নুসরাত হত্যার রায়ের ডেথ রেফারেন্স উচ্চ আদালতে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:১১ পিএম, ২৯ অক্টোবর ২০১৯

ফেনীর সোনাগাজী ফাজিল মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় বিচারিক (নিম্ন) আদালতের রায়ে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত ১৬ আসামির ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনকরণ) ও মামলার যাবতীয় নথি (হাইকোর্টে) উচ্চ আদালতে এসে পৌঁছেছে।

মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল ৫টার দিকে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল অফিসে লাল কাপড়ে মোড়ানো এই নথিপত্র পৌঁছায়। ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের স্টেনোগ্রাফার মো. শামসুদ্দিন ও অফিস সহায়ক মো. রিপন নথিগুলো নিয়ে আসেন। পরে রেজিস্ট্রার জেনারেল অফিস থেকে ডেথ রেফারেন্সের নথি গ্রহণ করেন হাইকোর্টের নথি আদান-প্রদান শাখার কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ।

এর আগে দুপুরের দিকে পুলিশি নিরাপত্তায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের অফিস সহকারী শামসুদ্দিন ডেথ রেফারেন্সের কপি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।

বিকেলে এই ডেথ রেফারেন্স উচ্চ আদালতে এসে পৌঁছায় বলে বিষয়টি জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেন সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার ব্যারিস্টার সাইফুর রহমান। ফৌজদারি কার্যবিধি ও আইনের বিধান অনুযায়ী বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড হলে রায়ের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার যাবতীয় কার্যক্রম উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়।

এটাই ডেথ রেফারেন্স বলে পরিচিতি। ডেথ রেফারেন্সের পাশাপাশি বিচারিক আদালতের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল দায়ের করেন। তিনি জানান, ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে এ মামলার ডেথ রেফারেন্সসহ যাবতীয় নথিপত্র চলে এসেছে। নথিগুলো লাল কাপড়ে মোড়ানো।

গত ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে চাঞ্চল্যকর নুসরাত হত্যা মামলায় প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ প্রত্যেক আসামিকে (১৬ আসামি) মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে।

অধ্যক্ষের যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করায় ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার সাত মাসের মধ্যে এ রায় ঘোষণা করা হয়।

রায়ে বলা হয়, “দণ্ডিত আসামিবৃন্দ ইচ্ছা করলে অত্র রায় ও দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ৭ (সাত) কার্যদিবসের মধ্যে মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগে আপিল দায়ের করতে পারবেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ বিধান মোতাবেক মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামিবৃন্দের ‘মৃত্যুদণ্ডাদেশ’ সদয় অনুমোদনের জন্য অত্র মামলার যাবতীয় কার্যক্রম মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগে সত্বর প্রেরণ করা হোক।”

চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেছিলেন নুসরাতের মা শিরিন আখতার। ওইদিনই অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর তার অনুসারীরা সিরাজকে জেল থেকে বের করে আনার জন্য জনমত গঠন করেন। ৩ এপ্রিল সিরাজের সহযোগীরা তার সঙ্গে জেলখানায় পরামর্শ করে ৪ এপ্রিল মাদরাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে খুনের পরিকল্পনা করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৬ এপ্রিল নুসরাত মাদরাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে খুনিরা পরিকল্পিতভাবে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে হত্যার চেষ্টা চালায়।

ঘটনাস্থল থেকে নুসরাতকে দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। এরপর তাকে স্থানান্তর করা হয় ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হওয়ায় সেখান থেকে নুসরাতকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল মামলা দায়ের করেন। এদিকে ১০ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করে নুসরাত।

এই মামলায় ২৮ মে অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২০ জুন অভিযোগ গঠন করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। পরবর্তীতে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত রায়ের জন্য ২৪ অক্টোবর নির্ধারণ করেন। মামলাটিতে মাত্র ৬১ কার্য দিবসে ৮৭ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তি-তর্ক গ্রহণ করা হয়।

২৪ অক্টোবর রায়ে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আসামিরা হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ-দৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসার সাবেক সহ সভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীম (২০)

এফএইচ/এনএফ/জেআইএম/এমএস