মাণ করা হলে এলাকার মানুষের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হবে।’
এ বিষয়ে বগারচর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সোহেল রানা বলেন, ‘বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।’
জানতে চাইলে এলজিইডির বকশীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো. শামছুল হক বলেন, ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সেতুটি পুনর্নির্মাণের জন্য কয়েকবার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু করা হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুরাদ হোসেন বলেন, ‘আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। বিষয়টি জানা নেই। আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম। বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এসআর