পিলখানা হত্যায় ৭১ আপিল, বিস্ফোরক মামলার সাক্ষ্যই শেষ হয়নি

মুহাম্মদ ফজলুল হক
মুহাম্মদ ফজলুল হক মুহাম্মদ ফজলুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৩৫ এএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১

পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ১২ বছর আজ। ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলার বিচারিক আদালতের রায়ের পর হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন ও আপিলসহ দুই ধাপ শেষ হয়েছে। এরপর আরও নিষ্পত্তির জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রাষ্ট্র ও আসামি উভয়পক্ষ থেকে মোট ৭১টি আপিল আবেদন করা হয়েছে। এখন ওইসব আপিল আবেদন শুনানির পালা।

২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পেলেও ২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠার রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপির খরচ, অনুলিপিগ্রহণের প্রক্রিয়া, আপিলের পেপারবুক তৈরি, সেই পেপারবুক আদালতে রাখার স্থান, চূড়ান্ত বিচারের সময়সহ বিচারিক প্রক্রিয়ার নানা কারণে আপিল শুনানি শুরু হতে দেরি হচ্ছে বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইন কর্মকর্তা (অ্যাটর্নি জেনারেল) বলছেন, আপিল দায়ের সম্পন্ন হলে তারপর রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপিল শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি বরাবর আবেদন করা হবে। তার আলোকে চলতি বছরের শেষদিকে আপিলের শুনানি শুরু হতে পারে। আর আসামিপক্ষ বলছে, চলতি বছরের শেষ দিকে কোনোভাবেই এই মামলার আপিল শুনানি শুরু করা যাবে না।

এদিকে একযুগ আগের ওই নৃশংস ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে করা আরও একটি মামলার বিচার এখনো বিচারিক (নিম্ন) আদালতেই শেষ হয়নি। সেটি এখন সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে বিদ্রোহের মধ্যে পিলখানায় অর্ধশতাধিক সেনা কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এক মামলার ২০১৭ সালে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের দেয়া রায়ের মধ্যে ১৩৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং ১৮৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন। এছাড়া তিন থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড হয় ২২৮ জনের।

jagonews24

আসামিদের মধ্যে ২০৩ জন আসামির পক্ষে এখন পর্যন্ত ৫১টি আপিল ও লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়েছে সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে। অন্যদিকে হাইকোর্টের রায়ে যারা খালাস পেয়েছেন এবং মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাদের যাবজ্জীবন হয়েছে, সে রকম ৮৩ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়ে ২০টি লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

সব মিলিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দুই পক্ষের ৭১টি আপিল ও লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি লিভ টু আপিল, অর্থাৎ আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন। আর ৩২টি সরাসরি আপিল আবেদন।

জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্ট রুলস অনুযায়ী হাইকোর্টের রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপি সংগ্রহ করার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল আবেদন করতে হয়। সেই সময় বহু আগেই পেরিয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে যারা এখনো আপিল করেননি, তাদের বিলম্ব মার্জনা চেয়ে আপিল করার সুযোগ আছে। বিলম্ব মার্জনার আবেদন করে তারা যদি আবেদন করেন তাহলে তারা আপিল বা লিভ টু আপিল ফাইল করতে পারবেন।

এরপর আপিল শুনানির ক্ষেত্রে উভয়পক্ষকে প্রত্যেকটা আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিতে হবে। এখন যারা লিভ টু আপিল ফাইল করেছেন তাদের সেই লিভ টু আপিল গ্রহণ করলে তাদেরও সারসংক্ষেপ জমা দিতে হবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, গত বছর ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা ২০টি লিভ টু আপিল করেছেন। এর মধ্যে হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়া ৭৫ জনের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন পাওয়া আটজনের শাস্তি বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।

jagonews24

তিনি বলেন, ৮৩ আসামির ব্যাপারে এই ২০টি লিভ টু আপিল করতে আমাদের খরচ হয়েছে ২৭ লাখ টাকা। আমার মনে হয়, সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় ফৌজদারি আপিল

বিচারিক আদালতের রায়, হাইকোর্টের রায়, এফআইআর, অভিযোগপত্র মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার পৃষ্ঠার আপিল জমা দিতে হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা।

এ মামলায় বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হবে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিয়মিত যে বেঞ্চ আছে সেখানেই এর বিচার হবে। সবগুলো ফাইল হলে শুনানির তারিখ নির্ধারণের জন্য আমরা যাব। সুপ্রিম কোর্ট রুলস অনুযায়ী তারিখ নির্ধারণের জন্য আপিল বিভাগের চেম্বারজজ আদালতে আবেদন করতে হয়। আমরা সে আবেদন করব।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমাদের প্রত্যাশা থাকবে হাইকোর্ট বিভাগ যে রায় দিয়েছেন তা আপিলে বিভাগেও যেন বহাল থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মনে হয়েছে হাইকোর্টের রায় ঠিক হয়নি, আমরা সেটি দেখাব। এই কারণে আপিল করা হয়েছে। আশাকরি এ বছরের শেষের দিকে এর শুনানি শুরু হতে পারে।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, প্রথম আপিল ফাইল করতে তাদের প্রায় ১৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সেখানে নয় আসামির পক্ষে আপিল করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ওই আপিলটা ফাইল করার পর অ্যাডভোকেট অন রেকর্ডের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেছিলাম। সেখানে আমরা পেপারবুক জমা দিয়ে প্রথম যে আপিলটা ফাইল করা হয়েছে, সেটি ব্যবহার করেই যেন বাকি আসামিরা আপিল ফাইল করতে পারেন সেই আবেদন করা হয়। প্রধান বিচারপতি আমাদের (পেপারবুক মওকুফ) আবেদনটা মঞ্জুর করেছেন। এরপর আবেদন জমা দিয়ে আপিল ফাইল করা হয়েছে। এটাকে ‘মেমো অব আপিল’ বলে।

jagonews24

এ আইনজীবী জানান, হাইকোর্ট যাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন এবং মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাদের যাবজ্জীবন দেয়া হয়েছে, তারা আপিল বিভাগে সরাসরি আপিল করতে পারবেন। আর বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন পাওয়া যে আসামিদের দণ্ড হাইকোর্ট বহাল রেখেছেন, তারা সরাসরি আপিল করতে পারবেন না। লিভ টু আপিল অর্থাৎ আপিলের অনুমতি চেয়ে প্রথমে আবেদন করতে হবে। আপিল বিভাগ সে আবেদন মঞ্জুর করলে তারা আপিল করতে পারবেন।

তিনি জানান, ২০৩ জন আসামির পক্ষে যে ৪৮টি আপিল দায়ের করা হয়েছে, তার মধ্যে ৩০টি সরাসরি আপিল। বাকি ১৮টি লিভ টু আপিল। নিয়ম অনুযায়ী, হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল দায়ের করতে হয়। সেই সময় পেরিয়ে গেছে, এখনো যারা আপিল করেননি, তাদের কী হবে জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম বলেন, বিলম্ব মার্জনার আবেদন করে তারা আপিল বা লিভ টু আপিল ফাইল করতে পারবেন।

এর পরের ধাপ জানিয়ে তিনি বলেন, আপিল শুনানির ক্ষেত্রে উভয়পক্ষকে প্রত্যেকটা আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিতে হবে। এখন যারা লিভ টু আপিল ফাইল করেছেন তাদের সেই লিভ টু আপিল গ্রহণ করলে তাদেরও সারসংক্ষেপ জমা দিতে হবে। তবে বাস্তবতার নিরিখে বলতে পারি, এই বছর আপিল শুনানি শুরু হবে বলে মনে হয় না।

পিলখানায় বিদ্রোহের ঘটনা যেমন পুরো বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল, এক মামলায় এত আসামির সর্বোচ্চ সাজার আদেশও ছিল নজিরবিহীন। নির্মম ওই ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলার মধ্যে বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টে হত্যা মামলার রায় হলেও ১২ বছরেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা অপর মামলাটির বিচার। বিস্ফোরক আইনের মামলায় এক হাজার ৩৪৫ জন সাক্ষীর মধ্যে এই ১১ বছরে নেয়া হয়েছে মাত্র ১৪৬ জনের সাক্ষ্য। দুই মামলার আসামি হওয়ায় হত্যা মামলায় খালাস পেয়েও ২৭৮ জন মুক্তি পাননি।

ঘটনা, মামলা ও নাম পরিবর্তন

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর (বিজিবি) সদর দফতর পিলখানাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ করেন সীমান্তরক্ষী এই বাহিনীর একদল সদস্য। তারা সেদিন ঢাকার পিলখানায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালান। নিষ্ঠুর আচরণ ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সামরিক কর্মকর্তাদের অনেকের পরিবারের সদস্যরাও। দুই দিনব্যাপী ওই বিদ্রোহ শেষে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ওই ঘটনার পর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পুনর্গঠন করা হয়। বাহিনীর নাম, পোশাক, পতাকা, মনোগ্রামসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আসে। ২০১১ সালের ২৩ জানুয়ারি থেকে আগের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) দাফতরিকভাবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নামে পথচলা শুরু করে। নৃশংস ওই হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে পৃথক মামলা হয়, যা পরে নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তর করা হয়। এরপর ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ওই হত্যা মামলার রায় দেন বিচারিক (নিম্ন) আদালত।

বিডিআর বিদ্রোহের ৫৭টি মামলার বিচার বাহিনীর নিজস্ব আদালতে শেষ হয়। সেখানে ছয় হাজার জওয়ানের কারাদণ্ড হয়। বিদ্রোহের বিচারের পর পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের মামলার বিচার শুরু হয় সাধারণ আদালতে। ঢাকার জজ আদালত ২০১৩ সালে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। এছাড়া ২৫৬ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেয়া হয়।

jagonews24

এরপর হাইকোর্টের রায় হয় ২০১৭ সালে। সেখানে বলা হয়, ওই ঘটনা ছিল রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক-সামাজিক নিরাপত্তায় বিঘ্ন সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র। শুধু তাই নয়, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে একটি দক্ষ, প্রশিক্ষিত বাহিনীকে ধ্বংসেরও চেষ্টা।

বিদ্রোহের বিচার

সূত্র বলেছে, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি জওয়ানের সাজা হয় অধিনায়কদের সামারি ট্রায়ালে (সংক্ষিপ্ত বিচার)। এতে ১১ হাজার ২৬৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। তাদের মধ্যে ১০ হাজার ৯৭৩ জনের বিভিন্ন ধরনের সাজা হয়। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আট হাজার ৭৫৯ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। অন্যরা প্রশাসনিক দণ্ড শেষে আবার চাকরিতে যোগ দেন।

দ্বিতীয় পর্যায়ে সারাদেশে বিশেষ আদালত গঠন করে বিচার করা হয়। সর্বশেষ মামলার রায় হয় ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর। বিশেষ আদালতে মোট ৫৭টি মামলায় পাঁচ হাজার ৯২৬ জন জওয়ানের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। তাদের মধ্যে ৮৭০ জনকে দেয়া হয়েছে সাত বছরের কারাদণ্ড। আর বেকসুর খালাস পাওয়া ১১৫ জন চাকরি ফিরে পেয়েছেন। বিচার চলার সময় মারা গেছেন পাঁচজন।

এফএইচ/এমআরআর/বিএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]