রাষ্ট্রের হয়ে লড়ে টিকে থাকা দায়, ৬ মাসেও বিল পান না আইনজীবীরা
ঢাকা মহানগর আদালতের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি মাহফুজ হাসান। প্রতিদিনের সকালটা শুরু হয় আদালতপাড়ায় একই দৃশ্য দিয়ে। গায়ে সাদা শার্ট, দুই হাতে মামলার নথি, চোখে ক্লান্তির ছাপ।
প্রতিদিনের মতো এই আইনজীবী দ্রুত পা ফেলছেন আদালতে করিডোরে। বিচারকের এজলাসের সামনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি সাজাচ্ছেন।
বাইরে থেকে দেখলে এটি শুধু আদালতের আরেকটি ব্যস্ত সকাল। কিন্তু এই ব্যস্ততার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ, নীরব সংকট।
রাষ্ট্রের হয়ে যারা ফৌজদারি মামলায় লড়েন, তারা নিজেরাই এখন বলছেন, এই পদে থাকা দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
কারণ, পাবলিক প্রসিকিউটরদের (পিপি) বেতন-ভাতা খুবই কম। সামান্য যাও পাওয়া যায় প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতায় অপেক্ষা করতে হয় ছয় থেকে আট মাস পর্যন্ত, যা তাদের পেশাগত কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনে চাপ তৈরি করছে।
ঢাকা কোর্ট এলাকায় অবস্থিত রেবতী ম্যানসন ভবনের কয়েকটি কক্ষ পাবলিক প্রসিকিউটরদের অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়, ছবি: জাগো নিউজ
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসনিক ধীরগতি ও সমন্বয়হীনতায় এ সংকট তৈরি হয়েছে; সমাধানে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পালন করা মাহফুজ হাসান জাগো নিউজকে বলেন, নিম্ন আদালতের সরকারি কৌঁসুলিরা দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত কম সম্মানী ও প্রকট বেতন-ভাতা বৈষম্যের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মামলায় নিয়মিত কাজ করলেও তাদের দৈনিক আয় অত্যন্ত সীমিত, যা বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অপ্রতুল। বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনকেন্দ্রিক জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় ছয় থেকে আট মাস পর্যন্ত বিলম্ব হয়। এই দীর্ঘসূত্রতা ও আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক কৌঁসুলির মধ্যে পেশাগত অনীহা তৈরি হচ্ছে। ফলে পুরো প্রসিকিউশন ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও জনবল ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
২০ মামলা, কিন্তু পারিশ্রমিক গোনা হয় ২টির
আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকারি কাঠামো অনুযায়ী পিপি ও স্পেশাল পিপি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা পান। অ্যাডিশনাল পিপি ১২ হাজার টাকা ও অ্যাসিস্ট্যান্ট পিপি পান ৬ হাজার টাকা। কাগজে-কলমে এটি একটি সম্মানী। বাস্তবে এটি অনেকের কাছে ‘টিকে থাকার অপ্রতুল সহায়তা’।
নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি কৌঁসুলিদের দিনে মাত্র দুইটি মামলার হাজিরা বিল দেখানোর সুযোগ থাকে। তার জন্য পিপি/স্পেশাল পিপি মামলা প্রতি ৩০০ টাকা করে পান। অ্যাডিশনাল পিপি ২৫০ টাকা ও অ্যাসিস্ট্যান্ট পিপি ১২৫ টাকা করে পান।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আদালতে ব্যস্ত দিনে একজন কৌঁসুলি ১৫ থেকে ২০টি মামলার শুনানিতে অংশ নেন। এই বড় অংশের জন্য আলাদা কোনো পারিশ্রমিক পান না সরকারি কৌঁসুলিরা।
আরও পড়ুন
ঢাকার বিভিন্ন আদালতে ৬৬৯ আইন কর্মকর্তা নিয়োগ
পরিবারসহ সাবেক পিপি আব্দুল্লাহ আবুর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে বেতন বাড়ছে জিপি-পিপিদের
সাতক্ষীরা জজ আদালতের সাবেক পিপি ও তার ছেলে গ্রেফতার
সরকারি কৌঁসুলিরা প্রত্যেকে প্রতিদিন মামলার হাজিরা শুনানিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান না। একজন মাসে সর্বোচ্চ ২৫ কার্যদিবসে দুটি করে মামলায় হাজিরা দেওয়ার সুযোগ পেলে পদক্রম অনুযায়ী ৬২৫০ টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিল পেতে পারেন। মাসিক সম্মানী ও হাজিরা বিল মিলিয়ে একজন পিপি ও স্পেশাল পিপি পেতে পারেন ৩০ হাজার টাকা, অতিরিক্ত পিপি ২৪ হাজার ৫০০ টাকা ও অ্যাসিসট্যান্ট পিপি ১২ হাজার ২৫০ টাকা। এই টাকাও পুরোটা পান না সরকারি কৌঁসুলিরা। মোট বিলের ওপর ১০ শতাংশ কর কেটে রাখে সরকার।
অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মাহফুজ হাসান বলেন, পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে ‘সম্মান আছে, কিন্তু সম্মানীর কোনো মানে নেই।’
‘আমরা প্রতিদিন ১৫-২০টা মামলার শুনানিতে থাকি। কিন্তু মাস শেষে যা পাই, তা দিয়ে একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবন চালানো প্রায় অসম্ভব।’ যোগ করেন মাহফুজ হাসান।
একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও কৌঁসুলি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রের জন্য ফুলটাইম কাজ করি, কিন্তু পেমেন্ট হয় পার্টটাইম হিসেবেও না।’
আরও পড়ুন
কুমিল্লায় বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ গ্রেফতার সরকারি কৌঁসুলি কারাগারে
বিএনপি নেতা পিপির বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ
নির্বাচন কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত, সরকারি কৌঁসুলির বিরুদ্ধে মামলা
রাজবাড়ী জেলা জজ আদালতের ৩২ মণ পুরোনো নথি বাজারে বিক্রি
আইনি নিষেধাজ্ঞায় বন্ধ ব্যক্তিগত আয়ের দরজা
এই সংকটের আরেকটি কঠিন দিক হলো অ্যাডিশনাল পিপি বা স্পেশাল পিপিরা ব্যক্তিগত কোনো মামলা নিতে পারেন না। অর্থাৎ রাষ্ট্রের মামলা ছাড়া তাদের আয়ের কোনো বৈধ উৎস নেই।
ফলে একদিকে সীমিত সম্মানী, অন্যদিকে বিকল্প আয়ের পথ বন্ধ। এই দুই চাপ মিলিয়ে অনেকেই আর্থিকভাবে টিকে থাকার লড়াইয়ে পড়ছেন।
‘বিল জমা দিলে শুরু হয় অপেক্ষার আরেক যুদ্ধ’
সম্মানী পাওয়ার প্রক্রিয়াটিই আরেকটি বড় সমস্যা। প্রথমে আদালতে বিচারকের মাধ্যমে বিল যাচাই হয়, তারপর তা যায় পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসে, সেখান থেকে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে। এরপর অনুমোদন ও চেক ইস্যুর অপেক্ষা। এই পুরো চক্রে সময় লাগে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত।
কখনো আবার বাজেট না থাকলে বিল আরও দীর্ঘদিন আটকে থাকে।
একজন কৌঁসুলি বলেন, ‘মামলা শেষ হয় একদিনে, কিন্তু টাকা পেতে লাগে এক বছর।’
উচ্চ আদালতের সঙ্গে আকাশ-পাতাল ব্যবধান
নিম্ন আদালতের এই কৌঁসুলিদের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো বৈষম্য।
একজন অভিজ্ঞ অ্যাডিশনাল পিপি যেখানে মাস শেষে কর বাদ দিয়ে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকার মতো পান, সেখানে উচ্চ আদালতের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলরা পান ৮০ হাজার টাকার বেশি।
এই ব্যবধানকে তারা শুধু অর্থনৈতিক নয়, ‘প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য’ হিসেবে দেখছেন।
ঢাকা মহানগর ও দায়রা জজ আদালতের পিপি ওমর ফারুক ফারুকী, ছবি: জাগো নিউজ
প্রধান কৌঁসুলিরও একই কথা
ঢাকা মহানগর ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জাগো নিউজকে বলেন, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তার মতে, ‘একজন সাধারণ আইনজীবী যেখানে এক মামলায় এক হাজার টাকা নেন, সেখানে সরকারি কৌঁসুলির দৈনিক আয় ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা। এটা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।’
তিনি আরও বলেন, বিলম্বিত অর্থপ্রাপ্তি ও কম সম্মানীর কারণে অনেক সময় আদালতে কৌঁসুলির উপস্থিতিও প্রভাবিত হয়।
তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, এই পদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বীকৃতির একটি আলাদা মূল্য রয়েছে, যা অনেককে এই পেশায় টেনে আনে।
আরও পড়ুন
অ্যাটর্নি জেনারেল-পিপি-বিচারপতি বিএনপির হাতে, এটা ওপেন সিক্রেট
নওগাঁয় আইনজীবীর পিপিশিপ-সনদ বাতিলের দাবি বিচারকদের
বিচারককে ঘুস দিতে চাওয়া সেই পিপির সনদ স্থগিত
ঢাকার বিভিন্ন আদালতে ৬৬৯ আইন কর্মকর্তা নিয়োগ
জেলা প্রশাসনের অফিসে যোগাযোগ, সাড়া নেই
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট ঢাকা জেলা প্রশাসকের অফিসিয়াল ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ফোন রিসিভ হয়নি। ফলে অভিযোগ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংস্কারের আশ্বাস, ডিজিটাল পেমেন্টের পরিকল্পনা
এ বিষয়ে আইন ও বিচার বিভাগের (সলিসিটর উইং) সলিসিটর সানা মোঃ মাহরুফ হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে অর্থ ছাড়ের বর্তমান পদ্ধতিতে জটিলতা রয়েছে, যা কমানোর চেষ্টা চলছে।
‘ভবিষ্যতে বিচারকের ভেরিফিকেশনের পর সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর ডিজিটাল সিস্টেম চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এ বিষয়ে কাজ করছে আইন ও বিচার বিভাগ।’ যোগ করেন মাহরুফ হোসাইন।
এমডিএএ/এমএমএআর