শহীদের মায়ের সাক্ষ্য
‘দেখি ছেলের ডান কানে গুলি ঢুকে বাম কান দিয়ে বের হয়ে গেছে’
‘২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাত আনুমানিক ১২টার দিকে আমি আমার ছেলেকে দেখতে অ্যাডভান্স হাসপাতালে যাই। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান, আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। আমি দেখি ছেলের ডান কানের দিক দিয়ে গুলি ঢুকে বাম কানের দিক দিয়ে বের হয়ে গেছে।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আশিকুল ইসলামের মা আরিশা আফরোজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই জবানবন্দি দিয়েছেন। গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় দুই সেনা কর্মকর্তাসহ চার আসামির বিরুদ্ধে করা এই মামলায় পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।
চার আসামির মধ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম সাবজেলে আছেন। বৃহস্পতিবার তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অপর দুই আসামি পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান পলাতক।
জবানবন্দিতে আরিশা আফরোজ বলেন, তার ছেলে আশিকুল বনশ্রী নিবরাস মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে পড়ত। তিনি দর্জির কাজ করেন। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তার ছেলে আশিকুল জুমার নামাজ শেষে বনশ্রীর বাসায় এসে তার সঙ্গে খাবার খায়। আন্দোলনকারীদের আওয়াজ শুনে তার ছেলে তাদের সঙ্গে যোগ দিতে যায়। তিনি দেখছিলেন, তার ছেলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে অ্যাভিনিউ রোডে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ গোলাগুলি শুরু হলে তার ছেলেসহ আন্দোলনকারীরা দৌড়ে ২ নম্বর রোডের দিকে চলে যায়।
ছেলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন উল্লেখ করে জবানবন্দিতে আরিশা আফরোজ বলেন, রাত পর্যন্ত ছেলে আসেনি। রাত ১০টার দিকে তিনি বাসার গ্যারেজে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। এমন সময় একটি ছেলে তাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আন্টি কী হয়েছে?’ তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে এখনো বাসায় ফেরেনি, ওর কোনো খোঁজ পাচ্ছি না।’
আশিকুলের মা বলেন, তখন ওই ছেলেটি মোবাইলে একটি ছবি দেখিয়ে বলে, ‘দেখেন, এটা আপনার ছেলে কি না।’ ছবিটি দেখে চিনতে পারেন যে এটি তার ছেলে। ছবিতে তার ছেলের মাথায় ব্যান্ডেজ ও চোখ বন্ধ ছিল। ছবি দেখেই তিনি অজ্ঞান হয়ে যান।
তিনি বলেন, রাত ১২টার দিকে তার ছেলেকে দেখতে (বনশ্রীর) অ্যাডভান্স হাসপাতালে যান। কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা জানান, তার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। ‘আমি দেখি আমার ছেলের ডান কানের দিক দিয়ে গুলি ঢুকে বাম কানের দিক দিয়ে বের হয়ে গেছে। রাতেই মরদেহ নিয়ে দিনাজপুর গ্রামের বাড়িতে চলে যাই এবং ২০ জুলাই তার দাফন করা হয়।’
‘পরে জানতে পারি যে, কর্নেল রেদোয়ান, মেজর রাফাত, এডিসি রাশেদ আর মশিউর শেখ হাসিনার নির্দেশে গুলি চালিয়েছে। এর সঙ্গে আসাদুজ্জামান খান কামাল ও ওবায়দুল কাদের জড়িত ছিল। আমি এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও আন্দোলনকারীদের মাধ্যমে জেনেছি। আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই। এটাই আমার জবানবন্দি।’
এফএইচ/কেএএ/