কুষ্ঠ রোগ সম্পর্কে যত ভুল ধারণা
কুষ্ঠ রোগ, যা হেনসেন রোগ নামেও পরিচিত, ঘটে মাইকো ব্যাকটেরিয়াম লেপ্রে জীবাণুর কারণে। এটি মূলত ত্বক ও স্নায়ুতে সংক্রমণ সৃষ্টি করে। তবে, কুষ্ঠ রোগ সম্পর্কে এখনো বিশ্বব্যাপী অনেক ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে। ফলে বহু মানুষ এই রোগকে কলঙ্ক হিসেবে দেখে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর প্রায় ২ লক্ষ মানুষ কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হন। এর প্রধান কারণ হলো সচেতনতার অভাব এবং সমাজে রোগটি নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা।
আসুন কুষ্ঠ রোগ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা গুলো জেনে নেয়া যাক-
১. কুষ্ঠরোগ খুব সহজে ছড়ায়
অনেকের মধ্যেই এই ভুল ধারণা আছে যে কুষ্ঠরোগ হলে সামান্য স্পর্শেই এটি ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।প্রায় ৯৫% মানুষের শরীরে কুষ্ঠরোগের জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে। তাই অধিকাংশ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন না।
কুষ্ঠরোগ সাধারণ ছোঁয়াছুঁয়ি, হাত মেলানো, খাবার ভাগ করে খাওয়া বা একই কাপড় ব্যবহারের মাধ্যমে ছড়ায় না। রোগটি সাধারণত ছড়ায় খুব ঘনিষ্ঠ এবং দীর্ঘ সময় ধরে আক্রান্ত রোগীর সঙ্গে নিয়মিত সংস্পর্শে থাকলে, এবং চিকিৎসা না নিলে। তাও মূলত নাক বা মুখ থেকে বের হওয়া শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে।
২.কুষ্ঠরোগে শরীরের অঙ্গ পড়ে যায়
কুষ্ঠরোগ নিয়ে সবচেয়ে ভয়ংকর ও ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো-এই রোগ হলে হাত-পা, আঙুল বা শরীরের অংশ ঝরে পড়ে। বাস্তবে এটি একেবারেই সত্য নয়। কুষ্ঠরোগের জীবাণু সরাসরি শরীরের কোনো অঙ্গ নষ্ট বা বিচ্ছিন্ন করে না।
এই রোগে যে বিকৃতি বা ক্ষত দেখা যায়, তার মূল কারণ হলো স্নায়ুর ক্ষতি। স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে আক্রান্ত ব্যক্তি ব্যথা, গরম বা আঘাত ঠিকভাবে অনুভব করতে পারেন না। ফলে অজান্তেই বারবার আঘাত, পোড়া বা কেটে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ক্ষতে আবার সংক্রমণ হলে ধীরে ধীরে ঘা, ক্ষয় হতে পারে-যা অনেক সময় ভুলভাবে ‘অঙ্গ পড়ে যাওয়া’ বলে মনে হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-কুষ্ঠরোগ যদি শুরুতেই শনাক্ত করে চিকিৎসা নেওয়া হয়, তাহলে স্থায়ী ক্ষতি সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। আধুনিক চিকিৎসায় এই রোগ সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।
৩ কুষ্ঠরোগ এখন আর নেই
অনেকেই মনে করেন কুষ্ঠরোগ বুঝি ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কুষ্ঠরোগ এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে এই রোগ এখনো বিদ্যমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা -এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ২ লক্ষেরও বেশি নতুন কুষ্ঠরোগী শনাক্ত হয়। এই সংখ্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রোগটি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। তাই এখনো নজরদারি, সচেতনতা ও চিকিৎসা কার্যক্রম অত্যন্ত জরুরি।
৪. কুষ্ঠরোগের কোনো চিকিৎসা নেই
অনেক মানুষ এখনো মনে করেন কুষ্ঠরোগ একবার হলে তা আর ভালো হয় না। কিন্তু এটি একটি বড় ভুল ধারণা। বাস্তবতা হলো-কুষ্ঠরোগের কার্যকর ও সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। কুষ্ঠরোগের চিকিৎসা হিসেবে মাল্টি-ড্রাগ থেরাপি ব্যবহার করা হয়, যা একাধিক ওষুধের সমন্বয়ে তৈরি একটি চিকিৎসা পদ্ধতি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় এই চিকিৎসা বেশিরভাগ দেশেই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। সাধারণত রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসার মেয়াদ ৬ থেকে ১২ মাস হয়ে থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-রোগটি যত দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা যায়, ততই ভালো ফল পাওয়া যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিলে স্থায়ী অক্ষমতা প্রতিরোধ করা যায়,শরীরের বিকৃতি এড়ানো সম্ভব, অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করা যায়।
৫. কুষ্ঠরোগ অভিশাপ, পাপের ফল
দীর্ঘদিন ধরে সমাজে এই ভুল ধারণা প্রচলিত ছিল যে কুষ্ঠরোগ সৃষ্টিকর্তার শাস্তি, পূর্বজন্মের পাপ বা কোনো অশুভ শক্তির কারণে হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। বাস্তবতা হলো-কুষ্ঠরোগ হয় ম্যাইকো ব্যাকটেরিয়াম লেপ্রে নামক একটি নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার কারণে।
এই ভুল বিশ্বাসের কারণেই শত শত বছর ধরে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত মানুষদের সমাজ থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে, অবহেলা করা হয়েছে এবং অমানবিক বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। অথচ তারা কোনো অপরাধ করেননি-তারা শুধু একটি চিকিৎসাযোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।
সূত্র: এনএলআর আন্টিল নো লেপ্রসি রিমেইনস
আরও পড়ুন:
শীতে গোসলে যে ভুল করলে হতে পারে হার্ট অ্যাটাক
খেজুরের রসে নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি, সতর্কতা জরুরি
সানজানা রহমান যুথী/এসএকেওয়াই/