৪২ ঘণ্টায় তদন্ত শেষ করা এসআইয়ের বরখাস্তের আদেশ স্থগিত

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:১৮ পিএম, ০৬ এপ্রিল ২০২৩
ফাইল ছবি

মানিকগঞ্জে রুবেল হত্যার ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাসুদুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করতে জেলা পুলিশ সুপারকে (এসপি) নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের ওই আদেশ ৮ সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছেন চেম্বার আদালত। তবে রুবেল হত্যা মামলা পুনরায় তদন্তে পিবিআই প্রধানকে দেওয়া নির্দেশ বহাল রেখেছেন আদালত। ফলে তদন্ত কাজ চলতে কোনো বাধা নেই।

হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি নিয়ে বৃহস্পতিবার (৬ এপ্রিল) আপিল বিভাগের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের চেম্বার জজ আদালত এই আদেশ দেন।

আদালতে আজ রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী। রিটের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।

এর আগে গত ৩ এপ্রিল মানিকগঞ্জ সদরের কৈতরা গ্রামের মো. রুবেল (২২) হত্যার ঘটনায় মরদেহ উদ্ধার থেকে অভিযোগপত্র, ৪২ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য তদন্তের ঘটনায় পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মাসুদুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপারকে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়।

একই সঙ্গে রুবেল হত্যা মামলা পুনরায় তদন্তে পিবিআই প্রধানকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পুলিশ সুপারের নিচে নয়, পিবিআইয়ের এমন কর্মকর্তাকে দিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে বলা হয়েছে।

গত ৩ এপ্রিল হাইকোর্টের বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলনের বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী।

পরে এই দুই আইনজীবী বলেন, ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন ও আদালতের সামনে ভুল তথ্য উপস্থাপনের জন্য হাইকোর্ট এসআই মাসুদুর রহমানকে বরখাস্তের নির্দেশ দিয়েছেন। পরে এই আদেশ স্থগিত চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। সেই আবেদন শুনানি নিয়ে এই আদেশ দেন চেম্বার জজ আদালত।

এর আগে তলবের পরিপ্রেক্ষিতে ৩ এপ্রিল সকালে হাইকোর্টে হাজির হন পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান।

শুনানির শুরুতে হত্যা মামলা ৪২ ঘণ্টায় অবিশ্বাস্য সময়ে তদন্ত প্রসঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে আদালত বলেন, আপনার মতো পুলিশ অফিসার দরকার। আপনি মাত্র ৪২ ঘণ্টায় হত্যা মামলা তদন্ত শেষ করলেন? এ সময়ের মধ্যে কখন সাক্ষী নিলেন, কখন ঘুমালেন, কখন খাওয়া-দাওয়া করলেন তা আমাদের দেখান। আর কতটি মামলা আপনি তদন্ত করেছেন, সেগুলো কত সময়ে শেষ করেছেন তার তালিকা দেন।

এ সময় পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন, এটা আমার প্রথম তদন্ত। এরপর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী বলেন, চার্জশিট দ্রুত দিলেও সমস্যা। আবার দেরি করে দিলেও সমস্যা।

আদালত বলেন, তাহলে আমরা একটা মক ট্রায়াল করি। কত দ্রুত চার্জশিট দিতে পারেন, সেটা আমরা দেখতে চাই।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সেটা দেখার এখতিয়ার আপনাদের আছে। এক পর্যায়ে আদালত দাখিল করা নথিতে দেখতে পান মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থানার মামলার একটি তদন্ত প্রতিবেদন রেফারেন্স হিসেবে নথিতে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এ সময় আদালত পুলিশ কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমানকে ভর্ৎসনা করে বলেন, কেন আপনি এটা দিলেন। আপনার কাছে তো রেফারেন্স চাওয়া হয়নি। বেশি স্মার্টনেস দেখাচ্ছেন। নিজেকে বেশি স্মার্ট মনে করেন? কোর্টের সঙ্গে বেশি স্মার্টনেস দেখাবেন না। একেবারে কারাগারে পাঠিয়ে দেবো।

গত ১৪ মার্চ মানিকগঞ্জ সদরের কৈতরা গ্রামের মো. রুবেল (২২) হত্যার ঘটনায় মরদেহ উদ্ধার থেকে অভিযোগপত্র, ৪২ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য তদন্ত কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে রুবেল হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মানিকগঞ্জ সদর থানার উপ-পরিদর্শক মাসুদুর রহমানকে কেস ডকেটসহ ৩ এপ্রিল আদালতে হাজির হতে বলা হয়। হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। গত ১ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে ‘লাশ উদ্ধার থেকে অভিযোগপত্র, ৪২ ঘণ্টার অবিশ্বাস্য তদন্ত’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদন সংযুক্ত করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়।

ওই প্রতিবেদনের একাংশে বলা হয়, মরদেহ রাত দেড়টায় উদ্ধারের পর সুরতহাল করেছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয় হাসপাতালে। এরপর মামলা, আসামি গ্রেফতার, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, মানচিত্র তৈরি, সাক্ষ্যগ্রহণসহ একে একে অন্তত ৯টি ধাপ পেরিয়ে হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হয় মাত্র ২২ ঘণ্টায়। পরবর্তী ২০ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে আদালতে হাজির, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায়সহ তদন্তের সব প্রক্রিয়া শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। অর্থাৎ মরদেহ উদ্ধার থেকে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিতে পুলিশের সময় লেগেছে মাত্র ৪২ ঘণ্টা।

একটি খুনের মামলার তদন্তে এমন ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায়। দুই দিনের কম সময়ে খুনের মামলার তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়ার ঘটনায় অনেকে প্রশংসা করলেও প্রশ্ন তুলেছেন আইন ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, মামলাটির তদন্ত শেষ হয়েছে রকেটের চেয়েও দ্রুতগতিতে। এটা ব্যতিক্রমী ও আশ্চর্যজনক ঘটনা। পুলিশের এমন তদন্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরাও।

গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর দিনগত রাতে মানিকগঞ্জ সদরের কৈতরা গ্রামের একটি হ্যাচারিতে খুন হন মো. রুবেল (২২)। পরদিন তার স্ত্রী বাদী হয়ে সোহেল নামের একজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি এখন কারাগারে।

এফএইচ/কেএসআর/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।